৬ জাহাজে হামলা, হরমুজে বিস্ফোরকবোঝাই নৌকা ও মাইন ব্যবহারের অভিযোগ
ইরানের বিস্ফোরকবোঝাই নৌযান ইরাকের জলসীমায় দুটি জ্বালানি ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে জাহাজ দুটিতে আগুন ধরে যায় এবং এক নাবিক নিহত হন। একই সময় উপসাগরে আরও চারটি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
আল জাজিরা বলছে, বুধবার গভীর রাতে ইরাকের কাছে উপসাগরে হামলার শিকার জাহাজ দুটি হলো মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী সেইফসি বিষ্ণু ও জেফিরোস। জাহাজ দুটিতে ইরাক থেকে জ্বালানি বোঝাই করা হয়েছিল বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন ইরাকের দুই বন্দর কর্মকর্তা। বন্দরের এক নিরাপত্তা সূত্র জানায়, জেফিরোস মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ।
বন্দরের এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পানি থেকে এক বিদেশি নাবিকের মরদেহ উদ্ধার করেছি।’
ইরাকের উদ্ধারকারী দল এখনও নিখোঁজ নাবিকদের খুঁজছে। নিহত নাবিক কোন জাহাজে ছিলেন তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
ইরাকের রাষ্ট্রায়ত্ত জেনারেল কোম্পানি ফর পোর্টস অব ইরাকের (জিসিপিআই) মহাপরিচালক ফারহান আল-ফারতুসি রয়টার্সকে বলেন, ‘ইরাকি পোর্টস কোম্পানির একটি নৌকা দুটি জাহাজ থেকে ২৫ জন নাবিককে উদ্ধার করেছে। তবে দুই জাহাজেই এখনও আগুন জ্বলছে।’
তিনি ইরাকের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে বলেন, ‘হামলার পর তেলবন্দরগুলোর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যদিও বাণিজ্যিক বন্দরগুলো চালু রয়েছে।’
বাগদাদে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাহমুদ আবদেলওয়াহেদ জানান, কর্মকর্তারা এই হামলাকে নাশকতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ইরাকি কর্মকর্তারা বলছেন, এটি ইরাকের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ তাদের মতে এই নাশকতার ঘটনা ঘটেছে ইরাকের জলসীমার ভেতরেই।’
রয়টার্স জানিয়েছে, বিস্ফোরকবোঝাই চালকবিহীন নৌযান ব্যবহারের খবর পাওয়া গেছে, যে ধরনের নৌযান ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। একই সময়ে ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে এই পথটি অবরুদ্ধ রয়েছে।
দুটি অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে প্রায় এক ডজন মাইন বসিয়েছে ইরান। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ইরানের ২৮টি মাইন পাতা নৌযানে হামলা চালিয়েছে। একইসঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, ইরান যদি বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে মাইন বসায় তবে এর কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ
ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সতর্ক করে বলেছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বৃহস্পতিবার ভোরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) কেন্দ্র জানায়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি থেকে প্রায় ৩৫ নটিক্যাল মাইল (৬৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার) উত্তরে একটি কনটেইনার জাহাজে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করে। এতে আগুন ধরে যায়। তবে জাহাজের ক্রুরা নিরাপদে আছেন।
Photos of Thai crew members aboard the cargo ship Mayuree Naree have emerged after the vessel was attacked near the Strait of Hormuz.
The Thai-flagged ship had departed Khalifa Port in the UAE on 11 March before coming under attack. Ship owner Precious Shipping said three crew… pic.twitter.com/XMD1YF9K4e— Khaosod English (@KhaosodEnglish) March 12, 2026
থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী শুকনো পণ্যবাহী জাহাজ ময়ূরী নারী বুধবার হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময় অজ্ঞাত দুই ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। এতে আগুন লাগে এবং ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান প্রেশাস শিপিং এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, তিনজন নাবিক নিখোঁজ এবং ধারণা করা হচ্ছে তারা ইঞ্জিন কক্ষে আটকা পড়েছেন।
বাকি ২০ জন নাবিককে নিরাপদে সরিয়ে ওমানে নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়।
থাই সংবাদমাধ্যম খাওসোদ ইংলিশে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওমানের নৌবাহিনীর উদ্ধারকৃত সেই নাবিকদের ছবি দেখা গেছে।
আইআরজিসি আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, জাহাজটিতে ‘ইরানি যোদ্ধারা গুলি চালিয়েছে’। এর মাধ্যমে সম্ভবত প্রথমবারের মতো সরাসরি হামলার কথা স্বীকার করল বাহিনীটি, যারা এর আগে সাধারণত ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহার করত।
জাপানের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ওয়ান ম্যাজেস্টিও বুধবার অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ থেকে প্রায় ২৫ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৪৬ কিলোমিটার) উত্তর-পশ্চিমে এই ঘটনা ঘটে বলে দুটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে।
জাহাজটির মালিক মিতসুই ওএসকে লাইনস এবং চার্টারকারী প্রতিষ্ঠান ওশেন নেটওয়ার্ক এক্সপ্রেস জানায়, জাহাজটি উপসাগরে নোঙর করা অবস্থায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়। পরে জাহাজের গায়ে পানির রেখার ওপরে সামান্য ক্ষতি দেখা গেছে।
তারা জানায়, সব নাবিক নিরাপদে আছেন এবং জাহাজটি এখনও চলাচলের উপযোগী। ঘটনার কারণ তদন্ত করা হচ্ছে।
আরও একটি বাল্ক ক্যারিয়ার দুবাইয়ের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৫০ নটিক্যাল মাইল (৯৩ কিলোমিটার) দূরে অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে বলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো জানিয়েছে।
মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী স্টার গুইনেথ জাহাজটির গায়ে আঘাত লাগে বলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানিয়েছে। জাহাজটির মালিক স্টার বাল্ক ক্যারিয়ার্স জানায়, জাহাজটি নোঙর করা অবস্থায় এর কার্গো হোল্ড অংশে আঘাত লাগে। এতে কোনো নাবিক আহত হননি এবং জাহাজটি কাত হয়ে পড়েনি।
রয়টার্সকে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সামরিক এসকর্ট দেওয়ার জন্য শিপিং শিল্পের প্রায় প্রতিদিনের অনুরোধ মার্কিন নৌবাহিনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের মতে, বর্তমানে হামলার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।