ভেনেজুয়েলা যত সহজ ছিল, ট্রাম্পের ইরান অভিযান তত সহজ হবে কি?
পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার চুক্তিতে ইরানকে রাজি করাতে দেশটিতে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইতোমধ্যে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
জাহাজ ট্র্যাকিং ডেটার বরাতে বিবিসি জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধজাহাজ ‘ইউএসএস মাহান’ একই পথ অনুসরণ করেছে। বুধবার এটি মরক্কোর আটলান্টিক উপকূলে ছিল এবং বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে একই এলাকায় যুদ্ধবিমানবাহী মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
গত ২ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় মাত্র ২ ঘণ্টার অভিযান চালিয়ে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে নিয়ে যায় মার্কিন সেনা ও গোয়েন্দা বাহিনী। অভিযানের বিপরীতে ভেনেজুয়েলা কোনো ধরনের প্রতিরোধই করতে পারেনি।
গত জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প যখন বিশাল ও শক্তিশালী নৌ-বহর ‘আর্মাডা’ মোতায়েন করেন, তখন তিনি এটার সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের তুলনা করেছিলেন।
এখন প্রশ্ন হলো—ভেনেজুয়েলায় যেভাবে এত সহজে অভিযান চালাতে পারল মার্কিন বাহিনী, ইরানের ক্ষেত্রে কি বিষয়টি তত সহজ হবে?
বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন, ইরানে আক্রমণ ভেনেজুয়েলা অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল হবে এবং এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, প্রতিরোধ, প্রশমন ও সমাধান নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সিনিয়র উপদেষ্টা আলি ভায়েজ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘ইরানে সামরিক অভিযান সহজ হবে না। এখানে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানির ঝুঁকি আছে। এখানে ট্রাম্পকে অনেককিছু হিসাব-নিকাশ করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, জানুয়ারিতে মার্কিন অভিযানের আগে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা তুলনামূলক অরক্ষিত ছিল। বিপরীতে, ইরানের কাছে আছে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম ও বৈচিত্র্যপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ।
গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ১ হাজার ২০০ মাইলের বেশি দূরে আঘাত হানতে সক্ষম। এর আওতায় মধ্যপ্রাচ্যের সবগুলো মার্কিন ঘাঁটি ও ইসরায়েল চলে আসে।
আজ শনিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীতে সামরিক মহড়ার সময় ইরান প্রথমবারের মতো ৯৩ মাইল পাল্লার সমুদ্রভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘তেহরানের কৌশল হলো দ্রুত অস্থিরতা তৈরি করা, যেন যুদ্ধের প্রভাব বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।’
অন্যদিকে, ইরানের প্রক্সি বা সহযোগী বাহিনীগুলো মার্কিন বাহিনীকে বিপদে ফেলতে পারে। লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথির মতো প্রক্সি বাহিনীগুলো যদি মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে যায়, তা হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাড়তি চাপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হুথি বাহিনী লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে পুনরায় আক্রমণ শুরু করতে পারে।
অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের সঙ্গে ইরানের নেতৃত্বের রয়েছে পার্থক্য। মাদুরো প্রশাসন ছিল মূলত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বৈরতন্ত্র, যেখানে ক্ষমতা মাদুরো ও তার ঘনিষ্ঠ মহলের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল। মার্কিন অভিযানে মাদুরোকে বন্দি করার পর দেশের শাসন কাঠামো দ্রুত বদলে যায়। অপরদিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পাশাপাশি শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি) দেশটির শাসন ব্যবস্থার নিরাপত্তা দেয়, যা একটি ধর্মীয় আদর্শিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে।
এদিকে, ইরান বারবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে, যেটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ। বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই চ্যানেল দিয়ে যায়। সমুদ্রপথে বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ভরটেক্সার পরিচালক ক্লেয়ার জংম্যান বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে যোগাযোগ ব্যাঘাত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যাবে।’
তবে এটাকে ইরানের জন্য ‘নিজের পায়ে কুড়াল মারার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ। তিনি বলেন, ‘হরমুজ বন্ধ করলে ইরান নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ তখন তারা চীনে তেল রপ্তানি করতে পারবে না।’
এ ছাড়া, ইরানের রাজধানী তেহরান পারস্য উপসাগর থেকে ৪০০ মাইল ভেতরে, যেখানে সরাসরি অভিযান চালিয়ে তা দখল করে নেওয়া মার্কিন বাহিনীর জন্য বেশ কঠিন হতে পারে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি থাকায় ওই দেশগুলো ইরানে মার্কিন হামলার নেতিবাচক প্রভাবের বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে আছে।
গত জানুয়ারিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছিল, তারা কোনো হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থান নিলেও শেষ পর্যন্ত ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে তারা রক্ষা নাও পেতে পারে।
মার্কিন হামলা শুরু হলে ইরান পাল্টা ইসরায়েলের প্রধান শহরগুলোতে আঘাত হানতে পারে। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, গত জুনের যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করে ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছিল। তবে, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে গাজায় হামাসের এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর আক্রমণ মোকাবিলা করায় বর্তমানে ইসরায়েলের ইন্টারসেপ্টর মজুদ কমে আসছে।
ভাকিল বলেন, ‘ইরানি কর্মকর্তারা হয়তো মনে করেন যে বড় আকারের আঞ্চলিক যুদ্ধের “আতঙ্কে” ট্রাম্প ইরানে হামলা করা থেকে বিরত থাকতে পারেন।’
তবে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি শেষ পর্যন্ত ইরানে হামলা চালান, তবে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে তার একটি বিবরণ দিয়েছে বিবিসি।
মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনী ইরানের বিপ্লবী গার্ড (আইআরজিসি), বাসিজ বাহিনী, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট হামলা চালাতে পারে। এতে দুর্বল হয়ে পড়া ইরান সরকারের পতন ঘটতে পারে। তবে ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপ অনেক সময় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
আবার, ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের সরকারি কাঠামো টিকে থাকলেও তারা রাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন করতে বাধ্য হতে পারে। এক্ষেত্রে হয়তো ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত করতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যে মিলিশিয়াদের সমর্থন বন্ধ করতে পারে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন কমে যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, ইরানে মার্কিন হামলার ফল হিসেবে বর্তমান খামেনি শাসনের অবসান হবে এবং সামরিক শাসন জারি হবে।
তবে, ইরান সরকারের পতন হলে শুধু দেশজুড়ে নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো ইরানে গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। কুর্দি, বেলুচ বা আজারবাইজানীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বিশাল মানবিক বিপর্যয় এবং শরণার্থী সংকট তৈরি হবে।