দীর্ঘ বন্ধে মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে ‘বিস্ফোরণ’ হতে পারে, ট্রাম্পের এই দাবির বাস্তবতা কী?
মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য এখন শুরু হতে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এক পরীক্ষা।
সিএনএন বলছে, যুদ্ধের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া তেলকূপগুলো আবার চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশ। হরমুজ প্রণালি আপাতত আবার নৌযান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে, আর যুদ্ধের কারণে যেসব তেলক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছিল, সেগুলোর ভালভ আবার খুলতে যাচ্ছেন উৎপাদনকারীরা।
তবে প্রশ্ন হলো—কূপগুলো কি আগের মতো বিপুল পরিমাণ তেল উৎপাদন করতে পারবে, নাকি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে উৎপাদন কমে যাবে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ চলাকালে বারবার দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ চাপের কারণে তেলক্ষেত্রে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে এবং স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন আশঙ্কা অত্যন্ত অতিরঞ্জিত।
কেন বন্ধ হয়েছিল তেলকূপ?
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের সময় কার্যত বিদেশি তেলবাহী জাহাজের জন্য বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালি। ফলে উৎপাদিত তেল ও গ্যাস সংরক্ষণের জায়গা দ্রুত ফুরিয়ে আসতে থাকে।
একই সময়ে ড্রোন হামলার আশঙ্কায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরাকের বেশ কয়েকটি স্থাপনায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের মুখে ইরানকেও চলতি মাসে নিজেদের কিছু তেলকূপের উৎপাদন বন্ধ করতে হয়।
তবে তেলকূপ বন্ধ করা কোনো সুইচ বন্ধ করার মতো সহজ কাজ নয়। এটি একটি জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়া, যার জন্য কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।
ভূগর্ভে কী ঘটে?
তেলকূপ বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ চাপের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। এতে তেলের ভান্ডারের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। কখনও কখনও পানি প্রবেশ করতে পারে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদন কমিয়ে দেয়।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ম্যাককোয়ারি গ্রুপের বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস কৌশলবিদ বিকাশ দ্বিবেদী বলেন, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কূপগুলো আবার চালু করার পর কী হবে।
তার ভাষায়, ‘এটা অনেকটা চকোলেটের বাক্সের মতো—ভেতরে কী আছে, আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।’
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে পাম্প, পাইপলাইন ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে মরিচা ধরতে পারে। বালু ও ধ্বংসাবশেষ জমে যেতে পারে। কূপের সুরক্ষাব্যবস্থার ক্ষতি হলে তেল বা গ্যাস লিক হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সত্যিই কি বিস্ফোরণ ঘটতে পারে?
ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ সময় তেল উৎপাদন বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ চাপের কারণে তেলক্ষেত্র প্রায় নিশ্চিতভাবেই বিস্ফোরিত হতে পারে এবং সেই তেল আর কখনও উত্তোলন করা সম্ভব হবে না।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা এতটা নাটকীয় নয়।
জেপি মরগানের বৈশ্বিক পণ্যবাজার কৌশল বিভাগের প্রধান নাতাশা কানেভা বলেন, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে স্থায়ী উৎপাদন ক্ষতির আশঙ্কা অনেকটাই অতিরঞ্জিত।
এর আগেও বহুবার দীর্ঘ সময়ের জন্য তেলকূপ বন্ধ রাখা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির শুরুতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির চাহিদা ধসে পড়ায় তেলের দাম ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নেতিবাচক পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। তখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উৎপাদকরা তেলকূপ বন্ধ করলেও উল্লেখযোগ্য স্থায়ী ক্ষতি হয়নি।
ওপেকের উৎপাদন সীমার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ অতীতেও অস্থায়ীভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের তেল খাত এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিজ্ঞ এবং এবারও তারা একইভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে।
বরং কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখার ফলে ভূগর্ভস্থ চাপ পুনর্বিন্যাস হয় এবং পরে আগের তুলনায় বেশি তেলও উত্তোলন সম্ভব হয়।
উৎপাদন পুনরায় শুরু করাও সহজ নয়
যুদ্ধ শেষে তেল উৎপাদন পুনরায় শুরু করাও কোনো সুইচ টিপে চালু করার মতো বিষয় নয়।
কূপগুলো ধীরে ধীরে, কয়েক সপ্তাহ ধরে চালু করতে হবে যাতে তেলের ভান্ডারের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। উৎপাদনকারীদের পানি ও গ্যাস প্রবেশ করিয়ে ভূগর্ভস্থ চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক তেলক্ষেত্র বড় আকারের এবং একে অপরের কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে বিভিন্ন কোম্পানি ও দেশের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন হবে। তা না হলে ধস, লিকেজ বা বড় ধরনের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন সাময়িকভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও শিল্পখাত এসব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে আগে থেকেই জানে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও রয়েছে।
তাই যুদ্ধ-পরবর্তী এই অধ্যায়ের শেষটা নাটকীয় বিস্ফোরণে নয়, বরং ধীরগতির প্রযুক্তিগত পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়েই হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।