এক্সপ্লেইনার

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরও কি ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে পারেন?

মোজাক্কির রিফাত
মোজাক্কির রিফাত

ট্রাম্প গত বছর ‘লিবারেশন ডে’ নামে একটি কর্মসূচির মাধ্যমে নতুন শুল্ক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। এর আওতায় বিশ্বের প্রায় সব দেশ থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোর পণ্যও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু গতকাল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ে দেশটির নতুন বাণিজ্য নীতিতে বড় ধাক্কা লাগে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত বৈশ্বিক আমদানি শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে।

আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, আদালতে ৬-৩ ব্যালটের ব্যবধানে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি অবৈধ ঘোষিত হয়।

আদালতের ভাষ্য, প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে এত বিস্তৃত শুল্ক আরোপ করে সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করেছেন। তিনি এককভাবে আইনসভা হিসেবে কাজ করতে পারেন না।

আদালতের রায়ের ভিত্তি

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্ক আরোপে ট্রাম্প ১৯৭৭ সালের ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ) ব্যবহার করেন। 
এই আইন প্রেসিডেন্টকে জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে বিদেশি অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেয়।

কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, অর্থনৈতিক লেনদেন ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘নতুন শুল্ক আরোপ’ এক জিনিস নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কর ও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। 
প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায়ে উল্লেখ করেন, আইইইপিএর মূলত জরুরি আর্থিক পদক্ষেপের জন্য—পুরো বাণিজ্য নীতি বদলে দেওয়ার জন্য নয়।

তিনি বলেন, কংগ্রেস কখনোই এই আইনটি এমনভাবে তৈরি করেনি—একজন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া থেকে শুরু করে মেক্সিকো, কানাডা বা ব্রিটেনের মতো মিত্র দেশগুলোর ওপর ঢালাওভাবে শুল্ক চাপিয়ে দেবেন।

আদালত আরও স্পষ্ট করে দেয়, প্রেসিডেন্ট বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও কংগ্রেস ক্ষমতা না দিলে নতুন বৈশ্বিক শুল্ক বসাতে পারেন না।

প্রশাসনের যুক্তি

আল জাজিরা জানায়, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের বাণিজ্য ঘাটতি, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং অবৈধ ফেন্টানিল প্রবাহের মতো একাধিক জাতীয় জরুরি পরিস্থিতির মুখে রয়েছে বলে যুক্তি দেয় ট্রাম্প প্রশাসন।

তাদের মতে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইইইপিএর ব্যবহার যৌক্তিক ছিল।

তবে আদালত এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। বিচারপতিরা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ঘাটতি কোনো আকস্মিক জাতীয় জরুরি অবস্থা নয়, যার কারণে জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করা যায়।

ভিন্নমতের অবস্থান

ওই রায়ে ছয়জন বিচারপতি একমত হলেও তিনজন ভিন্নমত দেন। তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট ভুল আইন ব্যবহার করেছেন, কিন্তু তার বাণিজ্যিক ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। অর্থাৎ, অন্য আইনের মাধ্যমে শুল্ক আরোপের পথ খোলা রয়েছে।

১৭৫ বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন

রায়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ইতোমধ্যে আদায় করা শুল্কের কী হবে?

বার্তাসংস্থা এপির তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ১৩০ থেকে ১৩৩ বিলিয়ন ডলার শুল্ক আদায় করেছে।

যেহেতু এই শুল্ক অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, তাই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ ফেরতের দাবি করতে পারে।

ভিনসন অ্যান্ড এলকিন্স ল ফার্মের পার্টনার এবং বাণিজ্য বিষয়ক আইনজীবী জয়েস আদেতুতু এপিকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর সুদসহ রিফান্ডের পরিমাণ ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়াতে পারে। এই বিপুল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতায় পরিণত হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।

ট্রাম্পের সামনে বিকল্প

কূটনীতি বিষয়ক মার্কিন সংস্থা কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশনস জানায়, সুপ্রিম কোর্টের রায় ট্রাম্পকে পুরোপুরি থামাতে পারেনি। বরং তাকে কৌশল বদলাতে বাধ্য করেছে। তার বিকল্প কৌশল হতে পারে:

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪-এর ধারা ১২২ যা প্রেসিডেন্টকে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ ও অন্যান্য বিশেষ আমদানি বিধি-নিষেধের মাধ্যমে অর্থ-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো মোকাবিলার ক্ষমতা দেয়।

এই ধারায় বিদেশি লেনদেনের ভারসাম্যে ঘাটতি হলে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করতে পারেন প্রেসিডেন্ট। তবে কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে, তা ১৫০ দিনের বেশি স্থায়ী হয় না।

কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশনসের ভাষ্য, ট্রাম্প ইতোমধ্যে ১৫ শতাংশ ভিত্তিমূলক শুল্ক ঘোষণার পথে হাঁটছেন।

দ্বিতীয়ত, ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্ট ১৯৬২-এর ধারা ২৩২ ধারা প্রেসিডেন্টকে একটি বিশেষ ক্ষমতা দেয়। যদি কোনো পণ্য বিদেশ থেকে বেশি পরিমাণে আমদানির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবে তিনি সেই আমদানির ওপর শুল্ক বসাতে পারেন। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেও শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় এই ধারা।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে এই ধারা ব্যবহার করেছিলেন।

তৃতীয়ত, ট্রেড অ্যাক্টের ধারা ৩০১ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট। আবার যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি লঙ্ঘন করে আমেরিকার ব্যবসায়িক স্বার্থে বাধা সৃষ্টি করে, তবে প্রেসিডেন্ট সেই দেশের ওপরও অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করতে পারেন।

এই ধারা ব্যবহার করে নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।

আন্তর্জাতিক প্রভাব

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই রায়কে 'সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ' করছে এবং জার্মানির শিল্পপতিদের জোট এটিকে 'নিয়ম-ভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্য একটি শক্তিশালী সংকেত' হিসেবে দেখছে।

কাউন্সিল অফ ফরেন রিলেশনস বলছে, রায়ের পর বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। মিত্র দেশগুলোও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নতুন শুল্কের আশঙ্কায় বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আবারও উত্তেজনাপূর্ণ হতে পারে।

বিবিসি জানিয়েছে, কানাডা ইতোমধ্যে মার্কিন-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তি পর্যালোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এদিকে ট্রাম্পের নতুন ১৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি বিশ্ববাজারকে আবারও অস্থির করে তুলেছে।

নতুন করে বাণিজ্য যুদ্ধ

সুপ্রিম কোর্টের নতুন রায়ে ‘ট্যারিফ ম্যান’ বা শুল্ক-রাজ হিসেবে পরিচিত ট্রাম্প থামছেন না এখনই। ঢালাও বৈশ্বিক শুল্কের বদলে এখন তাকে আরও সুনির্দিষ্ট এবং আইনিভাবে টেকসই পথ খুঁজতে হবে।

গার্ডিয়ানের ভাষ্য, বিলিয়ন ডলারের রিফান্ড গেম এবং প্রেসিডেন্টের নতুন আইনি প্যাঁচ মার্কিন অর্থনীতিকে আগামী কয়েক বছর এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখবে।

তাই এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কি বিকল্প আইনি পথ ব্যবহার করে তার বাণিজ্যিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে পারবেন? নাকি কংগ্রেস ও আদালতের সীমারেখাই শেষ যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির ভবিষ্যৎ করবে?

আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের ফলই তা স্পষ্ট করবে।