জনপ্রিয় হওয়ার আগে আইয়ুব বাচ্চুর যেসব গান
বাংলা ব্যান্ড সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু এক অসামান্য নাম। যাদের হাত ধরে দেশীয় ব্যান্ড সংগীত আজকের জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, তাদের একজন ছিলেন তিনি। তিনি একাধারে ‘ছয় তারের জাদুকর’ খ্যাত গিটারিস্ট, স্বনামধন্য গায়ক, গীতিকার ও সুরকার।
আজ এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে বাংলার ‘রক লিজেন্ড’-এর বয়স হতো ৬৪ বছর।
আইয়ুব বাচ্চু নিজের কণ্ঠে গেয়ে জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই অন্য শিল্পীদের জন্য গান তৈরি করতেন। সেসব গান আজ কালজয়ী হিসেবে পরিচিত। সেই পুরোনো দিনের গানের গল্প শুনিয়েছেন ‘এক দিন ঘুমভাঙা শহরে’–খ্যাত গানের গীতিকার শহীদ মাহমুদ জঙ্গী।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাচ্চু জনপ্রিয় হওয়ার পর মানুষ মূলত তার গানগুলো সম্পর্কে জানতে পারে। কিন্তু সুরকার হিসেবে এর আগে থেকেই তিনি শ্রোতাদের বেশ কিছু ভালো গান উপহার দিয়েছেন, এ কথা অনেকেই জানেন না। খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী তপন চৌধুরী ও নাসিম আলী খানের প্রথম অ্যালবামের সুরকার ছিলেন বাচ্চু।’
তিনি আরও জানান, ১৯৮৫ সালে সারগাম থেকে প্রকাশিত হয় তপন চৌধুরীর সেলফ টাইটেল অ্যালবাম। এই অ্যালবামের ‘আমার গল্প শুনে’, ‘মনে করো তুমি আমি’, ‘হারানো দিনকে আমি ফিরে যদি পাই’, ‘আলো ভেবে যারে আমি’ গানগুলো সুর করেছিলেন বাচ্চু। এ ছাড়া ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত নাসীম আলী খানের প্রথম অ্যালবামের ‘যতীন স্যারের ক্লাসে’, ‘পথে যেতে যেতে’, ‘ভাবনা’, ‘ওহে নদী’, ‘অগোছালো আমি’ গানগুলোর সুরও তার করা।
শহীদ মাহমুদ জঙ্গী বলেন, ‘এসব গানের বাইরে “হারানো বিকেলের গল্প”, “কলেজের করিডোরে”, “সাঁওতালি মেয়েরা”, “পাথর কালো রাত”, “ময়না”, “তারাভরা রাতে” গানগুলোও বাচ্চুর নিজে জনপ্রিয় হওয়ার আগে সুর করা। এরপর তো “এক দিন ঘুমভাঙা শহরে”, “সেই তুমি”র মতো গানগুলো নিজের কণ্ঠে গেয়ে তিনি জনপ্রিয়তার চূড়ায় উঠলেন।’
১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের এনায়েত বাজারে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের এই শিরোমণি তার প্রথম গান প্রকাশ করেন ‘হারানো বিকেলের গল্প’ শিরোনামে। গানটির কথা লিখেছিলেন শহীদ মাহমুদ জঙ্গী। তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘রক্তগোলাপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে।
১৯৭৮ সালে আইয়ুব বাচ্চু ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে যোগ দেন। এরপর ১৯৮০ সালে ‘সোলস’-এর সঙ্গে শুরু হয় তার পথচলা। প্রায় এক দশক এই ব্যান্ডের সঙ্গেই ছিলেন তিনি। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে গঠন করেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। এলআরবির প্রথম অ্যালবাম প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে।
আইয়ুব বাচ্চুর একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে—‘ময়না’ (১৯৮৮), ‘কষ্ট’ (১৯৯৫), ‘সময়’ (১৯৯৮), ‘একা’ (১৯৯৯), ‘প্রেম তুমি কি’ (২০০২), ‘দুটি মন’ (২০০২), ‘কাফেলা’ (২০০২), ‘প্রেম প্রেমের মতো’ (২০০৩), ‘পথের গান’ (২০০৪), ‘ভাটির টানে মাটির গান’ (২০০৬), ‘জীবন’ (২০০৬), ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ (২০০৭), ‘রিমঝিম বৃষ্টি’ (২০০৮), ‘বলিনি কখনো’ (২০০৯) ও ‘জীবনের গল্প’ (২০১৫)।
এলআরবির অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে—‘এলআরবি’ (১৯৯২), ‘সুখ’ (১৯৯৩), ‘তবুও’ (১৯৯৪), ‘ঘুমন্ত শহরে’ (১৯৯৫), ‘ফেরারী মন’ (১৯৯৬), ‘স্বপ্ন’ (১৯৯৬), ‘আমাদের’ ও ‘বিস্ময়’ (১৯৯৮), ‘মন চাইলে মন পাবে’ (২০০০), ‘অচেনা জীবন’ (২০০৩), ‘মনে আছে নাকি নেই’ (২০০৫), ‘স্পর্শ’ (২০০৮) ও ‘যুদ্ধ’ (২০১২)।
আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে—‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘কেউ সুখী নয়’, ‘ফেরারি এই মনটা আমার’, ‘এক দিন ঘুমভাঙা শহরে’, ‘বাংলাদেশ’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হকার’, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে’, ‘গতকাল রাতে’ ও ‘সেই তারাভরা রাতে’।
এই তালিকায় আরও রয়েছে—‘মেয়ে তুমি কি দুঃখ চেনো’, ‘সাড়ে তিন হাত মাটি’, ‘উড়াল দেব আকাশে’, ‘কত দিন দেখেনি দুচোখ’, ‘মনে আছে নাকি নাই’, ‘কার কাছে যাব’, ‘লোকজন কমে গেছে’, ‘একটাই মন যখন-তখন’, ‘এক আকাশের তারা তুই একা গুনিস নে’, ‘মন চাইলে মন পাবে’, ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’, ‘আমি তো প্রেমে পড়িনি’ ও ‘আম্মাজান’।
এ বছর আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর মাত্র ৫৬ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই কিংবদন্তি।