কেন আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা পাকিস্তানের
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর সীমান্ত সংঘাত চরম আকার ধারণ করার মধ্যেই আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ বেশ কিছু শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান।
হামলায় ২৭০ তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। আফগানিস্তানও ইতোমধ্যে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। হামলায় ১২ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
আজ শুক্রবার দুপুরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা করেছেন, আফগানিস্তানের তালেবান প্রশাসনের বিরুদ্ধে তারা 'প্রকাশ্য যুদ্ধ' চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে পাকিস্তান প্রথম বিমান হামলা শুরু করে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছিলেন, সীমান্তে ডুরান্ড লাইন বরাবর পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগানিস্তান 'বড় আকারের অভিযান' চালাচ্ছে।
দ্য ডনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান আফগানিস্তানে যে সামরিক হামলা চালাচ্ছে তার নাম দিয়েছে ‘অপারেশন গজব লিল হক’ বা ‘ন্যায়ের হামলা’।
কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনার মধ্যে কেন এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত শুরু হলো? আল জাজিরা বলছে, গতরাতে শুরু হওয়া এ সংঘাতের পেছনে দীর্ঘমেয়াদি কারণ রয়েছে।
ডুরান্ড লাইন বিতর্ক
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখা ডুরান্ড লাইনকে কাবুল কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি। সীমান্ত এলাকায় উগ্রগোষ্ঠীদের নিরাপদ আশ্রয়, শরণার্থী আসা-যাওয়া, সীমান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ দেশ দুটির সম্পর্ক বৈরী হয়েছে গত কয়েক দশকে।
২০২১ সালে তালেবান পুনরায় আফগানিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে এই সম্পর্ক কখনো সতর্ক অবস্থানে থেকে ইতিবাচক হয়েছে, আবার কখনো প্রকাশ্যে শত্রুভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে। সংঘর্ষের কারণে প্রায়ই সীমান্তে পারাপার বন্ধ করে দেওয়া হয়, যার কারণে বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ব্যাহত হয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, 'রাতের আঁধারে চালানো এই হামলায় দুই দেশের মধ্যে ‘উত্তেজনা’ বিপজ্জনক দিকে গেল।'
টিটিপি ইস্যু
পাকিস্তান অভিযোগ করে আসছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবানকে (টিটিপি) আফগানিস্তান প্রশ্রয় দিচ্ছে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আত্মঘাতী হামলার জন্য টিটিপিসহ কয়েকটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে দায়ী করে পাকিস্তান।
তবে তালেবান সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছেে, আফগানিস্তানের মাটি অন্য কোনো দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কাজে ব্যবহার হচ্ছে না।
প্রতিশোধ ও উত্তেজনা
দুই দেশের মধ্যে বর্তমান উত্তেজনা তৈরি হয়েছে পারস্পরিক অভিযোগ এবং প্রতিশোধকে ঘিরে। গতকাল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের বান্নু এলাকায় একটি নিরাপত্তা বহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ ২ সেনাসদস্য নিহত হন। গত সপ্তাহে, পাকিস্তানের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে বিস্ফোরকপূর্ণ গাড়ির ধাক্কায় ১১ সেনাসদস্য ও এক শিশু নিহত হয়। পরে ওই গাড়িতে থাকা হামলাকারীকে আফগান নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করে পাকিস্তান। এছাড়া গত ৬ ফেব্রুয়ারি ইসলামাবাদের একটি মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় অন্তত ৩১ জন নিহত ও ১৭০ জন আহত হন।
আজ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেছেন, ‘আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।’
দুই দেশের মধ্যে চলা সংঘাতের ধারাবাহিকতার মধ্যে গত অক্টোবরে তুরস্ক ও কাতারের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হয়।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সামি ওমারি আল জাজিরাকে বলেছেন, ২০২১ সাল থেকে আফগান ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে অন্তত ৭৫ দফা সংঘর্ষ হয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেন, 'তালেবানরাই এই পরিস্থিতি তৈরিতে বাধ্য করেছে। সীমান্তের উভয় পাশের নিরীহ নাগরিকদের স্বার্থে আমি আশা করব তালেবানরা পাকিস্তানে অনুপ্রবেশ ও সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করবে।'
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আফগানিস্তান সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক পার্ল পান্ড্য আল জাজিরাকে বলেন, 'আফগান প্রশাসন যদি টিটিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয় তবে অনিবার্যভাবে পরিস্থিতির গুরুতর অবনতি হবে।’
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া কর্মসূচির পরিচালক এলিজাবেথ থ্রেলকেল্ড বলেন, 'পাকিস্তান আরও আক্রমণাত্মক ও শক্তিশালী হামলা করতে পারে।'
তবে, পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে আফগানিস্তান খুব একটা সুবিধা করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিশ্লেষক আব্দুল বাসিত বলেন, 'পাকিস্তানের তুলনায় সামরিক শক্তিতে সক্ষমতা কম থাকায় আফগান তালেবানরা পাল্টা-হামলার জন্য অপ্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তারা আত্মঘাতী বোমা হামলার দিকে যেতে পারে।'
কুগেলম্যান বলেন, 'পাকিস্তান এখন জঙ্গি স্থাপনার পরিবর্তে সরাসরি তালেবান সরকারের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা করছে। এর অর্থ তারা এখন সরাসরি তালেবান শাসনব্যবস্থাকেই টার্গেট করছে।'
