শিশুর বইয়ের যাত্রা শুরু হোক জন্ম থেকেই
সম্প্রতি ৮০ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তি মার্কিন সংগীতশিল্পী ডলি পার্টন। গান ও অভিনয়ের পাশাপাশি শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। নিজের বাবাকে পড়তে ও লিখতে না পারার কারণে যে সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে যেতে দেখেছেন, তা থেকেই হয়তো বিষয়টি তাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে।
১৯৯৫ সালে ডলি পার্টন প্রতিষ্ঠা করেন ‘ডলি পার্টনস ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’। এই কর্মসূচির আওতায় জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের প্রতি মাসে বিনা মূল্যে একটি করে বয়স-উপযোগী বই দেওয়া হয়। জন্মের পরপরই নিবন্ধিত হলে একটি শিশু পাঁচ বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই নিজের সংগ্রহে প্রায় ৬০টি বই পেতে পারে।
টেনেসিতে সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ পরে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে। তিন দশকের বেশি সময়ে এর মাধ্যমে শিশুদের হাতে পৌঁছেছে ৩০ কোটির বেশি বই।
তবে এটি কেবল বিনামূল্যে বই দেওয়ার কর্মসূচি নয়। এর মধ্য দিয়ে পরিবার ও সমাজকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দেওয়া হয়েছে, শিশুর জন্য খাবার, পোশাক, খেলনা, চিকিৎসা ও যত্ন যেমন প্রয়োজন, বইও তেমনই প্রয়োজনীয়।
বইয়ের সঙ্গে শিশুর পরিচয় হবে কখন
আমাদের দেশে এখনো অনেকের ধারণা, শিশু স্কুলে যাওয়ার পর, অর্থাৎ পাঁচ-ছয় বছর বয়সে বই পড়া শুরু করবে। অক্ষর চেনা ও পড়তে শেখার সঙ্গে আমরা বইয়ের সম্পর্ককে প্রায় এক করে ফেলি। অথচ বইয়ের সঙ্গে শিশুর পরিচয় হওয়া উচিত জন্মের পর থেকেই।
ছয় মাসের শিশু বই পড়তে পারবে না। কিন্তু সে বই ছুঁতে পারবে, রঙিন ছবি দেখতে পারবে, পাতা ওলটানোর চেষ্টা করবে এবং মা-বাবার কণ্ঠে গল্প শুনবে। একটু বড় হলে ছবিতে পরিচিত মানুষ, প্রাণী বা জিনিস খুঁজে বের করবে। নতুন শব্দ শিখবে, প্রশ্ন করবে, একই গল্প বারবার শুনতে চাইবে। এভাবেই তৈরি হবে তার পাঠজগতের প্রথম ভিত্তি।
শিশুর প্রাথমিক সাক্ষরতা মানে অল্প বয়সে তাকে অক্ষর মুখস্থ করানো নয়। কথা শোনা, ছবি দেখা, গল্প শোনা ও বোঝা, নতুন শব্দ শেখা, প্রশ্ন করা এবং বইয়ের সঙ্গে আনন্দের সম্পর্ক তৈরি করাই মূল কথা।
বই যেন চাপের বিষয় না হয়
আমাদের দেশে বইকে বেশিরভাগ সময় পড়ালেখা, পরীক্ষা ও ভালো ফলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ফলে বই মানেই পাঠ্যবই, বাড়ির কাজ, মুখস্থ করা কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতি—এমন ধারণা ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়।
এতে বইয়ের সঙ্গে আনন্দের সম্পর্ক গড়ে ওঠার আগেই অনেক শিশুর মধ্যে বই নিয়ে চাপ বা অনীহা তৈরি হয়।
অথচ ছোটবেলা থেকেই শিশুকে বই ছুঁতে, পাতা ওলটাতে, ছবি দেখতে এবং গল্প শুনতে দিলে বই তার কাছে আনন্দের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তখন বই কেবল পড়ার উপকরণ থাকে না, হয়ে ওঠে কৌতূহল মেটানোর একটি মাধ্যম।
মূল কথা হলো, শিশু আগে বই ভালোবাসতে শিখবে। পড়তে শিখবে আরও পরে।

জন্মের পরই প্রথম বই
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিশুর জন্মের পর পরিবারকে বই ও প্রাথমিক শেখার উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। কোথাও হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সময়, কোথাও টিকাদান বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়, আবার কোথাও গ্রন্থাগার বা কমিউনিটি সেন্টারের মাধ্যমে শিশুর প্রথম বইটি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ ধরনের উদ্যোগের উদ্দেশ্য কেবল শিশুকে বই দেওয়া নয়; মা-বাবাকেও মনে করিয়ে দেওয়া—শিশুর সঙ্গে কথা বলুন, ছড়া ও গান শোনান, গল্প বলুন এবং বই পড়ে শোনান।
শিশু সব শব্দ না বুঝলেও মা-বাবার পরিচিত কণ্ঠে গল্প শুনে আনন্দ পায়। একসঙ্গে বই দেখার এই সময় তাদের সম্পর্কও গভীর করে। পাশাপাশি শিশুর শব্দভাণ্ডার, মনোযোগ, কল্পনাশক্তি ও ভাব প্রকাশের দক্ষতা ধীরে ধীরে বাড়ে।
বাংলাদেশেও প্রতিটি নবজাতকের পরিবারের হাতে একটি ‘প্রথম বইয়ের কিট’ তুলে দেওয়া যেতে পারে। এতে থাকতে পারে বয়স-উপযোগী বোর্ড বই, কাপড়ের বই, স্পর্শের মাধ্যমে শেখার বই কিংবা ছবির বই। পাশাপাশি মা-বাবার জন্য থাকতে পারে সহজ নির্দেশিকা—কীভাবে শিশুকে বই পড়ে শোনাবেন এবং বয়স অনুযায়ী কী ধরনের বই বেছে নেবেন।
হাসপাতাল, কমিউনিটি ক্লিনিক, টিকাদান কেন্দ্র কিংবা জন্মনিবন্ধন কার্যক্রমের মাধ্যমে এই কিট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। পরে শিশুর বয়স অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর নতুন বই দেওয়ার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ পাঠক তৈরির শুরু
শিশুর হাতে একটি বই তুলে দেওয়ার ফল হয়তো সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। কিন্তু নিয়মিত বই দেখা ও গল্প শোনার অভ্যাস তার ভাষা, চিন্তা ও কল্পনার ভিত শক্ত করে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় শেখার আগ্রহ এবং বইয়ের প্রতি ভালোবাসা।
ডলি পার্টনের উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বই একটি শিশুর সামনে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে দিতে পারে। তাই বইয়ের সঙ্গে শিশুর পরিচয়ের জন্য স্কুলে যাওয়ার বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
শিশুর বইয়ের যাত্রা জন্ম থেকেই শুরু হোক। বইকে ভালোবাসতে শেখার পর পড়তে শেখাটাও হয়ে উঠবে অনেক সহজ ও আনন্দের।
মিতিয়া ওসমান, প্রকাশক, ময়ূরপঙ্খি
