এক্সপ্লেইনার

ইরান কেন ইউরেনিয়ামের মজুত ঘিরে মাইন পুঁতেছে?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বোমা তৈরির উপযোগী উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত আরও সুরক্ষিত করতে ব্যাপক পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান। ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু সুড়ঙ্গ ধসিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রবেশপথে বিস্ফোরক মাইন পুঁতে রেখেছে দেশটি।

এর ফলে মাত্র এক মাস আগেও এই ইউরেনিয়ামের কাছে পৌঁছানো যতটা কঠিন ছিল, এখন তা আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক ও সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম সিএনএন আজ রোববার এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের এই নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য চুক্তিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওই চুক্তির আওতায় ইরানের ইউরেনিয়াম অপসারণ ও ধ্বংস করার কথা রয়েছে।

তবে এখন প্রশ্ন উঠেছে—এত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করবে কে?

ইরানের দেজফুলে একটি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির পাঁচটি প্রবেশপথের মধ্যে চারটি ১২ মে পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই দেশ একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে। সেই চুক্তি অনুযায়ী ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে। পরে তা ঘটনাস্থলেই ধ্বংস করা হবে এবং অবশিষ্ট অংশ দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে।

যদিও চুক্তির শর্ত নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে এখনো বেশ পার্থক্য রয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, এখন ইরানের পক্ষেও ওই ইউরেনিয়াম বের করে আনা সহজ হবে না। কারণ ইউরেনিয়াম যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে পৌঁছাতে ভারী খননযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি পুঁতে রাখা মাইন অপসারণ করতে হবে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের সাবেক কর্মকর্তা স্কট রোকার সিএনএনকে বলেন, গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য সত্য হলে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা অবশ্যই আরও কঠিন হয়ে যাবে।

ছবি: সংগৃহীত

তার মতে, এই পরিস্থিতি ইরানকে ভবিষ্যতে চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তথ্য গোপন করার সুযোগ দিতে পারে।

তবে আলোচকরা ইরানকে পুরো ইউরেনিয়াম মজুত একত্রিত করে উপস্থাপন করতে বললে ওই ইউরেনিয়াম উদ্ধারের দায়িত্ব ইরানের ওপরই পড়বে।

কিন্তু রোকারের আশঙ্কা, ইরান দাবি করতে পারে যে, কিছু ইউরেনিয়াম ধ্বংসপ্রাপ্ত সুড়ঙ্গের ভেতরে আটকে গেছে এবং তা উদ্ধার করা সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিশ্চিত হতে পারবে না যে ভবিষ্যতে ইরান ওই ইউরেনিয়াম ব্যবহার করে বোমা বানাবে কি না।

কোথায় রয়েছে ইউরেনিয়াম?

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, ইরানের অধিকাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মধ্য ইরানের ইসফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রে ধসে পড়া সুড়ঙ্গগুলোতে সংরক্ষিত রয়েছে।

এছাড়া কিছু ইউরেনিয়াম নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রসহ আরও কয়েকটি স্থাপনাতেও সংরক্ষণ করা হয়েছে।

নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার কাছে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ কমপ্লেক্সের প্রবেশপথের স্যাটেলাইট ছবি। ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। ছবি: সংগৃহীত

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের ইউরেনিয়াম জব্দ করার জন্য একটি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল মার্কিন সামরিক বাহিনী। তবে ঝুঁকি বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি স্থগিত করা হয়।

পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ইরান তাদের ইউরেনিয়ামের সংরক্ষণস্থলগুলোকে আরও শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত করেছে।

এর আগে ট্রাম্প নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেছিলেন যে শক্তি প্রয়োগ করে ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক কাজ।

গোয়েন্দা সূত্রের মতে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউরেনিয়ামকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করায় ইরান আরও ভালোভাবে তাদের পারমাণবিক সম্পদ রক্ষার ব্যবস্থা নিয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য চুক্তি সই হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও দীর্ঘ কারিগরি আলোচনা প্রয়োজন হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান থেকে ইউরেনিয়াম সরাতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পারমাণবিক নিরাপত্তা প্রশাসনের অধীনে বিশেষ মোবাইল ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট মোতায়েন করতে হবে। 
আর যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি থেকে এই ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

ছবি: সংগৃহীত

তবে ইউরেনিয়ামের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পারমাণবিক উপাদান সরিয়ে নেওয়ার কাজ বিশেষজ্ঞরাও দ্রুত শেষ করতে পারবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ট্রাম্প নিজেই সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইরানের জাতিসংঘ মিশন ও হোয়াইট হাউস সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দেয়নি।