খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

দেশের বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় বিস্তৃত মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকখাতে আস্থা ফেরানোর লক্ষ্যে কঠোর তদারকি, ঋণের অর্থ দ্রুত পুনরুদ্ধার, আইনি সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক ঋণ-ক্ষতি নির্ধারণ মানদণ্ডে রূপান্তরের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এতে।

আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত ২০২৬ সালের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের সর্বশেষ মুদ্রানীতি বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ধারাবাহিকভাবে উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ দেশের আর্থিকখাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোর মুনাফা, মূলধনের সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা ও মুদ্রানীতির কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, মোট খেলাপি ঋণের হার ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ২০ দশমিক ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছায়। পরে তা কমে ২০২৬ সালের মার্চে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে আসে।

নিট খেলাপি ঋণের হারও একই ধারা অনুসরণ করেছে। এটি ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ৪০ শতাংশে পৌঁছানোর পর ২০২৬ সালের মার্চে কমে ১৫ দশমিক ০১ শতাংশে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মোট শ্রেণিকৃত ঋণ ডিসেম্বরে ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা, যা মার্চের শেষে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বেড়ে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার পরিবর্তন, স্বল্পমেয়াদি কার্যকরী মূলধন ঋণের সমন্বয়কাল ও চাপের মুখে থাকা ঋণ হিসাবের সুদ সংযোজনের ধরনের কারণে এই ওঠানামা হয়েছে।

সম্পদের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একাধিক নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্কার চালু করেছে। সীমিত পুনরুদ্ধার সম্ভাবনাসম্পন্ন খেলাপি ঋণ অবলোপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা চাপের মুখে থাকা ঋণগ্রহীতাদের জন্য নীতিমালাও সংশোধন করেছে। এর আওতায় সম্ভাবনাময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকৃত ঋণ সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। এ বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকখাতে ঋণ-শৃঙ্খলা জোরদারে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিং সংক্রান্ত নির্দেশিকা হালনাগাদ করে। উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন অব্যাহত রাখতে কৃষি এবং কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) খাতের স্ট্যান্ডার্ড ও স্পেশাল মেনশনড অ্যাকাউন্টের (এসএমএ) জন্য ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কম প্রভিশন রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান উপাদান হলো বিধিভিত্তিক প্রভিশনিং পদ্ধতি থেকে আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী প্রত্যাশিত ঋণ-ক্ষতি (ইসিএল) কাঠামোয় রূপান্তর, যা ২০২৭ সালের মধ্যে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বহু দেশে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক হিসাবমান আইএফআরএস-৯ অনুযায়ী, ঋণ প্রকৃতপক্ষে খেলাপি হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ক্ষতির হিসাব করে তা স্বীকৃতি দিতে হবে ব্যাংকগুলোকে। এর মাধ্যমে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর প্রভিশন রাখার প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তন আসবে। সম্ভাব্য ক্ষতির বিপরীতে আগেভাগে সংরক্ষণ রাখার ফলে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার আরও সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া যাবে।

সামনের দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপ অস্থায়ী নিয়ন্ত্রক শিথিলতার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

এই কৌশল চারটি মূল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি (আরবিএস) জোরদার করবে এবং বিশেষ করে দুর্বল সুশাসন বা উচ্চমাত্রার ঋণঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংকগুলোর জন্য প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সম্পদ মান পর্যালোচনা (একিউআর) পরিচালনা করবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলোর মূলধন পুনর্গঠন ও প্রভিশন পরিকল্পনাকে ঋণ পুনরুদ্ধারের বাস্তব অগ্রগতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হবে। পুনরুদ্ধার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে লভ্যাংশ বিতরণে বিধিনিষেধসহ তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তৃতীয়ত, ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ শুধুমাত্র আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। যেসব ঋণগ্রহীতা পরিশোধের অঙ্গীকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চতুর্থত, ব্যাংকের অভ্যন্তরে বিশেষায়িত পুনরুদ্ধার ইউনিট, শক্তিশালী আইনি বিভাগ, অর্থঋণ আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি এবং জামানত বাস্তবায়নের আরও কার্যকর ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ দ্রুত পুনরুদ্ধার করা হবে।

এ ছাড়া, আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্য সহায়তা এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানের মূলধন পুনর্গঠনকে আলাদা রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কাঠামোবদ্ধ জরুরি তারল্য সহায়তা (ইএলএ) ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

রোডম্যাপকে সমর্থন জোগাতে সম্প্রতি প্রণীত দুটি আইন—ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬ এবং আমানত সুরক্ষা আইন ২০২৬ কার্যকর হয়েছে। এর লক্ষ্য, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠনে কর্তৃপক্ষকে আরও শক্তিশালী ক্ষমতা দেওয়া, খুচরা আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং আর্থিকখাতে নৈতিক ঝুঁকি কমানো।

সবশেষে, ইসিএল কাঠামো বাস্তবায়নে সহায়তা এবং ঋণগ্রহীতাদের ঋণমানের অবনতি আগেভাগে শনাক্ত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকগুলোর ঋণঝুঁকি মডেলিং সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।