মাগুরছড়া ট্রাজেডির ২৯ বছর: আজও শুকায়নি লাউয়াছড়ার ক্ষত

মিন্টু দেশোয়ারা
মিন্টু দেশোয়ারা

১৯৯৭ সালের ১৪ জুন মৌলভীবাজারের মাগুরছড়া গ্যাসকূপে ঘটেছিল এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সেই ঘটনার ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, এর বন্যপ্রাণী ও স্থানীয় বাসিন্দারা এখনো সেই ক্ষয়ক্ষতির ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, দীর্ঘ এই সময়েও বনের ক্ষতিপূরণ আদায় বা পরিবেশ পুনরুদ্ধারে বন বিভাগ কার্যকর কোনো ভূমিকা নেয়নি।

১৯৯৭ সালের এই দিনে মার্কিন কোম্পানি 'অক্সিডেন্টাল' যখন মাগুরছড়া কূপ খনন করছিল, তখন অসাবধানতাবশত সেখানে বিস্ফোরণ ঘটে। প্রায় ৫০০ ফুট উঁচুতে উঠে যাওয়া আগুনের শিখায় পুড়ে যায় লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রায় সাড়ে ৮৭ একর বনাঞ্চল।

আগুনের তীব্রতায় ঢাকা-সিলেট রেলপথ, শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়ক, ফুলবাড়ি চা বাগান, খাসিয়া পানপুঞ্জি ও শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ ভানুগাছ বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সরকারি তদন্ত কমিটির মতে, দুর্ঘটনায় ২৪৫ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়েছিল।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এই দুর্ঘটনার জন্য অক্সিডেন্টাল কোম্পানির অবহেলাকে দায়ী করেছিল। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন তদন্ত কমিটি বনের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৬০০ কোটি টাকা দাবি করলেও আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি।

তবে শেভরন বাংলাদেশের মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশনস ম্যানেজার শেখ জহিরুল রহমান বলেন, শেভরন বাংলাদেশ ব্লক থার্টিন অ্যান্ড ফোর্টিন লিমিটেড (শেভরন) বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ও পেট্রোবাংলার সঙ্গে স্বাক্ষরিত উৎপাদন অংশীদারিত্ব চুক্তির অধীনে মৌলভীবাজার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন সংক্রান্ত সব বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে। ১৯৯৭ সালের জুন মাসে মৌলভীবাজার-১ খনন স্থানে (মাগুরছড়া) সংঘটিত ঘটনা সংক্রান্ত সব প্রমাণিত ক্ষতিপূরণ দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় পরিবেশবাদীরা অবশ্য এই দাবি মানতে নারাজ। তারা ক্ষতিপূরণ ও গ্যাস সংযোগের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

হিল প্রোটেকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি কমলগঞ্জ ইউনিটের সভাপতি মোনায়েম খান বলেন, সেই বিস্ফোরণের ক্ষতিপূরণ, কমলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দাদের ঘরে গ্যাস লাইন সংযোগ প্রদানসহ বিভিন্ন দাবি সংক্রান্ত একটি স্মারকলিপি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করা হবে।

বনের পরিবেশ নষ্ট হওয়ায় অনেক ধরনের গাছপালা, বিরল বন্যপ্রাণী, সরীসৃপ ও পাখি চিরতরে হারিয়ে গেছে। পাখিরা তাদের আবাসস্থল বদলে পাশের কালাছড়া বনে চলে গেছে।

খাসিয়া সোশ্যাল কাউন্সিলের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক এবং লাউয়াছড়া পুঞ্জির (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম) বাসিন্দা সাজু মারছিয়াং বলেন, ২৯ বছর পরও মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ক্ষত লাউয়াছড়া বনে এখনো রয়ে গেছে। যদিও সেই ক্ষত এখন খালি চোখে দেখা যায় না। বন বিভাগ পুড়ে যাওয়া এলাকায় পুনরায় বনায়ন করেছে। কিন্তু সেই বিস্ফোরণের কথা মনে হলে পুঞ্জির খাসিয়ারা এখনো শিহরিত হন।

বাংলাদেশ পরিবেশ সাংবাদিক সমিতির মৌলভীবাজার শাখার সাধারণ সম্পাদক নুরুল মোহাইমিন মিল্টন বলেন, মাগুরাছড়া বিস্ফোরণে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান সেগুন গাছ, বাঁশ ও অন্যান্য প্রজাতির গাছ, কাঠসমৃদ্ধ ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ বনাঞ্চল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল কালাম বলেন, ক্ষতিপূরণ সম্পর্কে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।

বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজের পরিচালক এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, এই অগ্নিকাণ্ডের ফলে লাউয়াছড়ায় বেশ কিছু লতাগুল্ম, পাখি ও সরীসৃপ আর দেখা যায় না। আগুন লাগার আগে লাউয়াছড়া বনের রেলপথ ধরে এবং বনের ভেতরে 'নিতম' নামের এক প্রকার জিমনোস্পার্ম প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত। এছাড়াও প্রচুর ফার্ন, ফাঙ্গাস ও অ্যালগি ছিল। এগুলো আর্দ্র পরিবেশে বাস করে। এখন এসব খুব কমই দেখা যায়। 

তিনি আরও বলেন, 'লুমিনা ফাঞ্জাই' নামের একটি ছত্রাক অন্ধকারে আলো ছড়ায়। এই বিরল ছত্রাকটিও এখন আর দেখা যায় না লাউয়াছড়ায়। ত্রিপুরা ভাষায় 'কুতুই রুগনি ক্লুম' নামে সাদা ফুলের একটি গাছ ছিল, যা এখন দেখা যায় না। অনেক পাখি এখান থেকে চলে গিয়ে কালাছড়া বনে আবাস গড়েছে।