সস্তা ব্র্যান্ডে ঝুঁকছেন ধূমপায়ীরা, কর রাজস্বের চেয়ে চিকিৎসা ব্যয় বেশি

আসিফুর রহমান
আসিফুর রহমান
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

সিগারেট থেকে কর রাজস্ব গত ২ দশকে ১১ গুণেরও বেশি বেড়েছে। দফায় দফায় কর ও দাম বাড়ানো হলেও দেশে ভোক্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেনি। এতে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের সিগারেটের কর কাঠামো জনস্বাস্থ্যে কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারছে কি না?

রাজস্ব বাড়ানো এবং তামাকের ব্যবহার কমানো—এই ২ লক্ষ্য সামনে রেখে বিগত সরকারগুলো প্রায় প্রতিবছরই সিগারেটের দাম ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথম লক্ষ্যটি অনেকাংশেই অর্জিত হয়েছে। সিগারেট সরকারের পরোক্ষ কর রাজস্বের অন্যতম বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে দ্বিতীয় লক্ষ্যটি অর্জন এখনো কঠিন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতিবছর তামাকজনিত রোগে প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা ও উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৭৩ হাজার ৬৩ কোটি টাকা।

গবেষণায় সহযোগিতা করে ইকোনমিকস ফর হেলথ। চলতি বছরের মার্চে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

এর মধ্যে তামাকজনিত অসুস্থতা ও অকালমৃত্যুর কারণে উৎপাদনশীলতা হারিয়েছে ৪২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা, আর সরাসরি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা।

বন উজাড়, ভূমির অবক্ষয়, বর্জ্য ও দূষণের কারণে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতিও হিসাবের মধ্যে ধরলে মোট অর্থনৈতিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮৭ হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা।

এর বিপরীতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সিগারেট থেকে কর রাজস্ব এসেছে ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাই শুধু রাজস্বের পরিমাণ দিয়ে সিগারেটের ওপর কর আরোপের সাফল্য মাপা উচিত নয়। তাদের মতে, এর বৃহত্তর লক্ষ্য হওয়া উচিত সিগারেটকে কম সাশ্রয়ী করে তোলা, নতুন ধূমপায়ী হওয়া নিরুৎসাহিত করা এবং ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করা।

তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে বিশ্বের অন্যান্য দেশ অভিজ্ঞতা নিতে পারে যে, সস্তা সিগারেট সহজলভ্য হলে কর বাড়িয়ে লাভ হয় না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সিগারেট থেকে কর রাজস্ব ২০০৬-০৭ অর্থবছরের ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০ হাজার ৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, বৃদ্ধি ১ হাজার শতাংশেরও বেশি।

তবে সিগারেট বিক্রি ২০০৬-০৭ অর্থবছরের ৪ হাজার ৫০০ কোটি শলাকা থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৮ হাজার ৪০০ কোটি শলাকায় পৌঁছায়, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিক্রি কমে ৬ হাজার ৫০০ কোটি শলাকায় নেমে এলেও এনবিআর কর্মকর্তা ও উৎপাদনকারীরা বলছেন, এতে ধূমপানের হার কমেছে—এমনটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিশ্লেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি তারাও মনে করেন, আনুষ্ঠানিক কর ব্যবস্থার বাইরে থাকা সস্তা ও অননুমোদিত সিগারেটের দিকে ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা অন্যতম প্রধান কারণ।

দেশে প্রিমিয়াম, উচ্চ, মধ্যম ও নিম্নমূল্যের—চার স্তরের সিগারেট কর কাঠামো রয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কম দামের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, আর বাজার হারিয়েছে বেশি দামের ব্র্যান্ডগুলো।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে উচ্চমূল্যের সিগারেট বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ দখল করতো। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে মাত্র ২ দশমিক ৮৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিপরীতে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে নিম্নমূল্যের সিগারেটের বাজার অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। আগের দশকের বড় একটি সময়ে তা ৭০ শতাংশের উপরে থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অংশ বেড়ে প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।

কর বাড়ানোর পর ভোক্তাদের প্রিমিয়াম বা উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ড থেকে কম দামের বিকল্প ব্র্যান্ডে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ‘ডাউনট্রেডিং’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক বলেন, বারবার কর বাড়ানো হলেও প্রত্যাশিত হারে ধূমপান কমানো সম্ভব হয়নি। কারণ সিগারেট এখনো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী এবং ভোক্তারা সহজেই কম দামের সিগারেটের দিকে চলে যেতে পারেন।

তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম বলেন, ‘নিম্নস্তরের একটি সিগারেট এখনো প্রায় ৬ টাকায় কেনা যায়, যেখানে একটি ডিমের দাম প্রায় ১২ টাকা। ধূমপান ছাড়তে মানুষকে উৎসাহিত করার মতো পর্যাপ্ত হারে দাম ও কর বাড়ানো হয়নি।’

তিনি বলেন, কম দামের সিগারেট সহজলভ্য থাকায় তরুণদের ধূমপানে আসক্ত হওয়া সহজ হচ্ছে এবং তামাকের ওপর কর জনস্বাস্থ্যে কম প্রভাব ফেলছে।

তামাক নিয়ন্ত্রণে সোচ্চার ব্যক্তি ও সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হিসেবে চারটি মূল্যস্তর কমিয়ে দুটি এবং শেষ পর্যন্ত এক স্তরের কাঠামোয় যাওয়ার সুপারিশ করে আসছেন। তারা পণ্যের মূল্যের পরিবর্তে উৎপাদনের পরিমাণের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট আবগারি কর আরোপের পক্ষেও মত দিয়েছেন।

বাংলাদেশের তামাকের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি), জাপান টোব্যাকো ইন্টারন্যাশনাল (জেটিআই) ও আবুল খায়ের টোব্যাকো। প্রতিষ্ঠান তিনটি মিলে মোট সিগারেট সরবরাহের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ করে।

বিএটিবি এখনো বাজারের শীর্ষ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। তারা পুরো প্রিমিয়াম সেগমেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে এবং উচ্চ, মধ্যম ও নিম্নমূল্যের বিভাগেও তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ২৫০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে সেটি বেড়ে ১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

তবে বাংলাদেশে কর ব্যবস্থার বাইরে অবৈধ সিগারেটেরও একটি বড় বাজার রয়েছে। এনবিআর ও শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি প্রতিষ্ঠান বাজারের ১২ থেকে ১৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে।

এ ব্যাপারে কথা বলতে একাধিকবার চেষ্টা করেও এনবিআর চেয়ারম্যানের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্বাস্থ্য ব্যয় বনাম রাজস্ব

অধ্যাপক ফারুক বলেন, সিগারেট খাত থেকে আদায় করা কর রাজস্বের চেয়ে ধূমপায়ীদের চিকিৎসা ব্যয় বেশি। এই অর্থনৈতিক বোঝার বড় অংশ সরাসরি পরিবারগুলোকে বহন করতে হয়।

বাংলাদেশের সিগারেট কর ব্যবস্থায় ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ রয়েছে, যা স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে সহায়তার জন্য ২০১৪ সালে চালু করা হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত এই সারচার্জ থেকে প্রতিবছর ৪৫০ কোটি থেকে ৫৫০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যার বেশির ভাগই এসেছে সিগারেট থেকে।

অধ্যাপক ফারুক বলেন, সমাজের ওপর সিগারেট ও তামাকের আনুমানিক বার্ষিক ব্যয়ের মাত্র অর্ধশতাংশের সমান এই অর্থ।

তিনি আরও বলেন, এই অর্থ আলাদা কোনো তহবিলে রাখা হয় না। ফলে তামাক নিয়ন্ত্রণ বা তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায় কত টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন।

পাবলিক হেলথ লইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্যসচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে এবং তামাকশিল্পের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমাতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্যের ক্ষতিকে সরকারি রাজস্বের মাধ্যমে যৌক্তিকতা দেওয়া আইনগত ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই অগ্রহণযোগ্য।’

বাংলাদেশে এমন অনেক শিল্প রয়েছে, যেগুলো এতটা গুরুতর স্বাস্থ্য ব্যয় তৈরি না করেই কর্মসংস্থান ও রাজস্ব সৃষ্টি করতে পারে, যোগ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, মানুষকে ধূমপানে আসক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখতে সরকার ছোটবেলা থেকেই জনসচেতনতা ও শিক্ষার ওপর আরও বেশি গুরুত্ব দেবে।

তিনি বলেন, ‘জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি বলবো, প্রচার-প্রচারণা নার্সারি পর্যায় থেকেই শুরু করা উচিত। যে প্রজন্ম এখনো ধূমপায়ী হয়ে ওঠেনি, তাদের মধ্যে সচেতনতা জোরদার করতে হবে এবং তারা যাতে ধূমপান শুরু না করে, সেই উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’

আন্তর্জাতিক তথ্য-প্রমাণ থেকে দেখা যায়, শুধু সিগারেটের দাম বাড়ালেই বর্তমান ধূমপায়ীদের মধ্যে ধূমপান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে—এমনটা নয়, যোগ করেন তিনি।

‘বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত গবেষণাগুলো দেখলে আমার মনে হয় না, শুধু দাম বাড়িয়ে খুব বেশি সুফল পাওয়া গেছে। এটি মানুষের আচরণের বিষয়। ধূমপানে অভ্যস্ত কেউ দাম বাড়ার পরও ধূমপান চালিয়ে যাবে এবং সিগারেট কেনার টাকা জোগাড় করে নেবে।’

‘তাই তরুণদের ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত রাখতে বাংলাদেশের আরও শক্তিশালী স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি প্রয়োজন,’ যোগ করেন তিনি।

চার স্তরের সিগারেট কর কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনার কথা সরকার বিবেচনা করবে কি না জানতে চাইলে হায়দার বলেন, চলতি বাজেট প্রস্তুত করার জন্য তাদের হাতে খুব বেশি সময় ছিল না। তবে পরবর্তীতে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থাকবে।

২০১৪ সাল থেকে তামাকজাত পণ্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের বিষয়ে তিনি বলেন, তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে সাধারণত অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দিষ্ট কোনো খাতে ব্যয়ের জন্য কর রাজস্ব আলাদাভাবে বরাদ্দ রাখার পক্ষে নয়।

‘নির্দিষ্ট খাতে অর্থ বরাদ্দ রাখার সুবিধা ও অসুবিধা—দুটোই আছে। সুবিধা হলো, অর্থ নির্ধারিত উদ্দেশ্যেই ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা যায়। তবে অসুবিধা হলো, কখনো কখনো প্রকৃত ব্যয় আদায় করা অর্থের চেয়ে বেশি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন ওই নির্দিষ্ট তহবিল থেকে মেটানো সম্ভব হয় না।’

হায়দার বলেন, সরকার ক্যানসারের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে আরও বেশি সরকারি সম্পদ বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে, বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানোর জন্য।