মোবাইল নেটওয়ার্কের মান নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্যে ধোঁয়াশা

স্টার বিজনেস রিপোর্ট

জুলাই মাসে বাংলাদেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের মান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেঁধে দেওয়া মানদণ্ড পূরণ করেছে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত অপর এক মূল্যায়নে মোবাইল অপারেটরদের দেওয়া তথ্য এবং সংস্থাটির নিজস্ব যাচাইকৃত তথ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান পাওয়া গেছে।

মূল্যায়নের আওতায় ছিল দেশের চার মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও টেলিটক।

তাদের দেওয়া সেবার মান (কোয়ালিটি অব সার্ভিস—কিউওএস) সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে বিটিআরসির সংগ্রহ করা নেটওয়ার্কের তথ্য তুলনা করা হয়েছে।

চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি ছিল বিটিআরসির প্রথম কিউওএস মূল্যায়ন।

এবারই প্রথম সংস্থাটি একইসঙ্গে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মোবাইল নেটওয়ার্কের কার্যকারিতার মূল্যায়ন করেছে।

তবে বিটিআরসি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, এই মূল্যায়নে প্রচলিত ড্রাইভ টেস্টের পরিবর্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থার টেলিকম মনিটরিং সিস্টেম (টিএমএস) থেকে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

নেটওয়ার্কের মান নির্ধারণ, তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি এবং কোন কোন অঞ্চল থেকে নমুনা হিসেবে কোন ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হবে—এসব দিক বিচারে টিএমএসের তথ্য ও ড্রাইভ টেস্টের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

এই খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, টিএমএসের তথ্য সবসময় গ্রাহকদের অভিজ্ঞতার প্রকৃত চিত্র তুলে নাও ধরতে পারে। বিশেষ করে যখন অপারেটরদের নেটওয়ার্ক কভারেজ ও গ্রাহকসংখ্যায় পার্থক্য থাকে।

মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অপারেটর জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড পূরণ করেছে।

তবে অপারেটরদের দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের মধ্যে পার্থক্য, র ডেটার ঘাটতি ও বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্কের কার্যকারিতায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

ফোর-জির ২ মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ টেলিটক

একমাত্র অপারেটর হিসেবে জুলাইয়ে ফোর-জি নেটওয়ার্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে টেলিটক।

টেলিটকের ফোর-জি রেডিও রিসোর্স কন্ট্রোল (আরআরসি) সফলতার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ, যা নির্ধারিত ৯৯ শতাংশের চেয়ে কম।

ফোর-জি ডেটা নন-রিটেইনেবিলিটি হার ছিল শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা অনুমোদিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি।

আরআরসি সফলতার হার দিয়ে কোনো ডিভাইস কতবার সফলভাবে ফোর-জি নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে, তা পরিমাপ করা হয়। আর নন-রিটেইনেবিলিটি দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে ডেটা সংযোগ বিচ্ছিন্নের হার পরিমাপ করা হয়।

টেলিটকের মূল ডেটা (র ডেটা) বা বাইনারি ফাইল অসম্পূর্ণ থাকায় বিটিআরসি প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্য যাচাই করতে পারেনি। জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের তথ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবেদনে বারবার ‘টেলিটকের অসম্পূর্ণ তথ্য/বাইনারি ফাইল’ উল্লেখ করা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় টেলিটকের পারফরম্যান্সেও বড় ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে। ৬৪টি পরিমাপ করা উপজেলার মধ্যে মাত্র ১২টিতে এর ফোর-জি আরআরসি সফলতার হার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মানদণ্ড পূরণ করেছে। উপজেলা পর্যায়ে ৫৩৭টি পরিমাপের মধ্যে মাত্র ১৩৬টি নির্ধারিত মান পূরণ করেছে।

এসব দুর্বলতা সত্ত্বেও টেলিটক ফোর-জি নেটওয়ার্কে গড়ে ১১ দশমিক ২০ এমবিপিএস ডাউনলোড স্পিড পেয়েছে বলে জানিয়েছে, যা সর্বনিম্ন প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএসের তুলনায় অনেক বেশি।

টেলিটকের সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ভয়েস কলের জন্য ফোর-জি ডিভাইসগুলো কতটুকু সাফল্যের সঙ্গে পুরোনো নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারে, তা এই মানদণ্ডের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়।

মানদণ্ড পূরণ করেছে গ্রামীণফোন

গ্রামীণফোন বিটিআরসির নির্ধারিত মানদণ্ডের মধ্যে ছিল। তবে মূল্যায়নে প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া কিছু তথ্য এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিমাপের মধ্যে ব্যবধান পাওয়া গেছে।

বিটিআরসি গ্রামীণফোনের টু-জি কল ড্রপের হার শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ পেয়েছে, যা কোম্পানিটির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। তাদের গড় ফোর-জি ডাউনলোড গতি ছিল ৮ দশমিক ২৩ এমবিপিএস, যেখানে অপারেটরটি ৮ দশমিক ২২ এমবিপিএস জানিয়েছিল।

ভিওএলটিই (ভয়েস ওভার লং-টার্ম ইভল্যুশন) কল ড্রপের হারে সবচেয়ে বেশি পার্থক্য পাওয়া গেছে। বিটিআরসির পরিমাপে এটি ছিল শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ, যেখানে গ্রামীণফোন জানিয়েছিল শূন্য দশমিক ০৪ শতাংশ। উভয় হারই নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ সীমার নিচে ছিল।

গ্রামীণফোনের সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, যা নির্ধারিত ৯৮ শতাংশের চেয়ে বেশি।

মূল্যায়নে কিছু উপজেলায়, বিশেষ করে বান্দরবান ও রাঙামাটিতে উল্লেখযোগ্য পার্থক্যও পাওয়া গেছে।

গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ‘সেবার মান উন্নত করা একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা আরও উন্নত করতে প্রতিষ্ঠানটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

‘গ্রামীণফোনের সর্বশেষ প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু এলাকা বাদে বাকি সব জায়গায় বিটিআরসির কিউওএসের সব মানদণ্ড পূরণ করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নেটওয়ার্ক আরও উন্নত করার জন্য আমরা কাজ করছি’, যোগ করেন তিনি।

রবির তথ্য যাচাইয়ে সমস্যা

মূল্যায়নের সময় রবি তথ্য ও নেটওয়ার্কের মান নিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়েছে।

বিটিআরসি রবির গড় ফোর-জি ডাউনলোড গতি ৬ দশমিক ৮৫ এমবিপিএস পরিমাপ করেছে। যেসব অপারেটরের তথ্য বিটিআরসি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পেরেছে, তাদের মধ্যে এটি ছিল সর্বনিম্ন। তবে এই গতিও সর্বনিম্ন নির্ধারিত ৩ দশমিক ৫০ এমবিপিএসের চেয়ে বেশি।

রবির টু-জি কল সেটআপ সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ২৯ শতাংশ, যা ৯৯ শতাংশের মানদণ্ডের চেয়ে সামান্য বেশি। মূল্যায়নে বিভিন্ন এলাকায় রবির দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের মধ্যেও পার্থক্য পাওয়া গেছে।

প্রয়োজনীয় মূল ডেটা বা বাইনারি ফাইল না থাকায় রবির ৪১ হাজার ৮১৯টি সেলের তথ্য বিটিআরসি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।

অপারেটরগুলো সাধারণত এ ধরনের ফাইল মাত্র সাত দিন সংরক্ষণ করে। তাই বিটিআরসি রবির নিজস্ব বিশ্লেষণ ব্যবহার করেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি জানিয়েছে, পরের মাস থেকে প্রতিদিন তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করা হবে।

রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার শাহেদ আলম নেটওয়ার্কের মান মূল্যায়নে শুধু টিএমএসের তথ্য ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তিনি বলেন, পরিমাপের সংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতির কারণে ফলাফল প্রভাবিত হতে পারে। ফলে সীমিত নেটওয়ার্ক কাভারেজ বা ছোট ডেটাসেট থাকা অপারেটরগুলো বেশি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও বেশি ট্রাফিক এবং গ্রাহক থাকা অপারেটরগুলোর তুলনায় ভালো করছে বলে মনে হতে পারে।

তিনি দাবি করেন, নেটওয়ার্কের ব্যাপ্তি ও গ্রাহকের সংখ্যার মতো বিষয়গুলো ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। যার ফলে বড় নেটওয়ার্ক, বেশি গ্রাহক ও ট্রাফিকসমৃদ্ধ অপারেটরের তুলনায় সীমিত নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও অপ্রতুল ডেটা সরবরাহকারী অপারেটরের ফল ভালো আসতে পারে।

‘শুধু টিএমএস থেকে পাওয়া কিউওএসের তথ্যের ভিত্তিতে অপারেটরদের মধ্যে তুলনা করলে বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ঝুঁকি থাকে’, যোগ করেন তিনি।

শাহেদ দাবি করেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামগ্রিক কিউওএস নির্ধারণ বা তুলনার জন্য শুধু টিএমএসের তথ্য ব্যবহারের নজির নেই।

তিনি বলেন, ‘যেকোনো কিউওএস মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এর পদ্ধতি, পরিমাপের আওতা, নমুনা সংগ্রহ কাঠামো, স্বচ্ছতা এবং ব্যবহৃত তথ্য কতটুকু প্রতিনিধিত্বমূলক, সেটার ওপর।’

বাংলালিংকের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি ধারাবাহিকতা

বিটিআরসির পরিমাপ করা গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলোর মধ্যে বাংলালিংক সবচেয়ে ধারাবাহিক ফল পেয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলালিংকের টু-জি কল সেটআপ সফলতার হার ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং গড় ফোর-জি ডাউনলোড স্পিড ৮ দশমিক ৬১ এমবিপিএস পরিমাপ করেছে।

তাদের টু-জি কল ড্রপের হার ছিল শূন্য দশমিক ৩৬ শতাংশ, আর ফোর-জি আরআরসি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। সিএসএফবি সফলতার হার ছিল ৯৯ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং এসএমএস সম্পন্ন হওয়ার হার ছিল ৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।

জাতীয় পর্যায়ে বাংলালিংকের দেওয়া তথ্য ও বিটিআরসির পরিমাপের তেমন ব্যবধান পাওয়া যায়নি।

তবে মূল্যায়নে দেখা গেছে, বান্দরবানের কয়েকটিসহ ছয়টি উপজেলায় টু-জি ও ফোর-জি—উভয় নেটওয়ার্কেই ‘নো সার্ভিস’ ছিল।

ইংরেজিতে মূল প্রতিবেদন পড়তে ক্লিক করুন এখানে।