ইরানের দেওয়া শর্ত ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’: ডোনাল্ড ট্রাম্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মার্কিন প্রস্তাবের জবাবে ইরানের দেওয়া শর্ত সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল রোববার তিনি শর্তগুলোকে ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’ বলে আখ্যা দেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এমনটি বলা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যের ফলে দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ওয়াশিংটনের দেওয়া সর্বশেষ শান্তি প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, নতুন করে কোনো মার্কিন হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দিতে দ্বিধা করবে না এবং হরমুজ প্রণালিতে আর কোনো বিদেশি যুদ্ধজাহাজ প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

তেহরানের দেওয়া পাল্টা প্রস্তাবের বিস্তারিত কোনো তথ্য না দিলেও নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত পোস্টে ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছেন।

ট্রাম্প লেখেন, আমি এইমাত্র ইরানের তথাকথিত প্রতিনিধিদের পাঠানো জবাব পড়লাম। এটি আমার পছন্দ হয়নি—এটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য!

এই বাদানুবাদ এমন এক সময়ে শুরু হলো যখন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ এবং তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত এই সংঘাত শেষ হবে না।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে নেতানিয়াহুর বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ শুরু করেছিল।

পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও প্রকাশ্যে তেহরান তাদের অনমনীয় অবস্থান বজায় রেখেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান রোববার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, আমরা কখনোই শত্রুর কাছে মাথা নত করব না। সংলাপ বা আলোচনার কথা বলার অর্থ এই নয় যে আমরা আত্মসমর্পণ করছি বা পিছু হটছি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে মার্কিন প্রস্তাবের যে উত্তর তেহরান পাঠিয়েছে, তাতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েল এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া, তেহরানের পক্ষ থেকে নৌ-চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়েছে।


তেহরানের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে যে মার্কিন প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো। এর উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের একটি স্থায়ী সমাধান এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা।

বর্তমান এই অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। সোমবার লেনদেনের শুরুতেই তেলের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০৪ দশমিক ০১ ডলারে পৌঁছেছে।

গতকাল প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু বলেন, যুদ্ধ শেষ করার আগে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অবশ্যই সরিয়ে নিতে হবে।

নেতানিয়াহু আরও দাবি করেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে ট্রাম্প তার সঙ্গে একমত। যদিও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন খুশি এটি সরিয়ে নিতে পারে এবং বর্তমানে এসব উপাদান কোথায় আছে সে বিষয়ে তীক্ষ্ণ নজরদারি রাখা হচ্ছে।

মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বেইজিং সফরকালে ট্রাম্প ইরানের তেলের অন্যতম প্রধান ক্রেতা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ওপর তেহরান ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালিতে কোনো ‘হস্তক্ষেপ’ নয়

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরান ওয়াশিংটনের কাছে নিজস্ব কিছু দাবি তুলে ধরেছে। তেহরান প্রস্তাব করেছে যে, তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের একটি অংশের ঘনমাত্রা ফেলবে এবং বাকি অংশ কোনো তৃতীয় দেশে স্থানান্তরিত করা হবে।

পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠানো এই জবাবে ইরান একটি নিশ্চয়তা চেয়েছে—যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় বা ওয়াশিংটন পরে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, তবে স্থানান্তরিত ইউরেনিয়াম যেন তাদের ফেরত দেওয়া হয়।

তবে ট্রাম্প ইরানের এই প্রতিক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করার সময় এ ধরনের কোনো খুঁটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ করেননি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ আরোপ করেছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয় এবং  বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়।

এরপর থেকে ইরান এই প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলো থেকে টোল আদায়ের একটি নিজস্ব পদ্ধতি চালু করেছে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, তেহরান আন্তর্জাতিক এই নৌপথ এবং বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও অন্যান্য জরুরি পণ্য পরিবহনের রুট নিয়ন্ত্রণ করবে—এটি ‘অগ্রহণযোগ্য’।

অন্যদিকে, মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি করেছে এবং মাঝেমধ্যে সেখানে আসা-যাওয়া করা জাহাজগুলোকে অকেজো দিচ্ছে বা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করছে।

একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর পর হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্রিটেন ও ফ্রান্স একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। এরইমধ্যে দেশ দুটি ওই অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে বাণিজ্য প্রবাহ স্বাভাবিক করার সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে মঙ্গলবার ব্রিটেন ও ফ্রান্স ৪০টিরও বেশি দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের নিয়ে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করবে।

তবে ইরান গতকালই হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্স যদি এই প্রণালিতে তাদের জাহাজ মোতায়েন করে, তবে তারা ‘তীব্র ও তাৎক্ষণিক জবাবের’ সম্মুখীন হবে।

ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদি এক্সে লিখেছেন, শুধুমাত্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানই এই প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে এবং এ বিষয়ে কোনো দেশের হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।

এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, হরমুজে যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা তাদের কখনোই ছিল না। বরং তারা ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপত্তা অভিযানের কথা চিন্তা করছে।

‘ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে’

সাম্প্রতিক বেশ কিছু উত্তেজনার পর গতকাল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে ড্রোন হামলা যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে আরও একবার নাড়িয়ে দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা দুটি ড্রোন সফলভাবে প্রতিহত করেছে।

কুয়েতও একটি হামলার চেষ্টার কথা জানিয়ে বলেছে, তাদের সশস্ত্র বাহিনী কুয়েতের আকাশসীমায় থাকা বেশ কিছু ড্রোন প্রতিহত করেছে। এ ছাড়া কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আবুধাবি থেকে আসা একটি মালবাহী জাহাজ কাতারের জলসীমায় ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে।

হামলার দায় কেউ স্বীকার না করলেও ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি খবর দিয়েছে, কাতারের উপকূলে আক্রান্ত হওয়া জাহাজটি মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজ ছিল।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে বলেন, আজ থেকে আমাদের সংযমের সময় শেষ। 

তিনি আরও বলেন, আমাদের কোনো জাহাজে হামলা হলে মার্কিন জাহাজ ও ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ইরান কঠোর ও চূড়ান্ত জবাব দেবে।