ব্যাংক খাতে গত বছর ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা লোকসান

মো. মেহেদী হাসান
মো. মেহেদী হাসান

খেলাপি ঋণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় কমেছে ব্যাংক খাতের আয়। ফলে প্রথমবারের মতো নিট লোকসানের মুখে পড়েছে এই খাত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ব্যাংকিং খাতে নিট লোকসান হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম ব্যাংক খাত সামগ্রিকভাবে নিট লোকসানের মুখে পড়লো।

এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকগুলো ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছিল।

ব্যাংক কর্মকর্তা মনে করছেন, এর জন্য দায়ী দীর্ঘদিনের ঋণ অনিয়ম, আর্থিক জালিয়াতি ও এই খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি।

তারা আরও বলছেন, কয়েকটি ভালো অবস্থানে থাকা ব্যাংক উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ও শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকসহ অনেক ব্যাংক বিপুল পরিমাণ ঋণ অবলোপন করে, এবং খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির চাপে পুরো খাত নিট লোকসানে ডুবে যায়।

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি লোকসান গুনেছে। ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে ৬৬ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর তাদের নিট মুনাফা ছিল ১৩৫ কোটি টাকা।

বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রভাব থাকাকালে শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংকটি বড় ধরনের অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির শিকার হয়েছিল। গ্রুপটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম একইসঙ্গে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ আরও চারটি সংকটাপন্ন ব্যাংককে এখন একটি বড় ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়া শুরু করে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা অন্য ব্যাংকগুলো হলো—সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, যার নিট লোকসান ৩১ হাজার কোটি টাকা; এক্সিম ব্যাংকের ২৮ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা; গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৩ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা, ও ইউনিয়ন ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, পুরো ব্যাংকিং খাত এখন অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় রয়েছে। আয় সৃষ্টির সুযোগ সীমিত, এবং কার্যত কোনো মুনাফা নেই।

‘যখন খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, এবং সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, তখন লোকসান অনিবার্য হয়ে পড়ে,’ গতকাল দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অশ্রেণিকৃত পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ছিল ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা, স্থগিতাদেশের আওতায় থাকা ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা, এবং অবলোপন করা ঋণ ছিল ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান বলেন, সম্প্রতি পুনঃতফসিল করা বিপুল পরিমাণ ঋণে দুই বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া হয়েছে। যার অর্থ হলো, এই সময়ে ব্যাংকগুলো ঋণ থেকে কোনো আয় করতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ব্যাংকের অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৯৯২ কোটি টাকা।

২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সমস্যাগ্রস্ত সম্পদের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে জনতা ব্যাংকের নিট লোকসান হয়েছে ৩ হাজার ৮২০ কোটি টাকা।

সামগ্রিক লোকসানের মধ্যেও তুলনামূলক শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও উন্নত সম্পদমানের কারণে কয়েকটি ব্যাংক গত বছর উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে।

অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে ব্র্যাক ব্যাংক এককভাবে ১ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৯৩৮ কোটি টাকা, সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংকের ৮৯০ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংকের (ইবিএল) ৯০০ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য আরও বলছে, গত বছর ব্যাংক খাতের নিট সুদ আয় ঋণাত্মক ১২ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকায় নেমে আসে।