গৃহঋণের উচ্চ সুদহার, মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে

জাগরণ চাকমা
জাগরণ চাকমা

গৃহঋণের উচ্চ সুদের কারণে ২০২৫ সালে মাঝারি মানের আবাসন বাজার প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কারণ ঋণের ওপর নির্ভরশীল বেতনভোগী ক্রেতারা আর্থিক চাপে ছিলেন, উচ্চ সুদের কারণে মাসিক কিস্তি তাদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়।

উচ্চ সুদহারের পাশাপাশি ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব কিছুর প্রভাবে ফ্ল্যাটের বিক্রি কমেছে, বুকিং বাতিলের সংখ্যা বেড়েছে এবং পুরো রিয়েল এস্টেট খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জানুয়ারিতে গৃহঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ছিল ৯ শতাংশ, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত উচ্চ হারই ছিল।

কনকর্ড গ্রুপের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অনুপ কুমার সরকার বলেন, গৃহঋণের উচ্চ সুদের হার, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা ২০২৫ সালে বাংলাদেশের আবাসন খাতে বড় প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে মাঝারি আকার বা মধ্যম আয়ের বাজারে।

তিনি বলেন, ঋণের সুদ হঠাৎ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যম আয়ের ক্রেতারা, কারণ তারা মূলত ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত একজন ক্রেতা একটি ফ্ল্যাটের মোট মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশ ঋণ নেন এবং বাকি ৩০ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে পরিশোধ করেন।

তিনি জানান, যখন সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিট ছিল, তখন বেতনভোগী মানুষের জন্য মাসিক কিস্তি সামলানো সম্ভব ছিল। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে সুদের হার ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ হওয়ায় মাসিক কিস্তি বেড়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘অনেক চাকরিজীবী ভাড়া দেওয়ার পরিবর্তে ঋণের কিস্তি দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সুদের হার বাড়ায় সেই সমীকরণ আর মিলছে না।’

তিনি আরও জানান, পুরো আবাসন শিল্পের বিক্রি অন্তত ৩০ শতাংশ কমেছে। যাদের অবস্থা তুলনামূলক স্থিতিশীল তাদের প্রবৃদ্ধিও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে।

তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় কনকর্ড প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০টি ফ্ল্যাট বিক্রি করে। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিক্রির পরিমাণ কমেছে। ঋণের সুদ বাড়ায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমেছে।

দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ব্যাংকের গৃহঋণ বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সুদের হার বাড়ায় বন্ধকি ঋণ বাজারে বড় আকারে প্রভাব পড়েছে। কারণ অধিকাংশ বেতনভোগী ক্রেতা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেন।

তিনি জানান, এছাড়া ফ্ল্যাট নিবন্ধনের নিয়মও বেশ কঠোর, যারা প্রভাব পড়েছে ঋণ বিতরণ ও সামগ্রিক চাহিদায়। যদিও সম্প্রতি কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে।

গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করা হয়েছে। তার মতে, এতে ফ্ল্যাট কিনতে ইচ্ছুকদের আগ্রহ বাড়তে পারে এবং বাজার ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে।

অন্যদিকে ডেভেলপাররাও নানা দিক থেকে চাপে আছেন।

অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টস অ্যান্ড হোল্ডিংস লিমিটেডের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ও জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. বাহাউদ্দিন মিয়া বলেন, ফ্ল্যাটের দাম কমলেও নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এতে লাভের অংশ কমে গেছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা কঠিন সময় পার করছি। ফ্ল্যাটের দাম কমেছে, অথচ নির্মাণসামগ্রীর খরচ বেড়েছে। এই ভারসাম্যহীনতার কারণে চলমান সংকট তৈরি হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, সচ্ছল ক্রেতাদের একটি অংশের মূলধন দেশের বাইরে চলে গেছে, এতে দামের ওপর প্রভাব পড়েছে।
‘যারা সাধারণত ২ থেকে ৩ কোটি টাকার ফ্ল্যাট কিনতেন, তারা এখন বিদেশে বিনিয়োগ করছেন। ফলে অন্যদের জন্য এতদামি সম্পত্তি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে,’ বলেন তিনি।

উত্তরা ও বসুন্ধরার মতো এলাকায় উচ্চ ও মাঝারি আয়ের গ্রাহকদের জন্য প্রকল্প করা অ্যাসেট ডেভেলপমেন্টস সাধারণত বছরে ১৫০ থেতে ২০০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট বিক্রি করে। তবে সম্প্রতি বিক্রির পরিমাণ কমেছে এবং বাতিলের সংখ্যাও বেড়েছে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের আগে যারা ফ্ল্যাট বুক করেছিলেন, কিন্তু পরে ব্যবসা বন্ধ ও আর্থিক সংকটের কারণে তাদের অনেকে বুকিং বাতিল করেছেন।

ট্রপিক্যাল হোমস লিমিটেডের বিক্রয় ও বিপণন পরিচালক এম হক ফয়সাল ২০২৫ সালকে চ্যালেঞ্জিং বছর হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ঢাকার ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ডিএপি) সংশোধন, দীর্ঘ নীতিগত পরিবর্তন, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ২০২৩ সাল থেকে বারবার নীতিমালা পরিবর্তনের ফলে ডেভেলপারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করতে। এতে অনেকে অনুমোদিত জায়গা কমে যাওয়া ও ক্ষতির আশঙ্কায় নতুন জমি কিনতে আগ্রহ হারায়।

রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, সার্ভার ডাউন থাকা এবং অনলাইন পদ্ধতিতে রূপান্তর—এসব কারণেও নতুন প্রকল্পের অগ্রগতি কমেছে। অনুমোদনের পরও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হতে অন্তত এক বছর সময় লাগে।

তিনি জানান, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বাজার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডিতে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে।

ট্রপিক্যাল হোমস সাধারণত বছরে প্রায় ৩০০ অ্যাপার্টমেন্ট ও ফ্ল্যাট বিক্রি করে। গত বছর তারা প্রায় ২৫০টি বিক্রি করেছে, যা প্রায় ১৬ শতাংশ কম।

পুরো শিল্পখাতে মাসিক বিক্রি ১ হাজার থেকে কমে ৭০০ থেকে ৭৫০টিতে নেমে এসেছে। যেখানে বছরে ৫ থেকে ৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রত্যাশা ছিল, সেখানে তা স্থবির হয়ে পড়েছে। কিছু প্রকল্পে ৫ থেকে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কমতে দেখা গেছে।

রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি লিয়াকত আলী ভূঁইয়া বলেন, ডিএপি-সংক্রান্ত বিলম্ব, উচ্চ সুদের হার এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলেই ২০২৫ সালে বাজারে চাপ তৈরি করে।

তিনি বলেন, ‘এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় বাজার ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।’