মানুষের আগ্রাসনে বিলুপ্তির পথে মেছোবিড়াল
বাংলাদেশে মেছোবিড়াল নিধনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সংঘাত, বিশেষ করে হাঁস-মুরগি ও পুকুরের মাছ খাওয়ার অভিযোগে প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড ধীরে ধীরে এই বন্যপ্রাণীটিকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষক ও সংরক্ষণবিদরা।
মেছোবিড়াল একটি মাঝারি আকারের বনবিড়াল প্রজাতি। এদের দেহ গঠনে রয়েছে শক্তপোক্ত শরীর, বাদামি জলপাই-ধূসর রঙের লোম, ছোট ও গোলাকার কান এবং কালো দাগ ও ডোরাকাটা পেশিবহুল লেজ। বিশ্বজুড়ে এই প্রজাতির জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত।
২০০৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দেশে অন্তত ১৬০টি মেছোবিড়াল হত্যা করা হয়েছে বলে উঠে এসেছে এক গবেষণায়। ৩৬০টির বেশি গণমাধ্যম প্রতিবেদন বিশ্লেষণের ভিত্তিতে করা ওই গবেষণায় দেখা যায়, নিহত মেছোবিড়ালগুলোর বেশিরভাগই মাছ ও হাঁস খামারিদের হাতে মারা গেছে। মোট ঘটনার প্রায় ৪৭ শতাংশেই 'দেখামাত্র হত্যা' প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষণাটির সংশ্লিষ্ট লেখক মুনতাসির আকাশ বলেন, 'পাহাড়ি অঞ্চল ছাড়া দেশের প্রায় সব জায়গাতেই মেছোবিড়ালের বিচরণ রয়েছে। তবে পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।'
তিনি বলেন, 'মানুষের মধ্যে একটি ধারণা রয়েছে যে, মেছোবিড়াল বসতবাড়িতে ঢুকে হাঁস-মুরগি খেয়ে ফেলে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কোনো আর্থিক ক্ষতির প্রমাণ না থাকলেও অনেক জায়গায় এদের দেখামাত্র হত্যা করা হচ্ছে।'
চলতি বছরের জুন মাসে গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন জার্নালে প্রকাশিত ওই গবেষণায় দেখা যায়, সংঘাতের ঘটনায় অন্তত ৩৯৫টি প্রাপ্তবয়স্ক মেছোবিড়াল ও ১৭০টি শাবক জড়িত ছিল। এরমধ্যে ১১৭টিকে আবার প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়, আর ৩৪টিকে পাঠানো হয় সংঘাতস্থল থেকে ২০ কিলোমিটারের বেশি দূরে অবস্থিত চিড়িয়াখানা বা উদ্ধারকেন্দ্রে।
তবে মুনতাসির আকাশের মতে, সংঘাত এলাকা থেকে অনেক দূরে মেছোবিড়াল ছেড়ে দেওয়া টেকসই সমাধান নয়।
তিনি বলেন, 'মানব বসতি যেভাবে প্রাকৃতিক আবাসভূমির ভেতরে ঢুকে পড়ছে, তাতে দূরে ছেড়ে দিলেও সমস্যা থেকে যাচ্ছে।'
সংরক্ষণবিদরা বলছেন, ভয় ও ভুল শনাক্তকরণ এই সহিংসতার বড় কারণ। অনেক গ্রামবাসী সচেতনতার অভাবে মেছোবিড়ালকে বাঘ বা চিতাবাঘ ভেবে ভয় পান এবং হত্যা করেন।
তবে সাম্প্রতিক আরেকটি গবেষণায় কিছুটা আশার আলো দেখা গেছে। ২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলের চারটি জেলায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সংঘাতস্থলভিত্তিক উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ পদ্ধতি স্বল্পমেয়াদে কার্যকর সংরক্ষণ কৌশল হতে পারে।
এই গবেষণা চলাকালে ৮৬টি জীবিত ও সাতটি মৃত মেছোবিড়ালের তথ্য পাওয়া যায়। জীবিত ৭৬টির মধ্যে ৩৫টি শাবকসহ বেশিরভাগকেই এক সপ্তাহের মধ্যে তাদের ধরার স্থান বা আশপাশেই অবমুক্ত করা হয়। ডিসেম্বর মাসে গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটি বলছে, অবমুক্ত করা শাবকদের মধ্যে ৬২ শতাংশ ক্ষেত্রে মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন সফল হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষণাটির অন্যতম লেখক এম এ আজিজ বলেন, 'সিলেট অঞ্চলকে আগে থেকেই মেছোবিড়াল–মানুষ সংঘাতের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।'
তিনি বলেন, 'এই অঞ্চলের ভূ-দৃশ্যে ছড়িয়ে থাকা হাওর, জলাভূমি, আংশিক সংরক্ষিত বন ও চা-বাগান রয়েছে, যা মেছোবিড়ালের জন্য আদর্শ আবাস। তাই আমরা সিলেট অঞ্চলে উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ পদ্ধতি উন্নয়নে গবেষণা করেছি।'
আজিজ জানান, বিশেষ করে শাবকদের ক্ষেত্রে সময়মত অবমুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, 'আমাদের গবেষণা বলছে, উদ্ধার করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শাবকদের ছেড়ে দিলে মায়ের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।'
এক্ষেত্রে বন বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন তিনি।
স্বল্পমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তিনি জলাশয়ের পাশের মাছের পুকুর ও হাঁসের খামারের চারপাশে জাল দিয়ে বেড়া দেওয়া, আশপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা এবং আলোর ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।
বন বিভাগের প্রচলিত একটি চর্চার সমালোচনা করে এম এ আজিজ বলেন, 'উদ্ধার করা মেছোবিড়ালকে গভীর বনে ছেড়ে দেওয়া ভুল।'
তিনি বলেন, 'মেছোবিড়াল সাধারণত মানুষের বসতির কাছাকাছি জলাভূমি ও ঝোপঝাড়ে থাকতে পছন্দ করে। তাই সংঘাতস্থল বা তার আশপাশে অবমুক্ত করাই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।'
তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম চালানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।