ঈদ আনন্দ

দেশে দেশে ঈদের রীতি

মাহির জামিল
মাহির জামিল

ঈদ মানে কী, সে তো তোমরা জানোই! ঈদ মানে খুশি, খাওয়া-দাওয়া, পাড়া বেড়ানো, হরেক রকম খেলা, সালামি নেওয়া, ফুফু আর খালার বাড়ি ঘুরতে যাওয়া। তবে এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশের কত কত জায়গা আছে না? ঈদের দিন এলেই তারা নৌকা বাইচ খেলে। মোরগ লড়াইয়ের মজমা করে, কোথাও কোথাও বসে মেলা। এই তো, এসব নিয়েই বাংলাদেশের ঈদ! তবে পৃথিবীর সব জায়গার ঈদ সমান না। ঈদ নিয়ে নানান জায়গায় আছে নানান রীতিনীতি।  

ইন্দোনেশিয়ার কথাই ধরো না। ঈদকে ঘিরে কত কত অদ্ভুত অনুষ্ঠান সেখানে। তেমন এক অদ্ভুত অনুষ্ঠানের নাম ‘গ্রেবেক শাওয়াল’। দেশটি পুরো গণতান্ত্রিক হলেও পুরনো দিনের শাসন কাঠামোও টিকে আছে। পুরনো এসব শাসন কাঠামোকে তারা বলে ‘সালতানাত’। সালতানাতে থাকেন একজন সুলতান। তিনিই সালতানাতের প্রধান।

তেমনি এক সালতানাতের নাম ‘যোগ্যকর্তা সালতানাত’। সেই সালতানাতের মানুষ ঈদের দিন খুব ধুমধাম করে এক আজব অনুষ্ঠান পালন করেন। ঈদের নামাজ শেষ হতেই সুলতানের প্রাসাদ থেকে একটি মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে থাকে বাহারি পোশাক পরা যত সেপাই। বাজে বাঁশি আর ড্রাম। 

আর সবচেয়ে মজার যা হয়, সেপাইরা কাঁধে ধরাধরি করে নিয়ে আসে এক বিশাল সবজির গাদা! ইয়া মোটা আর মাধা চুড়ো করা! অনেক অনেক সবজি ঢাঁই করে একদম খড়ের গাদার মতো করা। ওটাই সেপাইরা কাঁধে করে প্রাসাদ থেকে প্রধান মসজিদের চত্বরে নিয়ে আসে। তারপর হয় আরও এক মজার কাণ্ড। কে সেই সবজির গাদা থেকে কতগুলো সবজি নিতে পারে, তাই নিয়ে হয় হুটোপুটি। হবে না, যোগ্যকর্তা সালতানাতের মানুষ মনে করে, সুলতানের দেওয়া এ সবজিগুলো পুণ্যময়। তাই যে যত নিতে পারবে, তার তত পুণ্য মিলবে!

এবার আসি আরেক দেশ নাইজেরিয়ার কথায়। নাইজেরিয়াতে আছে অদ্ভুত অনেক রীতি। নাইজেরিয়াতেও আছে পুরনো কিছু শাসন কাঠামো। যার নাম আমিরাত। আমিরাতে প্রধান থাকেন আমির। আমিররা তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে ঈদের দিন একটি অনুষ্ঠান করেন। যার নাম ‘দুরবার’।

ঈদের দিন নামাজ শেষ হতেই হাজার হাজার ঘোড়া জড়ো করা হয়। ঘোড়ার গায়ে চড়ানো হয় রংবেরঙের চুমকি দেওয়া কাপড়। ঘোড়ার সহিসরাও তেমনি জরি দেওয়া পোশাক পরেন। মাথায় বাধেন ইয়া বড় পাগড়ি। হাতে বল্লম। সব আয়োজন শেষ হতেই আমির সামনের ঘোড়ায় চেপে বসেন। এরপর দুলদুল করে শুরু হয় মিছিল। সেই মিছিলে যোগ দেন বাদ্যকর, গায়ক, মল্লযোদ্ধা, জাদুকর! আমির শহরের এ গলি সে গলি এমনি ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়ান। তার পিছু পিছু বাদ্য বাঁজাতে বাঁজাতে, গান গাইতে গাইতে আর জাদু দেখাতে দেখানে চলেন বাকি সবাই।

মিশরে কী হয় জানো? চাঁদরাতে তারা মোটেও ঘুমায় না! সারাটি রাত ভরে বাজার সদাই চলে, চলে পিঠা বানানো। এমনি জেগে জেগে খুব সকালে ঈদের নামাজ আদায় করে তারা। তারপর কী করে, টুপ করে ঘুমিয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে একদম বিকেল। আরে সব্বনাশ! তাহলে তো ঈদের দিন পুরোটাই মাটি!

তুমি ভাবছ যা তা নয়! বিকেলেই তাদের ঈদের কেবল শুরু হয়। এরপর চলে কত মজার মজার কাণ্ড। বড়রা ছোটদের মুঠোভরা চকলেট দেয়। রাস্তায় রাস্তায় বসে মেলা। খাবার দাবারের জম্পেশ আয়োজন। মিশরীয়রা ঈদের দিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে অনেক অনেক আনন্দ করে।

তুরস্কে ঈদের রীতি আরেকটু চমকদার। এ দিন ছোটরা বড়দের সম্মান জানায় খুব ঘটা করে। ছোটরা বড়দের ডান হাতে চুমু খায়। তারপর কপালে সে হাত চেপে ধরে বলে ‘বাইরাম’। বাইরাম হচ্ছে ঈদের তুর্কি শব্দ। এসময় ছোটদের খালি হাতে ফেরানো একদম মানা। তাই তো বড়রা সুন্দর সুন্দর খামে টাকা ভরে রাখে। যখনই ছোট ছোট খুকু-খুকি হাতে চুমু খেতে আসে, টুক করে তাদের হাতে চলে যায় সেই খাম!

শেষ করছি আফ্রিকার দেশ সেনেগালের কথা বলে। সেনেগালে ঈদুল আজহায় প্রায় প্রতি ঘরেই কোরবানি হয়। এমন খুব কমই মেলে, যে কোরবানি করে না। এর কারণও আছে, কারও হাতে টাকা পয়সার ঘাটতি পড়লে এগিয়ে আসে দেশের সরকার! তারা কোরবানি করার পশুটাও এনে দেয়। এ কাজকে সেনেগালে বলা হয় ‘অপারেশন তাবাসকি!’

সূত্র: ইউরো নিউজ, স্পুটনিক, জাকার্তা পোষ্ট ও ডার্সি ফ্লাওয়ার্স অবলম্বনে।