ইরানে হামলায় বৈশ্বিক তেলের বাজারে কী প্রভাব পড়বে
ইসরায়েলের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহের একটি বড় অংশের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সেই চিত্র।
ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান নিজেই প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন (৩৩ লাখ) ব্যারেল তেল উৎপাদন করে। যা বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রায় ৩ শতাংশ এবং ওপেক রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে চতুর্থ শীর্ষ উৎপাদনকারী। এর সঙ্গে দেশটির কৌশলগত অবস্থানের কারণে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে এর প্রভাব আরও অনেক বেশি।
হরমুজ প্রণালির এক পাশে অবস্থান ইরানের। সৌদি আরব ও ইরাকসহ গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ দিয়েই নৌপথে পরিবাহিত হয়।
সাপ্তাহিক ছুটির কারণে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ থাকার মধ্যেই আজ শনিবার ইরানের ওপর হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরানও। তবে এসব হামলায় কোনো জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে কি না, প্রাথমিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সরবরাহ ১ শতাংশ কমলে তেলের দাম সাধারণত প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
এই সংঘাত লম্বা সময় ধরে চলমান থাকলে কিছু বিষয়ের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
ইরানের সক্ষমতা
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইরানে উৎপাদিত প্রতিদিনের প্রায় ৩৩ লাখ ব্যারেল তেলের ৯০ শতাংশ রপ্তানি হয় চীনে। দেশটির সবচেয়ে বড় তেলক্ষেত্রগুলো হলো আহভাজ, মারুন এবং পশ্চিম কারুন ক্লাস্টার। সবগুলোর অবস্থান খুজেস্তান প্রদেশে।
ইরানের প্রধান শোধনাগার আবাদানে নির্মিত হয় ১৯১২ সালে। এই শোধনাগারটি প্রতিদিন ৫ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রক্রিয়াজাত করতে পারে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে রয়েছে বন্দর আব্বাস ও পারস্য উপসাগর স্টার রিফাইনারি। এখানে অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট (অত্যন্ত হালকা তেল) প্রক্রিয়াজাত করা হয়। রাজধানী তেহরানেও একটি শোধনাগার রয়েছে।
বিদেশে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের উত্তরে খার্গ দ্বীপ টার্মিনাল ইরানের প্রধান কৌশলগত কেন্দ্র। ইরানের আধা-সরকারি মেহর সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়েছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি এবং তেল টার্মিনালের বিষয়ে কোনো তথ্য উল্লেখ করেনি।
খার্গ দ্বীপে বহু লোডিং বার্থ, জেটি, দূরবর্তী মুরিং পয়েন্ট এবং কোটি কোটি ব্যারেল তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এখান থেকে প্রতিদিন ২ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই ইরানের তেল কেনা থেকে নিজেদের বিরত রেখেছে। তবে মূল্যে বড় অঙ্কের ছাড় পেলে চীনের বেসরকারি শোধনাগারগুলো এখনো ইরানের তেল কেনে। আন্তর্জাতিক পরিবহনের জন্য পুরোনো ট্যাংকার বহরের ওপর নির্ভর করে ইরান। অধিকাংশ সময় এ বহরগুলো ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে চলাচল করে।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে খার্গ দ্বীপে তাড়াহুড়ো করে ট্যাংকারে তেল ভরতে দেখা গেছে। সম্ভবত সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় যত বেশি সম্ভব তেল রপ্তানির উদ্দেশ্যে ইরান এ উদ্যোগ নেয় বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছরের জুনেও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আগে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
খার্গ দ্বীপে কোনো হামলা হলে তা ইরানের অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা হবে।
ইরানের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলো পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত। আসালুইয়েহ ও বন্দর আব্বাসে গ্যাস ও কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত, পরিবহন ও সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন, তাপ সরবরাহ, পেট্রোকেমিক্যালসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহারের জন্য।
এ অঞ্চলটি ইরানের কনডেনসেট রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র। গত জুনের যুদ্ধে একটি গ্যাস প্ল্যান্টে হামলায় বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হলেও তেলের দামে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েনি। কারণ ওই সময় কোনো রপ্তানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
আঞ্চলিক ঝুঁকি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পহেলা ফেব্রুয়ারি সতর্ক করে বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে ‘আঞ্চলিক যুদ্ধ’ শুরু হতে পারে। তেহরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
এটি এমন পর্যায়ে চরম পদক্ষেপ, যা দেশটি কখনো নেয়নি। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত ভয়াবহ।
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরের অধিকাংশ তেল এবং ডিজেল ও জেট জ্বালানির মতো পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানির প্রধান পথ। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম এলএনজি রপ্তানিকারক কাতারও এই পথের ওপর নির্ভরশীল।
কেবল সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। তবুও প্রণালি বন্ধ হলে রপ্তানিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে। ফলস্বরূপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাবে।
কিছু বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষস্থানীয় ট্রেডিং হাউজ এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন স্থগিত করেছে।
আজ অন্তত চারটি বাণিজ্যিক সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
একটি শীর্ষ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী বলেন, ‘আমাদের জাহাজগুলো কয়েকদিনের জন্য চলাচল করবে না।’ স্থির থাকবে।
ইইউর সামুদ্রিক মিশন ‘অপারেশন অ্যাসপাইডস’ জাহাজ চলাচল খাতের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছে, ‘ইরানে হামলার পর জাহাজে হামলার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
অ্যাসপাইডস এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে ইসরায়েলি ও মার্কিন জাহাজের ওপর নতুন হামলার হুমকি দিয়েছে এবং সমুদ্রে প্রাণ রক্ষায় সহায়তা করতে তারা প্রস্তুত রয়েছে।’
এর আগে চলতি মাসে অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর রপ্তানি বাড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ব্লুমবার্গের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের তেল রপ্তানি চলতি প্রথম ২৪ দিনে গড়ে প্রতিদিন ৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন (৭৩ লাখ) ব্যারেলে পৌঁছায়, যা প্রায় তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলিয়ে রপ্তানি প্রায় ৬ লাখ ব্যারেল বেড়েছে।
অতীতে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে। ২০১৯ সালে সৌদি আরব তাদের আবকাইক তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ স্থাপনায় ড্রোন হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পক্ষে দীর্ঘ সময় হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখা সম্ভব নয়, তাই জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করার মতো সীমিত পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
গত বছরের যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার জাহাজ ইরান উপকূলের কাছে জিপিএস জ্যামিংয়ের শিকার হয়েছিল। যার ফলে একটি ট্যাংকার দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়া সমুদ্র মাইন ব্যবহারের হুমকিও আগে দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামোতে পাল্টা হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তেহরানকে চীনের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে। চীন উপসাগরীয় তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। পাশাপাশি জাতিসংঘে ভেটো দিয়ে ইরানকে সমর্থনও দিয়েছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিক্রিয়া
গত জুনের যুদ্ধে তেলের দাম তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছিল। লন্ডনে ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৮০ ডলারের ওপরে ওঠে। তবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় এই দাম দ্রুত কমে যায়।
এরপর অতিরিক্ত সরবরাহের আশঙ্কা বাজারে প্রাধান্য পায় এবং ২০২৫ সালে তেলের দাম প্রায় ১৮ শতাংশ কমে যায়।
তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর দাম ১৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।