পরীক্ষার সময় নিজের যত্ন নেওয়ার ৬ উপায়
পরীক্ষার সময় অনেকের মধ্যে ক্লান্তি, অবসাদ ও অস্থিরতা কাজ করে। এই সমস্যা যে কারো হতে পারে। কারণ সবার ইচ্ছে থাকে—পরীক্ষায় ভালো ফল করা। কিন্তু সেই ইচ্ছে অনেক সময় বাড়তি চাপ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে যখন একসঙ্গে একাধিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়।
সাধারণত পড়ার চাপ সামলাতে আমরা নিজের জন্য আলাদা সময় রাখি না। এমনকি নিয়মিত খাওয়া-ঘুমের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো অবহেলা করি। মনে করি, সবটুকু সময় ও শক্তি পড়াতে ঢেলে দিলেই হয়তো ভালো ফল করতে পারব। অথচ বাস্তবতা বলছে, এ ধরনের চেষ্টা কখনো কখনো উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালো ফল করতে হলে কেবল বইয়ের পাতায় ডুবে থাকলেই হবে না, নিজের মন ও শরীরে যত্ন নেওয়া দরকারি।
পর্যাপ্ত ঘুম
মোটামুটি সবার মধ্যে দেখা যায়, পরীক্ষার আগে রাত জেগে পড়ার পরিকল্পনা থাকে। কেউ কেউ পুরো সপ্তাহ ভোর পর্যন্ত পড়ে কাটিয়ে দেয়। আমাদের ধারণা, ঘুম কমিয়ে পড়াই একমাত্র উপায়। কিন্তু গবেষণা বলছে, ঘুম কম হলে মেজাজ খিটখিটে থাকে, কাজের সক্ষমতা কমে যায়। এতে পরীক্ষার ফল খারাপ হতে পারে।
অন্যদিকে, প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণ ঘুম (১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীদের জন্য ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা) শরীরের জন্য অনেক উপকারী। বিজ্ঞান বলছে, ঘুম মস্তিষ্ককে সতেজ রাখে এবং সর্বোচ্চ দক্ষতায় কাজ করতে সাহায্য করে। পরীক্ষায় ভালো করতে মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেওয়া খুবই দরকারি।
পুষ্টিকর খাবার
আমরা প্রায়ই শুনি, সুস্থ থাকতে ভালো খাবার খাওয়া ও পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। কিন্তু পানি কেবল শরীর নয়, মস্তিষ্ককেও ভালো রাখে।
অথচ দেখা যায়, পরীক্ষার চাপ বাড়লে অনেকেই চিপস বা চকলেটের মতো খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। গবেষণা বলছে, চাপের সময় মস্তিষ্ক বেশি চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আগ্রহ দেখায়। কিন্তু আমরা কী খাচ্ছি, তা চিন্তাশক্তি ও কাজের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে।
চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবার মাঝে মাঝে খাওয়া ঠিক আছে। কিন্তু বেশি খেলে মস্তিষ্ক ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যা পরীক্ষার জন্য মোটেও ভালো নয়। বিপরীতে পুষ্টিকর খাবার খেলে মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়ে।
পর্যাপ্ত পানি পান করা
আমরা কী পান করছি সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে পড়ার সময় এনার্জি ড্রিংক বা কফি পান করি। সীমিত ক্যাফেইনে কোনো সমস্যা না থাকলেও বেশি হলে মাথাব্যথা, বমি ভাব, অস্থিরতা, পানিশূন্যতা ও ঘুমের সমস্যা হতে পারে।
পরীক্ষার সময় চিনিযুক্ত পানীয় এড়িয়ে বেশি পরিমাণ পানি পান করাই ভালো। যদি কফি পান করি, তাহলে বেশি পানি পান করার চেষ্টা করতে হবে। কারণ কফি শরীর থেকে পানি বের করে দেয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি দিয়ে তৈরি। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের গবেষণা বলছে, শরীরে পানির পরিমাণ ঠিক থাকলে মস্তিষ্ক ভালোভাবে কাজ করে।
নিয়মিত বিরতি নেওয়া
মনে হতে পারে, একটানা পড়াই ভালো ফলের চাবিকাঠি। কিন্তু মাঝেমধ্যে বিরতি নিলে আরও ভালো করা সম্ভব।
মাঝে মাঝে পাঁচ মিনিটের একটা বিরতি নিতে হবে। এই সময়ে বই সরিয়ে রেখে চোখ বন্ধ রাখতে হবে। তারপর ধীরে শ্বাস নিতে হবে—৬ সেকেন্ড শ্বাস, ৩ সেকেন্ডে ছাড়া। তারপর একটু বাইরে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করলে ভালো লাগবে।
কখনো কখনো ১৫ থেকে ২০ মিনিটের বিরতি নেওয়া যেতে পারে। এ সময়ে বাইরে থেকে হেঁটে আসা, গোসল করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, ১০ থেকে ২০ মিনিটের হালকা ঘুম এবং গান শোনা যেতে পারে। তাতে মস্তিষ্কের ওপর চাপ কমবে।
তবে সামাজিকমাধ্যম এড়িয়ে চলা ভালো। ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের গবেষণায় বলা হয়েছে, সামাজিকমাধ্যমের আসক্তি মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ তৈরি করে।
পরিবার ও বন্ধুদের সহায়তা নেওয়া
খুব বেশি অস্থির লাগলে পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্য নিতে হবে। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললে অনেক সমস্যার সহজে সমাধান হয়ে যায়। তাই এমন বন্ধুকে ফোন করতে হবে, যে হাসাতে পারে বা মন খুলে কথা বলবে ও শুনবে। একসঙ্গে কফি খাওয়া বা একটু হাঁটাহাঁটি করলেও মন প্রফুল্ল হয়।
যদি পড়া সংক্রান্ত কোনো সমস্যা হয়, যেমন পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের বিষয়, তাহলে শিক্ষকের সাহায্য নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, অভিভাবক, বন্ধু ও শিক্ষক সবাই আমাদের সাহায্য করতে চায়।
শরীরচর্চার সময় রাখা
ব্যায়াম কেবল শরীরের জন্যই ভালো নয়, এটি মস্তিষ্কের জন্যও খুব উপকারী। নিয়মিত ব্যায়াম করলে চিন্তা, সমস্যা সমাধান ও শেখার সক্ষমতা বাড়ে। এছাড়া, শরীরচর্চা করলে এন্ডোরফিন নামে ‘ভালো লাগার হরমোন’ নিঃসৃত হয়, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
শরীরচর্চার জন্য জিমে যেতেই হবে ব্যাপারটা এমন নয়। বাসাতেই নিয়মিত বা বাসার পাশে ছোট পার্কটিতেও নিয়মিত ব্যায়াম করা যায়। যেমন—৫ মিনিটের ছোট ওয়ার্কআউট (দৌড়ানো, জাম্পিং জ্যাক), পছন্দের গানে নাচা, ৯০ সেকেন্ডের যোগব্যায়াম, বাড়ির পাশের পার্কে দৌড়ানো, ৬০ সেকেন্ড পুশ-আপ বা প্ল্যাঙ্ক।
এ ধরনের ছোট ছোট বিরতি মনোযোগ বাড়াতে ও চাপমুক্ত থাকতে সাহায্য করবে।
শেষ কথা পরীক্ষার সময় কেবল টানা পড়া নয়, নিজের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ শরীর ও মন ভালো ফলাফলের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।