অ্যান্টার্কটিকা সম্পর্কে এই তথ্যগুলো জানেন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে আছে রহস্যময় সাদা মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। বছরের পর বছর বরফে ঢাকা এই জায়গাটিকে অনেকেই তীব্র বরফ ও পেঙ্গুইনের দেশ হিসেবেই চেনে। কিন্তু বাস্তবে অ্যান্টার্কটিকা অনেক বেশি বিস্ময়কর। এখানে আছে রক্তের মতো লাল জলপ্রপাত, সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, বছরে একবার সূর্য ওঠার অদ্ভুত ঘটনা, এমনকি মানুষও বসবাস করে গবেষণার জন্য।

পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল এই মহাদেশে লুকিয়ে আছে এমন অসংখ্য চমকপ্রদ তথ্য, যা জানলে অবাক হতে হয়।

ছবি: রয়টার্স
ছবি: রয়টার্স

এক মাইলেরও বেশি পুরু বরফ

পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত অ্যান্টার্কটিকা যেন এক রহস্যময় জগত। দক্ষিণ মেরুতে বছরে মাত্র একবার সূর্য ওঠে, আর তারপর টানা ছয় মাস অস্ত যায় না। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ আর তুষার। সেই বরফের স্তর নিচের দিকে এক মাইলেরও বেশি গভীর। কিছু জায়গায় এর পুরুত্ব প্রায় ৩ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এখানে মানুষ থাকে, তবে খুব কম

অ্যান্টার্কটিকায় স্থায়ী কোনো শহর নেই। তবে গবেষণার কাজে এখানে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ থাকেন। তারা প্রায় ৭০টি গবেষণা কেন্দ্রে বসবাস করেন। খাবার বাইরে থেকে জাহাজ বা বিমানে আনা হয়, কারণ এখানে কিছু চাষ করা যায় না। গবেষকদের তৈরি বেশিরভাগ আবর্জনাও আবার নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

অ্যান্টার্কটিকায় বরফের মধ্যে আটকে থাকা এমভি আকাদেমিক শোকালস্কি জাহাজের ছবি। ছবি: রয়টার্স
অ্যান্টার্কটিকায় বরফের মধ্যে আটকে থাকা এমভি আকাদেমিক শোকালস্কি জাহাজের ছবি। ছবি: রয়টার্স

গবেষণার জন্য আছে বিশেষ চুক্তি

অ্যান্টার্কটিকায় গবেষণা করা দেশগুলো একটি বিশেষ চুক্তি মেনে চলে, যার নাম ‘অ্যান্টার্কটিক ট্রিটি’। ১৯৫৯ সালে করা এই চুক্তি অনুযায়ী মহাদেশটি কেবল শান্তিপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক কাজে ব্যবহার করা যাবে।

দক্ষিণ মেরুতে প্রথম পৌঁছায় নরওয়ে

নরওয়ের অভিযাত্রী রোয়াল্ড আমুন্ডসেন প্রথম দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছান। তিনি ও তার দল ১৯১১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সেখানে পৌঁছেছিলেন। কয়েক সপ্তাহ পরে ব্রিটিশ অভিযাত্রী রবার্ট স্কট সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন, তাদের আগে কেউ হাজির হয়েছে।

১৯১১ সালে রোয়াল্ড আমুন্ডসেন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ মেরু১৯১১ সালে রোয়াল্ড আমুন্ডসেন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেছিলেন।  ছবি: স্টিভ নিকোলাসতে পৌঁছেছিলেন।  ছবি: স্টিভ নিকোলাস
১৯১১ সালে রোয়াল্ড আমুন্ডসেন প্রথম ব্যক্তি হিসেবে দক্ষিণ মেরুতে পৌঁছেছিলেন। ছবি: স্টিভ নিকোলাস

ভয়ংকর ঠাণ্ডা 

অ্যান্টার্কটিকায় গ্রীষ্মকালেও তাপমাত্রা প্রায় মাইনাস ২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট থাকে। শীতকালে তা নেমে যেতে পারে মাইনাস ১১২ ডিগ্রিতে। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে মাইনাস ১২৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট।

এখানে কোনো মেরু ভালুক নেই

অনেকে ভাবেন মেরু ভালুক অ্যান্টার্কটিকায় থাকে। কিন্তু আসলে তারা থাকে উত্তর মেরু অঞ্চলে। অ্যান্টার্কটিকায় মেরু ভালুক তো নেইই, এমনকি কুকুরও নেই। ১৯৯৪ সাল থেকে স্লেজ কুকুর নিষিদ্ধ করা হয়েছে, কারণ তারা স্থানীয় প্রাণীদের ক্ষতি করতে পারে। তবে এখানে প্রায় ২০ মিলিয়ন পেঙ্গুইন আছে।

আকারে যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকোর আয়তনের সমান

প্রায় তাই! তবে আমরা সবাই জানি, পানি জমে বরফ হলে তা বেশি জায়গা দখল করে। অ্যান্টার্কটিকাতেও একই ঘটনা ঘটে। শীতকালে এখানকার সমুদ্রের বরফ প্রায় ৭০ লাখ বর্গমাইল এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু গ্রীষ্মের শেষে সেই বরফ গলে কমে ৭ লাখ বর্গমাইলেরও নিচে নেমে আসে। বরফ গলতে শুরু করলে তা মহাদেশের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি বিশাল স্রোতের সঙ্গে মিশে যায়। এই স্রোতের প্রবাহ পৃথিবীর সব নদীর সম্মিলিত প্রবাহের চেয়েও ১০০ গুণ বেশি শক্তিশালী।

আছে রক্তের মতো লাল জলপ্রপাত

অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে অদ্ভুত প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলোর একটি হলো ‘ব্লাড ফলস’ বা রক্ত জলপ্রপাত। টেইলর হিমবাহ থেকে নামা এই পানিতে প্রচুর আয়রন আছে। বাতাসের সংস্পর্শে এসে তা মরিচা ধরে লাল হয়ে যায়। ফলে দূর থেকে দেখে মনে হয় বরফের গা বেয়ে রক্ত ঝরছে।

১৯১১ সালে অস্ট্রেলীয় ভূতত্ত্ববিদ গ্রিফিথ টেইলর প্রথম এটি দেখতে পান। তারপর থেকেই এই অদ্ভুত লাল রঙের দৃশ্য অভিযাত্রীদের মুগ্ধ করে আসছে। ‘ব্লাড ফলস’ নামে পরিচিত এই রক্তিম জলধারা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার টেইলর হিমবাহের ধবধবে সাদা বরফের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে নিচের বরফাচ্ছন্ন ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ছবি: রয়টার্স
‘ব্লাড ফলস’ নামে পরিচিত এই জলধারা পূর্ব অ্যান্টার্কটিকার টেইলর হিমবাহের ধবধবে সাদা বরফের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। ছবি: রয়টার্স

কেবল বিজ্ঞানীরাই এখানে কাজ করেন না

অ্যান্টার্কটিকার ম্যাকমার্ডো স্টেশনে গ্রীষ্মকালে এক হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন। তাদের মধ্যে আছেন রাঁধুনি, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, চিকিৎসক, মেকানিকসহ আরও অনেকে। তারা ডরমিটরিতে থাকেন, ডাইনিং হলে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং গান, বইপড়া, সিনেমা দেখা ও যোগব্যায়ামের মতো কাজও করেন।

অ্যান্টার্কটিকা এখন জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র

এখন অনেক মানুষ পর্যটক হিসেবেও অ্যান্টার্কটিকায় যাচ্ছেন। কেউ বিমানে আকাশ থেকে দেখেন, কেউ ক্রুজ জাহাজে ভ্রমণ করেন। অবশ্য বেশ ব্যয়বহুল। ২০২৩–২০২৪ মৌসুমে এক লাখের বেশি পর্যটক সেখানে গিয়েছিলেন। পর্যটকদের কার্যক্রম নজরদারি করে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব অ্যান্টার্কটিকা ট্যুর অপারেটরস’।