ধার-দেনা করে খাবার কিনছে মেসির দেশের মানুষ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসির দেশ আর্জেন্টিনা অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আয়–ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতায় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। ফলে লাতিন আমেরিকান দেশটিতে এখন অনেক পরিবারকে নিত্যপণ্যের খরচ মেটাতে ধার-দেনার আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস এলাকার ফ্লোরেনসিও ভারেলা শহরে একটি হার্ডওয়্যার দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন ৪৩ বছর বয়সী দিয়েগো নাকাসিও। তার স্ত্রীও একটি দোকানে কাজ করেন।

নাকাসিও বলছিলেন, মাসের কত তারিখ চলছে তা বুঝতে আর ক্যালেন্ডারের প্রয়োজন হয় না। দুজনের বেতন মাসের ১৫ তারিখের দিকেই শেষ হয়ে যায়।

এরপর থেকে তারা বাড়তি কাজ খুঁজতে শুরু করেন। বিক্রি করার মতো বিভিন্ন জিনিস খুঁজে বের করেন। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। পরবর্তী মাসের বেতন পাওয়ার আগ পর্যন্ত খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে ধার নেন।

নাকাসিও আল জাজিরাকে বলেন, আমি কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। গত ২৫ বছর ধরে আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। আমাদের চাকরির আয়েই আমরা শূন্য থেকে একটি বাড়ি গড়েছি, একটি গাড়ি কিনেছি এবং আমাদের ১৭ বছরের ছেলেকে ভালো জীবন দিতে পেরেছি। অথচ এখন আগের চেয়ে ভালো চাকরি থাকা সত্ত্বেও পুরো মাসের খাবার জোগাড় করতে পারছি না।

তিনি বলেন, ঋণের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা আপনাকে খুবই বিপজ্জনক এক চক্রে ফেলে দেয়। একবার কিস্তি বকেয়া হয়ে গেলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমার পরিচিত বেশিরভাগ মানুষই একই সংকটে। আমরা টানা দুশ্চিন্তা আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। মনে হচ্ছে যেন এ ফাঁদ থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।

নাকাসিওর অভিজ্ঞতা এখন অনেকের বাস্তবতা। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে আর্জেন্টিনা গ্রান্দে–র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে সঞ্চয় ব্যবহার করছেন, ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বিক্রি করছেন অথবা ব্যাংক কিংবা আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নিচ্ছেন।

ফুন্দাসিয়ন পেনসারের আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ আর্জেন্টাইন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে বিভিন্ন কার্যক্রম বা সেবায় কাটছাঁট করেছেন।

আর্জেন্টিনা গ্রান্দে ইনস্টিটিউটের সমাজবিজ্ঞানী ও গবেষক এবং প্রতিবেদনের অন্যতম লেখক ভিওলেতা কারেরা পেরেইরা আল জাজিরাকে বলেন, আর্জেন্টিনার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে উদ্বেগের বিষয় হলো—এক বা একাধিক চাকরি থাকা সত্ত্বেও মানুষ বাড়ি, গাড়ি বা গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার জন্য নয়, বরং খাবার কেনার জন্য ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দায়িত্ব নেওয়া আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই দাবি করেন, সরকারি ব্যয়ে কাটছাঁট করে রাজস্ব ভারসাম্য অর্জন এবং তার কৃচ্ছ্রসাধনমূলক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করেছে এবং লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তার এই নীতিকে সমর্থন দিচ্ছে এবং আর্জেন্টিনার বৈদেশিক ঋণের রেকর্ড পরিমাণ থাকা সত্ত্বেও ২০২৬ ও ২০২৭ সালে ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এবং আরও হতাশাজনক একটি চিত্র সামনে আসে।

আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে গতি এলেও প্রবৃদ্ধি অসম ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাংকিং ও কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও উৎপাদন ও বাণিজ্য খাতে বড় পতন হয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় বহু কারখানা ও দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্য কেনা কমেছে। খুচরা বিক্রেতারা ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাসের কথা জানিয়েছেন।

এর পাশাপাশি রয়েছে মূল্যস্ফীতি—আর্জেন্টিনার মতো দেশের ক্ষেত্রে যা নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রয়োজনীয় বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার জন্য এই মূল্যস্ফীতি স্থির রাখা জরুরি।

২০২৩ সালের শেষ দিকে দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি রেকর্ড পরিমাণ থাকলেও মিলেইয়ের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম হয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতি কম রাখার জন্য তার সরকার কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— বেতন না বাড়ানো বা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হারে রাখা এবং সস্তা আমদানির জন্য বাজার খুলে দেওয়া। এসব নীতির ফলে বহু মানুষের হাতে খরচ করার মতো অর্থ নেই এবং হাজার হাজার কারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।

সমালোচকদের মতে, মূল্যস্ফীতির সরকারি হিসাব প্রকৃত দামের ওঠানামাকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না। আর্জেন্টিনায় যে পরিমাপকে মূল্যস্ফীতি পরিমাপ করা হয়, তা ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা এখনকার পরিস্থিতিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কারেরা পেরেইরা বলেন, পরিসংখ্যানে আরও দেখা যায়, আর্জেন্টিনার অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বৈষম্য আরও বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, একদিকে কিছু খাতের মানুষের ভোগক্ষমতা বেড়েছে, ফলে বাড়ি, গাড়ি ও মোটরসাইকেলের বিক্রি বেড়েছে—যার একটি কারণ হলো আমদানি উন্মুক্ত করে দেওয়া। অন্যদিকে খাদ্য ও ওষুধের মতো জরুরি পণ্য কেনা কমছে। অর্থাৎ কেউ আগের চেয়ে বেশি কিনতে পারছে, আবার কেউ খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে।

আল জাজিরার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেক আর্জেন্টাইন বলেন, সংসার চালানো এখন কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাধিক কঠিন কাজ সামলানো, পুরোনো জামাকাপড়সহ ব্যবহৃত জিনিস বিক্রি করা, আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার নেওয়া, চড়া সুদের ঋণ খোঁজা এবং কম দামে কেনাকাটার চেষ্টা—এসবই এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা।

৪৩ বছর বয়সী শিক্ষক ও ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ভেরোনিকা মালফিতানো জানান, প্রেসিডেন্ট মিলেই যখন সরকারি ব্যয় কমান, তখন তার বেতনও এক চতুর্থাংশ কমে যায়। তিনি বলেন, আমি আত্মীয়স্বজন বা সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে একসঙ্গে বেশি করে কিনি। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করি বা  অল্প পরিমাণে ঋণ নিই। এই মাসে আমি শুধু ক্রেডিট কার্ডের ন্যূনতম কিস্তি পরিশোধ করেছি। সবকিছুই খুব চাপের। আমার পরিচিত সবাই একই অবস্থায় আছে।

গবেষণা বলছে, মালফিতানো একাই ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা করছেন না, তার মতো অনেকের একই অবস্থা। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আর্জেন্টিনায় সুপারমার্কেটের প্রায় অর্ধেক কেনাকাটার খরচ এখন ক্রেডিট কার্ডে পরিশোধ করা হচ্ছে, যা একটি রেকর্ড।

ঋণ গ্রহণ ও ঋণখেলাপির হার—দুটিই বেড়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত ঋণের প্রায় ১১ শতাংশ এখন অপরিশোধিত, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ।

৪৯ বছর বয়সী গ্রিসেলদা কুইপিলদোরের সঙ্গে থাকেন তার স্বামী, দুই মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনি। তিনি বলেন, পরিবারের কয়েকজন কাজ করলেও প্রতি মাসের ১৮ তারিখের মধ্যেই টাকা শেষ হয়ে যায় এবং তখন ঋণ নেওয়া শুরু করতে হয়।

তিনি বলেন, মাসের শুরুতে আমরা ধার–দেনার সঙ্গে বিভিন্ন বিল পরিশোধ করি, তারপরই টাকা ফুরিয়ে যায় এবং আবার ধার নিতে হয়। এটা এক অন্তহীন দুষ্টচক্র, যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন। আমরা পরিচিত–অপরিচিত সবার কাছ থেকেই ধার নিচ্ছি। আগে এমন ছিল না।

বিশ্লেষক ও অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ লুসিয়া কাভালেরো আল জাজিরাকে বলেন, আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক সংকট দীর্ঘদিনের হলেও এর প্রভাব এখন মানুষের ঘরে ঘরে আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

তিনি বলেন, ঋণ আর্জেন্টিনার জন্য দীর্ঘদিনের একটি গুরুতর সমস্যা। এখন এটি এমন এক সংকটে পরিণত হয়েছে, যেখানে অনানুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের বিস্তার বহু মানুষকে বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলেছে এবং তাদের কোনো বিকল্প থাকছে না।

এই পরিস্থিতিতে একটি রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব, নিম্নআয়ের লোকেরা যেন তাদের সব ঋণ একসঙ্গে করে কম সুদে দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধ করতে পারে। কাভালেরো বলেন, এই উদ্যোগে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও এটি মূল সমস্যাকে বড় পরিসরে সমাধান করতে পারছে না।

তিনি বলেন, ভালো লাগছে যে রাজনীতিবিদরা বুঝতে পারছেন ঋণ সাধারণ মানুষের জন্য বড় সমস্যা। তবে এই পদ্ধতিতে শুধু ঋণ দিয়ে ঋণ শোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু মূল সমস্যার সমাধানের জন্য বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।

কাভালেরো আল জাজিরাকে বলেন, ব্যাংকগুলোকে যেমন সহায়তা দেওয়া হয়, তেমনি পরিবারগুলোকেও সহায়তা দেওয়া উচিত। সবচেয়ে ভালো সমাধান হবে, বেতন এমনভাবে বাড়ানো যেন মানুষের খাদ্যের খরচের সঙ্গে সমন্বয় থাকে, আর তাদের ঋণ নিতে না হয়।

নিজের এবং পরিবারের এত সমস্যা নিয়েও নাকাসিও বলেন, তার মতো অনেক মানুষ এখনও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করেন।

তিনি বলেন, অন্তত আমাদের নিজের ঘর আছে। যদি তা না থাকত এবং ভাড়া দিতে হতো। জানি না তখন কী করতাম। আমি শুধু চাই সবকিছুর পরিবর্তন হোক, আমাদের জন্য, সবার জন্য। এভাবে চলতে পারে না।