ইরানে বড় ধাক্কা খেল যুক্তরাষ্ট্র, আকাশে আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিমানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদন ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চিতভাবে ধ্বংস বা ভূপাতিত এয়ারক্রাফটের সংখ্যা অন্তত ১৬–এর বেশি, আর ক্ষতিগ্রস্তসহ মোট সংখ্যা ২০–এর কাছাকাছি বা তারও বেশি হতে পারে।
৩ এপ্রিল প্রকাশিত রয়টার্স, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, দ্য গার্ডিয়ান ও বিজনেস ইনসাইডারের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর মধ্যে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ইরানের ভেতরে ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি প্রথমবারের মতো নিশ্চিত করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে রয়টার্স জানায়, দুই ক্রুর একজনকে উদ্ধার করা গেলেও অন্যজন নিখোঁজ রয়েছে।
একই দিনে একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট-২ আক্রমণ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এই ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে মার্কিন হেলিকপ্টারও হামলার মুখে পড়ে, যা সংঘাতের ঝুঁকি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে ড্রোন খাতে। এনডিটিভি ও অন্যান্য প্রতিরক্ষা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নজরদারি ও নির্ভুল হামলার জন্য ব্যবহৃত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের অন্তত ১০টির বেশি ভূপাতিত হয়েছে। কিছু বিশ্লেষণে এই সংখ্যা আরও বেশি বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
ড্রোনের পাশাপাশি যুদ্ধবিমানের ক্ষতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত একাধিক এফ-১৫ শ্রেণির যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। এর মধ্যে কিছু শত্রুপক্ষের হামলায় ভূপাতিত হলেও, যুদ্ধের শুরুতে কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বা মিত্রপক্ষের ভুল আঘাতে কয়েকটি বিমান ধ্বংস হওয়ার ঘটনাও সামনে আসে, যা অপারেশনাল সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এছাড়া একটি কেসি-১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার রিফুয়েলিং বিমান দুর্ঘটনায় ধ্বংস হওয়ার তথ্যও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই ধরনের সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হারানো আকাশে দীর্ঘসময় ধরে অপারেশন চালানোর সক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষয়ক্ষতির পেছনে ইরানের বহুমাত্রিক প্রতিরক্ষা কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থলভিত্তিক সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (এসএএম) ব্যবস্থা, মোবাইল এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবহারে ড্রোন ও নিম্ন-উচ্চতার বিমানগুলোকে সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমকিউ-৯ রিপারের মতো ড্রোন তুলনামূলক ধীরগতির হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট ফ্লাইট প্যাটার্ন অনুসরণ করায় এগুলো ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এই ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোনের মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার, একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমানের মূল্য ৮০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত, আর কেসি-১৩৫-এর মতো সহায়ক বিমান আরও উচ্চমূল্যের কৌশলগত সম্পদ। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংঘাতের প্রথম দিকেই ক্ষতির পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা এখন আরও বেড়েছে।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে বেশি। ছবি: রয়টার্স
তবে এই ক্ষতির গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয় বরং কৌশলগত। বিশ্লেষকদের মতে, ড্রোনের বড় ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে, আর যুদ্ধবিমান হারানো আকাশে আধিপত্য বজায় রাখার সক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
সব মিলিয়ে ইরান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ক্ষয়ক্ষতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই যুদ্ধক্ষেত্রে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি জটিল হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও, প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মুখে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে।
