খেলোয়াড়রা শিশুদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামেন কেন
ফুটবল বা ক্রিকেট ম্যাচ শুরুর আগে একটি দৃশ্য প্রায় সবাই দেখি। খেলোয়াড়রা যখন ড্রেসিংরুম থেকে বের হয়ে মাঠে প্রবেশ করেন, তখন তাদের হাত ধরে বা পাশে পাশে ছোট ছোট শিশুরা হাঁটতে হাঁটতে মাঠে আসে। বিশ্বকাপ, ইউরো, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ইউরোপের ঘরোয়া লিগ সব জায়গাতেই এ দৃশ্য দেখা যায়।
এই শিশু কারা? আর কেনই বা তারা ফুটবলারদের সঙ্গে মাঠে নামে? আসলে এর আছে একটি ছোট্ট ইতিহাস ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।
যেভাবে শুরু হয়েছিল
এই প্রথার সঠিক সূচনা কখন হয়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এটি চালু ছিল।
১৯৯৬ সালের নভেম্বরে লিভারপুল ও এভারটনের একটি ম্যাচে দুই দলের অধিনায়কের পাশে দুইজন কিশোর খেলোয়াড়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মজার বিষয় হলো, এভারটনের সেই শিশুদের একজন ছিলেন ভবিষ্যতের ফুটবল তারকা ওয়েন রুনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর।
২০০০ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে একজন করে শিশু মাঠে প্রবেশ করেছিল।
তবে এই প্রথা বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পায় ২০০২ সালের বিশ্বকাপের সময়। তখন ফুটবলের বিশ্ব সংস্থা ফিফা ও ইউনিসেফ যৌথভাবে ‘Say Yes to Children’ বা ‘শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন’ নামে একটি প্রচারণা চালায়। সেই প্রচারণার অংশ হিসেবে প্রতিটি ফুটবলারের সঙ্গে একজন শিশু মাঠে প্রবেশ করত।
এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, শিশুদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার দায়িত্ব সবার।
এখনো কেন এই প্রথা চালু আছে
বর্তমানে বিভিন্ন ক্লাব ও টুর্নামেন্টে শিশুদের মাঠে নিয়ে যাওয়ার কারণ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘদিনের স্পন্সর ম্যাকডোনাল্ডস অনেক সময় বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। বিজয়ী শিশুদের বিশ্বকাপে গিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে হাঁটার সুযোগ দেওয়া হয়।
কখনো কখনো এই প্রথা দাতব্য কাজের জন্যও ব্যবহার করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইংল্যান্ড রেভল্যুশন ক্লাব শিশু এসকর্ট হওয়ার সুযোগ নিলামে তোলে। সেই অর্থ ক্লাবের দাতব্য তহবিলে দেওয়া হয়েছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু ম্যাচে খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশু নয়, আশ্রয়হীন কুকুরকেও মাঠে আনা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল পোষা প্রাণী দত্তক নেওয়ার বিষয়ে মানুষকে উৎসাহিত করা।
তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর মূল উদ্দেশ্য হলো খেলার পরিবেশকে আরও পরিবারবান্ধব করে তোলা এবং শিশুদের ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত করা।
এসব শিশু নির্বাচন করা হয় কীভাবে
এখন প্রশ্ন হলো, এই শিশু কারা?
২০১৪ সালে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সাধারণত ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্য থেকে তাদের নির্বাচন করা হয়।
পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা অনেক সময় হাজার হাজার দর্শকের সামনে মাঠে নামতে ভয় পেতে পারে। আবার ১৭ বছরের বেশি বয়সীদের আর শিশু হিসেবে ধরা হয় না। তাই এই বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অনেক ক্লাব তাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সমর্থকদের সন্তানদের এই সুযোগ দেয়। বিশেষ করে যেসব সমর্থক নিয়মিত খেলা দেখতে আসে, সিজন টিকিট কিনে বা দীর্ঘদিন ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকে—তাদের পরিবারকে বিশেষ সম্মান জানাতে এই ব্যবস্থা করা হয়।
আবার অনেক সময় ক্লাবের সদস্যদের সন্তানদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয়।
এছাড়া বিভিন্ন স্পন্সর প্রতিষ্ঠান ও ফুটবল সংস্থা প্রায়ই বিশেষ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেসব প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিশুরা তাদের প্রিয় ফুটবল তারকার সঙ্গে মাঠে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।
বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে এমন বহু শিশুকে দেখা গেছে, যারা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় জিতে এই সুযোগ পেয়েছে।
এছাড়া অনেক ক্লাব কঠিন রোগে আক্রান্ত শিশুদের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। তাদের প্রিয় খেলোয়াড়ের সঙ্গে দেখা করার এবং মাঠে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়। কারণ এই মুহূর্ত তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতি হয়ে থাকে।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকে। তারা গুরুতর অসুস্থ শিশুদের ইচ্ছা পূরণে কাজ করে।
বিশ্বের বড় বড় ক্লাবগুলোর নিজস্ব ফুটবল একাডেমি রয়েছে।
এসব একাডেমিতে ভবিষ্যতের খেলোয়াড়দের গড়ে তোলা হয়। অনেক সময় একাডেমির মেধাবী বা পরিশ্রমী শিশুদের পুরস্কার হিসেবে প্রথম দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে নামার সুযোগ দেওয়া হয়।
এর মাধ্যমে তারা কাছ থেকে তারকাদের দেখতে পারে, কথা বলতে পারে এবং অনুপ্রাণিত হয়।
কিছু ক্লাব নির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে শিশুদের ম্যাসকট হওয়ার সুযোগ দেয়।
অভিভাবকেরা আবেদন করলে নির্ধারিত অর্থের বিনিময়ে তাদের সন্তানকে কোনো একটি ম্যাচে খেলোয়াড়দের সঙ্গে মাঠে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়।
এই অর্থ সাধারণত ক্লাবের উন্নয়ন বা বিভিন্ন সামাজিক ও দাতব্য কাজে ব্যবহার করা হয়।
ক্লাবভেদে এই খরচ কয়েকশ পাউন্ড থেকে এক হাজার পাউন্ডেরও বেশি হতে পারে।
এখানে উদাহরণ হিসেবে চেলসি ফুটবল ক্লাবের কথা বলা যায়। ক্লাবটি প্রতি বছর শত শত আবেদনকারীর মধ্য থেকে ২৫০ জন শিশুকে অপেক্ষমাণ তালিকায় যুক্ত করে। এরপর তাদের কোনো ম্যাচে সুযোগ পেতে প্রায় চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
চেলসির ক্ষেত্রে আবেদনকারীর সংখ্যা এত বেশি যে বর্তমানে তারা নতুন আবেদন গ্রহণই করছে না। ভবিষ্যতে কবে আবার আবেদন নেওয়া শুরু হবে, সেটিও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।
ম্যাসকট নাকি প্লেয়ার এসকর্ট
ফুটবল জগতে এসব শিশুকে সাধারণত দুই নামে ডাকা হয় ‘ম্যাসকট’ এবং ‘প্লেয়ার এসকর্ট’।
যদি কোনো শিশু পুরো দলের প্রতিনিধিত্ব করে, তাহলে তাকে ম্যাসকট বলা হয়।
আর যদি একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের সঙ্গে মাঠে নামে, তাহলে তাকে প্লেয়ার এসকর্ট বলা হয়।
তবে বর্তমানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে একজন করে শিশু থাকে।
খেলোয়াড়দের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশ করানো শুধু একটি সুন্দর দৃশ্য নয়। এটি ফুটবলের একটি বার্তা যে, খেলাধুলা কেবল জেতা-হারার বিষয় নয়। এটি নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করারও একটি মাধ্যম।
হাজারো দর্শকের সামনে যখন একটি শিশু তার প্রিয় তারকার হাত ধরে মাঠে নামে, তখন হয়তো তার মনেও একটি স্বপ্ন জন্ম নেয়। আর সেই স্বপ্ন হলো কদিন সেও এই মাঠে খেলবে, হাজারো মানুষ তার নাম ধরে চিৎকার করবে।
আর এসব কারণেই ফুটবলারদের সঙ্গে শিশুদের মাঠে প্রবেশ করার এই ঐতিহ্য আজ বিশ্ব ফুটবলের সুন্দর ও মানবিক প্রথায় পরিণত হয়েছে।
মজার একটি তথ্য হলো, বিশ্বখ্যাত ফুটবলার ওয়েন রুনি ছোটবেলায় নিজেও একজন ম্যাসকট ছিলেন। একদিন তিনি অন্য ফুটবলারের হাত ধরে মাঠে নেমেছিলেন। পরে তিনিই হয়ে ওঠেন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ফুটবলার।
তাই কে জানে?
আজ যে ছোট্ট শিশুটি কোনো তারকার হাত ধরে মাঠে নামছে, কয়েক বছর পর হয়তো সেই শিশুটিই বিশ্বকাপে খেলবে।



