জ্বালানি স্থাপনায় হামলা: এলএনজি সংকটের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের পোশাক ও বিদ্যুৎখাত
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা ও এর প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রতিশোধমূলক হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশ কিছু জ্বালানি স্থাপনা। এছাড়া, বিশ্বের অন্যতম জ্বালানি সরবরাহের রুট ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন হরমুজ প্রণালী এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে রয়েছে।
এসব কারণে গত ২৮ মার্চ থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়ছে। তবে এবার বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বাজার।
ইরান, কাতার ও সৌদি আরবের প্রধান গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে সাম্প্রতিক হামলার কারণে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতে।
আজ বৃহস্পতিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এমন আশঙ্কাই করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতারের রাস লাফান এলএনজি হাবে ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে দুবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশ্বের এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই স্থাপনা থেকে সরবরাহ করা হয়।
ডেটা-অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এক বিশ্লেষণের বরাতে সিএনএন বলছে, রাস লাফানে হামলায় বিশ্বের প্রাকৃতিক গ্যাস বাজার মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে। এতে বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ২ মাসের বেশি সময় ধরে বিঘ্ন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ করা এলএনজির প্রায় ৯০ শতাংশ এশিয়ার দেশগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এই দুই দেশের জ্বালানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান।
গত সপ্তাহ থেকে ভারত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে রেশনিং শুরু করেছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে পাকিস্তান দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের জন্য ৪ দিন কর্মদিবস চালু করেছে।
আইইএর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এর প্রধান কারণ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্ধেকই আসে প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র থেকে।
এলএনজি আমদানি থমকে গেলে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
উড ম্যাকেঞ্জি বলছে, 'জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতির জন্য গ্যাস রেশনিং করতে হচ্ছে। এর ফলে পোশাক কারখানায় উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদন কমে যাচ্ছে।'
যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকায় আগে থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল, আর নতুন এ হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ইরানে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র সাউথ পারসে ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে রাস লাফানে হামলা চালায় তেহরান। সাউথ পারস শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্কেও গ্যাস সরবরাহ করে।
এ হামলার আগেই প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর নির্ভরশীল এশিয়া ও ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল। এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সম্মেলনের ফাঁকে বৃহস্পতিবার বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার বলেন, 'জ্বালানি সংকট নিয়ে ইইউ কর্মকর্তারা খুবই চিন্তিত। যুদ্ধের আগেই জ্বালানির মূল্য বেশি ছিল এবং এখন তা আরও বেড়ে গেছে। যদি এটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়, তবে আমরা ভয়াবহ বিপদে পড়ব।'


