শিশুর সঙ্গে যুদ্ধ নিয়ে যেভাবে কথা বলবেন
টিভি খুললেই যুদ্ধের ভয়ংকর খবর। কখনো বোমা বিস্ফোরণ, কখনো আগুনের লেলিহান শিখা। সামাজিকমাধ্যমে এখন এসব ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের এই ভয়াবহতা শিশুদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। ওদের মনের ভীতি ও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। তাই এ সময়ে অভিভাবকদের পাশে থাকা খুবই দরকারি। কারণ যেকোনো উদ্বেগ ও মন খারাপের সময়ে শিশুরা বাবা-মাকে কাছে পেতে চায়।
ইউনিসেফের প্রতিবেদন অবলম্বনে এখানে সন্তানের সঙ্গে যুদ্ধ ও সংঘাত নিয়ে কীভাবে আলোচনা করবেন তা নিয়ে কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো।
শিশুরা কী জানে ও কী ভাবছে
সবার আগে জানতে হবে, শিশু যুদ্ধ নিয়ে আসলে কী জানে এবং কী ভাবছে? এজন্য তার জন্য নির্দিষ্ট সময় ও স্থান বেছে নিন। যেখানে বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যাবে। যেন সে স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলতে পারে। অবশ্য রাতের সময়ে এসব আলোচনা এড়িয়ে চলা ভালো।
তাকে জিজ্ঞাসা করুন, সে কী জানে এবং কী ভাবছে। দেখা যাবে, কিছু শিশু এ ব্যাপারে খুব কম জানে এবং কথা বলার আগ্রহ দেখাবে না। তাই কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ছবি আঁকা, গল্প বলা বা অন্য কোনোভাবে আলোচনা শুরু করতে পারেন।
শিশুরা অনেকভাবে খবর জানতে পারে। তাই তারা কী দেখছে ও শুনছে তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। তারা অনেক সময় অনলাইনে, টিভি, স্কুল বা বন্ধুদের কাছ থেকে ভুল তথ্য পেয়ে থাকে। অভিভাবকের উচিৎ আলোচনার মাধ্যমে এসব তথ্য সংশোধন করা।
ধারাবাহিকভাবে মন খারাপ করা ছবি ও শিরোনাম শিশুর মনে প্রভাব ফেলতে পারে। তার এই উদ্বেগকে ছোট বা উপেক্ষা করবেন না। তাকে বুঝিয়ে বলুন, যুদ্ধ অনেক দূরে হচ্ছে। তাতে অন্তত শিশুর উদ্বেগ কমবে।
শান্ত থাকা ও বয়স অনুযায়ী আলোচনা
শিশু বিশ্বের পরিস্থিতি জানতে চায়, এই অধিকার তার আছে। কিন্তু বড়দের দায়িত্ব শিশুকে উদ্বেগ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। সাধারণত অভিভাবকরা নিজের সন্তানকে সবচেয়ে ভালো জানেন। তাই ভালো হয়, নিজের সন্তানের সঙ্গে নিজে আলোচনা করা। আলোচনার ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী ভাষা ব্যবহার করতে হবে, প্রতিক্রিয়া বুঝতে হবে এবং উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে হবে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি বড়দের মনেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, শিশুরা বয়স্কদের কথায় প্রভাবিত হয়। তাই নিজের ভয়ের কথা বারবার বলা যাবে না। তারচেয়ে শান্তভাবে কথা বলতে হবে। না হলে অভিভাবকের ভয় শিশুর মনে ভয় তৈরি করবে।
ইতিবাচক দিক তুলে ধরা
খুঁজে খুঁজে শিশুর কাছে কিছু ইতিবাচক দিক তুলে ধরতে হবে। যেমন—স্বেচ্ছাসেবকদের কথা বলা যেতে পারে। কীভাবে তারা ওই দেশের শিশুর পাশে দাঁড়াচ্ছে, খাবার খেতে দিচ্ছে। এগুলো শিশুর মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, সে সাহস পাবে।
তাকে প্রশ্ন করুন—সে হলে কি করত? হয়তো সে গল্প আকারে কিছু লিখবে কিংবা শান্তির পোস্টার বা ছবি আঁকবে। এই ছোট ছোট কাজগুলোও শিশুকে সান্ত্বনা দিতে পারে।
সাবধানে আলোচনা শেষ করা
আলোচনা শেষের আগে নিশ্চিত করতে হবে, শিশুর উদ্বেগ কমেছে। এজন্য স্বর, শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করে তার শরীরের ভাষা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তারপর সেভাবে তার সঙ্গে আলোচনা শেষ করা উচিৎ। তাহলে শিশু বুঝবে, আপনি তার যত্ন নিচ্ছেন। তার মধ্যে বিশ্বাস গড়ে উঠবে, কোনো কারণে সে উদ্বিগ্ন থাকলে আপনি তার পাশে থাকবেন।
নিয়মিত খোঁজ নিন
যুদ্ধ চলতে থাকলে, নিয়মিত সন্তানের খোঁজ নিন। সে কী ভাবছে, নতুন কোনো প্রশ্ন আছে কি না, কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে চায় কি না—এগুলো জানার চেষ্টা করতে হবে। যদি শিশুকে উদ্বিগ্ন বা চিন্তিত মনে হয়, যেমন পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, দুঃস্বপ্ন বা ঘুমের সমস্যা, তাহলে তার সঙ্গে বসে কথা বলতে হবে। দরকার হলে আশপাশে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যান। হাঁটতে হাঁটতে শান্ত ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আলোচনা করুন।
খবর দেখা কমানো
শিশু কী পরিমাণ খবর দেখছে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে ভয়ঙ্কর হেডলাইন ও মন খারাপ করা ছবি দেখার পরিমাণ কমাতে হবে। প্রয়োজনে শিশুদের জন্য খবর দেখা বন্ধ করতে হবে। এই সময়ে যতটা সম্ভব শিশুকে ইতিবাচক রাখুনএবং বিভ্রান্তিকর খবর থেকে দূরে রাখুন।
নিজের যত্ন নিন
নিজেকে সামলাতে পারলে, তবেই আপনি শিশুকে সাহায্য করতে পারবেন। তাই কোনো সংবাদ দেখে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে সতর্ক থাকুন। কারণ অভিভাবকের যেকোনো প্রতিক্রিয়া সবার আগে শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। যুদ্ধের খবর দেখে খারাপ লাগতেই পারে। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে একটু সময় নিন। ক্রমাগত অনলাইনে না থেকে বিরতি নিন। যতটা সম্ভব, কিছু সময় অন্যদিকে ব্যয় করুন। তবুও নিজের খারাপ লাগা ও দুশ্চিন্তা শিশুকে বুঝতে দেবেন না।