নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকা শত শত শ্রমিক, চলছে উদ্ধার অভিযান
নেপালের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শত শত শ্রমিককে উদ্ধারে মরিয়া হয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজ ৯০০-এর বেশি জলবিদ্যুৎকর্মীর কয়েকশ জন রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এসব প্রকল্পে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি সুড়ঙ্গগুলোতে বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ জমে গেছে। ফলে ভেতরে পৌঁছানোই এখন উদ্ধারকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময় যত গড়াবে, সুড়ঙ্গের ভেতরে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকায় আটকে থাকা শ্রমিকদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও কমে আসতে পারে।
গার্ডিয়ান জানায়, বন্যা শুরুর পর কিছু শ্রমিক সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে সাহায্যের জন্য ফোন করেছিলেন। পরে যারা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন, তারা জানিয়েছেন, অনেক সহকর্মী এখনো ভেতরে আটকা রয়েছেন।
নেপাল ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহন কুমার দাঙ্গি গার্ডিয়ানকে বলেন, বন্যা শুরু হওয়ার পর কিছু শ্রমিক সুড়ঙ্গ থেকে সাহায্য চেয়েছিলেন। যারা বেরিয়ে আসতে পেরেছেন, তাদের কাছ থেকেও জানা গেছে, অনেক শ্রমিক ভেতরে রয়ে গেছেন।
কাদায় বন্ধ সুড়ঙ্গ, সামনে বড় বাধা
গার্ডিয়ান জানায়, নেপাল সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা সুড়ঙ্গের মুখে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত গার্ডিয়ানকে বলেন, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সুড়ঙ্গের ভেতর ও মুখে জমে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে আপার ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে প্রায় ২৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে নিখোঁজ বলে ধারণা করা আরও ৪২ শ্রমিককে উদ্ধারে সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা বিস্ফোরক ব্যবহার করে পথ তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
উদ্ধারকারীদের প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, মাটি সরানোর যন্ত্র দিয়ে বিপুল পরিমাণ কাদা সরিয়ে সুড়ঙ্গে যাওয়ার পথ তৈরির চেষ্টা চলছে।
উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া আশিষ গুরুং গার্ডিয়ানকে বলেন, চারদিকে শুধু কাদা। সুড়ঙ্গের ভেতরের অবস্থা আরও ভয়াবহ। কাদা এত গভীর যে সেখানে চলাফেরা করাই কঠিন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রসুয়া জেলার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে উদ্ধারকাজে অংশ নিচ্ছেন গুরুং। এটি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। সেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের সন্ধানে নেপাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় একটি দলও কাজ করছে। পানি নিষ্কাশনের পাম্প ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে তারা সুড়ঙ্গে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
জলবিদ্যুৎ কোম্পানি উদ্ধারকারী দলকে যে মানচিত্র দিয়েছে, তাতে দেখা গেছে, সুড়ঙ্গের ভেতরে একটি নিরাপদ জায়গা রয়েছে। সেখানে আটকে থাকা কিছু শ্রমিক বেঁচে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন উদ্ধারকারীরা।
দুর্গম ভূখণ্ড, নদীর গতিপথেও অনিশ্চয়তা
গার্ডিয়ান জানায়, সুড়ঙ্গে পৌঁছানোর পথও সহজ নয়। বন্যায় ৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস হয়েছে। ফলে উদ্ধারকারীদের অনেক এলাকায় হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
ভারত ও চীনও যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করছে। দুই দেশই তৈরি করা ট্রাস সেতু পাঠাচ্ছে, যাতে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে আবার পৌঁছানো সম্ভব হয়।
এর মধ্যেই ফুলেফেঁপে ওঠা ত্রিশূলী নদী গতিপথ বদলাচ্ছে। এক দিন যে জায়গা শুকনো থাকছে, পরের দিন সেখানেই পানি ঢুকে যাচ্ছে। ফলে উদ্ধারকারীদের পরিকল্পনা বারবার বদলাতে হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, বৈরী আবহাওয়া, দুর্গম ভূখণ্ড এবং চলমান ঝুঁকির কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু নাগরিকদের উদ্ধারে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ভারত-চীনের সহায়তায় সুড়ঙ্গ উদ্ধারের চেষ্টা
নেপাল জানিয়েছে, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে তাদের বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে সুড়ঙ্গে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষজ্ঞ সহায়তার জন্য ভারত ও চীনের ওপর নির্ভর করছে তারা।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী যন্ত্র ব্যবহার করছে। গার্ডিয়ান জানায়, চীন থেকে উদ্ধার সরঞ্জামও সামনের সারির উদ্ধারকারীদের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
ভারতীয় উদ্ধারকারীরাও নেপাল সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছেন, বিশেষ করে রাসুয়ার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে।
তবে খারাপ আবহাওয়া ও সীমান্তের কাছে দুর্যোগের কারণে তৈরি হওয়া একটি হ্রদের পানি বাড়তে থাকায় শুক্রবার থেকে উদ্ধারকাজ কয়েক দফা বন্ধ রাখতে হয়েছে। হ্রদটি উপচে পড়লে নেপালের নদীগুলোতে নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার আবহাওয়া কিছুটা ভালো হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতা আবার গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়ার জেলা প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।