এক্সপ্লেইনার

আইজ্যাক অ্যাকর্ডস: ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা ঘনিষ্ঠতার নেপথ্যে কী?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

২০২০ সালে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’। সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদানের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সেই উদ্যোগকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ছয় বছর পর, ২০২৬ সালে আরেকটি নতুন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে—‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’।

বৈশ্বিক আইন সংস্থা ডিএলএ পাইপার বলছে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই যৌথভাবে যে কাঠামো ঘোষণা করেছেন, তা কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় নয়; বরং লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের প্রভাব বিস্তার, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ একটি রাজনৈতিক জোট গঠন এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব মোকাবিলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

জেরুজালেমে ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ সই অনুষ্ঠান। ছবি: ইসরায়েল সরকার

আইজ্যাক অ্যাকর্ডস কী?

ইসরায়েলের সরকারি বিবরণ অনুযায়ী, আইজ্যাক অ্যাকর্ডস হলো একটি নতুন কৌশলগত কাঠামো, যার লক্ষ্য আর্জেন্টিনা, ইসরায়েল এবং পশ্চিম গোলার্ধের সমমনা দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

এতে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সন্ত্রাসবাদবিরোধী অবস্থান, ইহুদিবিদ্বেষ প্রতিরোধ এবং মাদক পাচারের বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে বর্ণনা করেছে ‘পশ্চিম গোলার্ধে সমমনা অংশীদারদের মধ্যে নতুন কৌশলগত সহযোগিতা কাঠামো’ হিসেবে। বিশেষভাবে এতে ইরানের প্রভাব ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তারের বিরুদ্ধে সমন্বয় বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের লাতিন আমেরিকান সংস্করণ। তবে এখানে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রশ্ন নেই, কারণ আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের মধ্যে আগে থেকেই কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। বরং লক্ষ্য হলো বিদ্যমান সম্পর্ককে কৌশলগত জোটে রূপ দেওয়া।

জেরুজালেমে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে করমর্দন করছেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

কেন ‘আইজ্যাক’, নেপথ্যের কাহিনী

‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর নামকরণ হয়েছিল ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলিমদের অভিন্ন পিতৃপুরুষ আব্রাহামের (ইব্রাহিম আ.) নাম অনুসারে। নতুন উদ্যোগটির নাম ‘আইজ্যাক’ রাখা হয়েছে আব্রাহামের পুত্র আইজ্যাকের (ইসহাক আ.) নাম থেকে।

আমেরিকান জুয়িশ কমিউনিটির মতে, এই নামের মাধ্যমে আয়োজকেরা এমন একটি জোটের ধারণা তুলে ধরতে চেয়েছেন, যা ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং পশ্চিমা রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।

আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ২০২৫ সালে তিনি ইসরায়েলের মর্যাদাপূর্ণ ‘জেনেসিস প্রাইজ’ লাভ করেন। পুরস্কারের অর্থ গ্রহণ না করে তিনি সেটি আইজ্যাক অ্যাকর্ডস বাস্তবায়নের জন্য ব্যবহারের আহ্বান জানান। পরে সেই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আমেরিকান ফ্রেন্ডস অব আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ নামে একটি অলাভজনক সংগঠন গঠন করা হয়।

এপির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্টে মিলেই এক মিলিয়ন ডলারের উদ্যোগ ঘোষণা করে বলেন, এর উদ্দেশ্য ইসরায়েল ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। শুরুতে উরুগুয়ে, পানামা ও কোস্টারিকাকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অবশেষে ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল জেরুজালেমে মিলেই ও নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস চালু করেন। অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন, যা উদ্যোগটির প্রতি ওয়াশিংটনের আগ্রহের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।

পৃথিবীর মানচিত্রে আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েল-আর্জেন্টিনা সম্পর্কের ইতিহাস

ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের শিকড় বেশ গভীরে প্রোথিত। ১৯৪৯ সালে আর্জেন্টিনা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় এবং দুই দেশ আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। লাতিন আমেরিকায় আর্জেন্টিনাই সবচেয়ে বড় ইহুদি জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল, যা দুই দেশের সম্পর্ককে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি দিয়েছে।

তবে এই সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯৬০ সালে নাৎসি যুদ্ধাপরাধী এডলফ আইখম্যানকে বুয়েনস এইরেস থেকে গোপনে ধরে নিয়ে যাওয়ায় দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক হলেও ১৯৯২ সালে ইসরায়েলি দূতাবাস এবং ১৯৯৪ সালে বুয়েনস এইরেসের এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ বোমা হামলা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দেয়।

আর্জেন্টিনার তদন্তে হামলাগুলোর জন্য ইরান ও হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়ী করা হয়, যা ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনাকে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় আরও ঘনিষ্ঠ করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট মিলেই ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপ নিতে শুরু করেছে। ‘আইজ্যাক অ্যাকর্ডস’ সেই দীর্ঘ সম্পর্কের সর্বশেষ এবং সম্ভবত সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী অধ্যায়।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং হাভিয়ের মিলেইর কোলাকুলি। ছবি: রয়টার্স

এই সম্পর্ক এখন কোন উচ্চতায়?

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস বলছে, বর্তমানে ইসরায়েল-আর্জেন্টিনার সম্পর্ক ইতিহাসের অন্যতম ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে রয়েছে।

মিলেই ক্ষমতায় আসার পর থেকে আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। তিনি প্রকাশ্যে নিজেকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে জায়নবাদপন্থী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং একাধিকবার ইসরায়েল সফর করেছেন।

মিলেইর সরকার ইতোমধ্যে জাতিসংঘে একাধিক ইস্যুতে ইসরায়েলপন্থী অবস্থান নিয়েছে; ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক দূরত্ব বাড়িয়েছে; ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইসরায়েলি ও আর্জেন্টাইন কর্মকর্তারা নতুন সহযোগিতার যেসব ক্ষেত্র ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই); সাইবার নিরাপত্তা; সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা সহযোগিতা; সুপারকম্পিউটিং; বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং সরাসরি বিমান যোগাযোগ।

ডিএলএ পাইপারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আর্জেন্টিনা নিজেকে এখন ইসরায়েলের জন্য লাতিন আমেরিকার প্রধান কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

বিশ্ব মানচিত্রে ইরান ও ইসরায়েলের অবস্থান। ছবি: সংগৃহীত

ইরান ফ্যাক্টর

আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক উপাদান সম্ভবত ইরান। এল পাইসের প্রতিবেদনে এমনই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুয়েনস এইরেসে ইসরায়েলি দূতাবাসে এবং এএমআইএ ইহুদি কমিউনিটি সেন্টারে ভয়াবহ হামলায় ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। আর্জেন্টিনার বিচারিক তদন্ত দীর্ঘদিন ধরে এসব হামলার পেছনে ইরানি কর্মকর্তা ও হিজবুল্লাহর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে এসেছে।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখেই মিলেই সরকার ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

আইজ্যাক অ্যাকর্ডস ঘোষণার সময়ও দুই দেশ বিশেষভাবে ‘পশ্চিম গোলার্ধে ইরানের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক বিস্তার’ মোকাবিলার কথা বলেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা যত বাড়বে, আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্ক তত বেশি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতাকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে।

লাতিন আমেরিকার ম্যাপ। ছবি: সংগৃহীত

সমর্থন ও সমালোচনা

আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের সমর্থকেরা বলছেন, এটি লাতিন আমেরিকাকে ইসরায়েলের প্রযুক্তি, কৃষি উদ্ভাবন, পানি ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করবে।

কিন্তু সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।

লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেছে। কিছু দেশ রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করেছে, আবার কেউ কেউ কূটনৈতিক সম্পর্কও সীমিত করেছে। এই বাস্তবতায় মিলেইর অবস্থান অঞ্চলটির মূলধারার কূটনৈতিক প্রবণতা থেকে আলাদা।

সমালোচকদের মতে, ইসরায়েলের সঙ্গে অত্যধিক ঘনিষ্ঠতা আর্জেন্টিনাকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

ভবিষ্যৎ কী?

আইজ্যাক অ্যাকর্ডসের ভবিষ্যৎ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে।

প্রথমত, মিলেই কতটা রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকতে পারেন। কারণ এই উদ্যোগটি অনেকাংশে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে যুক্ত।

দ্বিতীয়ত, অন্যান্য লাতিন আমেরিকান দেশ এতে যোগ দেয় কি না। ইসরায়েল ইতোমধ্যে অঞ্চলটির আরও কয়েকটি দেশকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। ইসরায়েল-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি আরও তীব্র হয়, তবে আইজ্যাক অ্যাকর্ডস কেবল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম না থেকে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক-নিরাপত্তা জোটে পরিণত হতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন কেবল দ্বিপক্ষীয় বন্ধুত্বের পর্যায়ে নেই। এটি একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রকল্পের রূপ নিচ্ছে, যার লক্ষ্য লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের উপস্থিতি শক্তিশালী করা, যুক্তরাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করা।

আইজ্যাক অ্যাকর্ডস সেই প্রকল্পের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক। ভবিষ্যতে এটি আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মতোই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে কি না, তা নির্ভর করবে এর সদস্য সংখ্যা, বাস্তবায়িত প্রকল্প এবং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক রাজনীতির ওপর।