মুক্তিযুদ্ধ

৮ আগস্ট ১৯৭১: শরণার্থীদের সহায়তায় ব্রিটিশ ছাত্রের ১,৬১০ কিলোমিটার পদযাত্রা

আহমাদ ইশতিয়াক

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ৮ আগস্ট গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, 'রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে তার জীবননাশের প্রহসনমূলক বিচার অনুষ্ঠান থেকে বিরত না হলে, এর দায়ভার ইয়াহিয়াকে বহন করতে হবে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি অবিলম্বে বাংলাদেশের নেতার প্রহসনমূলক বিচার বন্ধ করতে হবে।' এদিন বক্তব্যে তিনি বিশ্বমহল ও বিশ্ব নেতাদের বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

ঢাকায় এদিন

৮ আগস্ট রাত ৮টার পরপরই ঢাকার হলিক্রস স্কুল পেরিয়ে ফার্মগেটের মুখে ২ নম্বর সেক্টরের ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা বদিউল আলম বদি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, হাবিবুল আলম, পুলু, কামরুল হক স্বপন এবং আবদুস সামাদ ক্ষিপ্রগতিতে একটি টয়োটা সেডান গাড়ি থেকে নেমে আসেন, চোখের পলকে তাদের হাতের পাঁচটি স্টেনগান ও এলএমজি গর্জে ওঠে। মুহূর্তেই ৫ হানাদার সেনা ও ৬ রাজাকার নিহত হয়।

৮ আগস্ট ঢাকা শহর শান্তি কমিটির সভায় ঢাকা শহর জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক গোলাম সরওয়ার বলেন, 'পাকিস্তান টিকে থাকার জন্যে জন্মলাভ করেছে এবং চিরদিন টিকে থাকবে। আমরা বর্তমান দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর সময়োচিত হস্তক্ষেপে সমস্যা কাটিয়ে উঠেছি।'

ভারতে এদিন

৮ আগস্ট সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকো বাংলাদেশের বিষয়ে আলোচনার জন্য এবং পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যকার উত্তেজনা নিরসনে বিশেষ বৈঠকের জন্য বিশেষ সফরে বিকেল সাড়ে ৫টায় দিল্লিতে এসে পৌঁছান।

তার এই সফর মূলত সম্প্রতি চীন ও যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী গড়ে উঠা, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক ভয়াবহ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক অবস্থা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পরামর্শের জন্য আয়োজন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। একইসঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপনে চীন সফরেও উদ্বিগ্ন সোভিয়েত ইউনিয়ন। এদিন রাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিংয়ের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন তিনি। ৬৫ মিনিট স্থায়ী এই বৈঠকে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে শরণার্থী সমস্যা, পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি, ভারত পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নিরসনসহ নানা বিষয়ে আলোচনা হয়। এরইমধ্যে ঠিক হয়েছে আগামী ১০ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন আঁদ্রে গ্রোমিকো।

৮ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তহবিল গঠনে ও জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে কলকাতার মোহনবাগান মাঠে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ও শ্রী গোষ্ঠপাল একাদশের মধ্যে এক প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। এই ম্যাচে শ্রী গোষ্ঠপাল একাদশটি ছিল মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া। এই খেলায় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ৪-২ গোলে শ্রী গোষ্ঠপাল একাদশকে পরাজিত করে। শ্বাসরুদ্ধকর এই ম্যাচ দেখতে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিলেন। ম্যাচের আগে দুই দলের অধিনায়ক একে অপরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। ম্যাচ শেষে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যরা মাঠের চারপাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে সমর্থক ও দর্শকদের অভিবাদন জানান। এই ম্যাচে টিকিট থেকে প্রাপ্ত অর্থ শরণার্থী তহবিলে জমা দেওয়া হয়। এই ম্যাচ উপলক্ষে মাঠকর্মীরা বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেছিলেন।

৮ আগস্ট দিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাবে লোকসভা সদস্য চন্দ্রদ্বীপ যাদবের সভাপতিত্বে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দারিতে এক নাগরিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় বক্তব্য দেন ভারতের শিল্প উন্নয়ন মন্ত্রী মইনুল হক চৌধুরী, লোকসভার সদস্য ইন্দ্র কুমার গুজরাল, আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান ও অধ্যাপক হীরেন মুখার্জি।

৮ আগস্ট দিল্লিতে লোকসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সামরিক আদালতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির বিচার অনুষ্ঠানের ঘোষণায় ভারত সরকারের উদ্বেগ ও ক্ষোভের কথা ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশ্বনেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক মহলে এদিন

৮ আগস্ট বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে ও শরণার্থীদের সহায়তার জন্য স্টিফেন উডরুক নামের এক ব্রিটিশ ছাত্র ৩১ দিনে এক হাজার ৬১০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে স্কটল্যান্ডের জন গ্রোটস থেকে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তে পৌঁছান। গত ৮ জুলাই তিনি স্কটল্যান্ডের জন গ্রোটস থেকে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন। একইদিন মার্ক সারমান নামের আরেক ছাত্র জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে পদযাত্রা শুরু করেছিলেন।

৮ আগস্ট লন্ডনে পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হামিদুল হক চৌধুরী ও পিডিপি নেতা মাহমুদ আলী এক বিবৃতিতে বলেন, 'কথিত দেশদ্রোহীদের স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টায় মেতেছে কিছু দেশ। আমরা এটি সহ্য করব না। আমাদের দেশকে রক্ষায় আমরা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে বাধ্য থাকব।' দুজনে ওই যৌথ বিবৃতিতে একইসঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতিদানের ব্যাপারে ভারতকে নিবৃত্ত করার জন্য সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকোর প্রতি আহ্বান জানান।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এদিন

৮ আগস্ট প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদপত্র 'দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট' এর এক প্রতিবেদনে দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের মস্কো প্রতিনিধি দেব মুরারকা বলেন, হুট করেই  ভারত সফরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কারণ ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। একইসঙ্গে পূর্ব বাংলায় অসহনীয় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্ক ও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এদিকে মস্কো কিছুদিন আগে মার্কিন সরকারের উদ্যোগে ভিয়েতনাম থেকে অভ্যুত্থান দমন বিশেষজ্ঞ রবার্ট জ্যাকসনকেও বাংলাদেশে পাঠাবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এ ছাড়া, কিছুদিন আগে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপনে চীন সফরও অন্যতম একটি কারণ। সবকিছু বিবেচনা করেই সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আঁদ্রে গ্রোমিকোর এই  সফরসূচি দ্রুততম সময়ে তৈরি করা হয়েছে।

দেশব্যাপী প্রতিরোধ যুদ্ধ

৮ আগস্ট সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের সাচনায় মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি আক্রমণের জন্য নিঃশব্দে এগিয়ে গেলেও মুক্তিবাহিনীর অবস্থান টের পেয়ে হানাদার বাহিনী বাঙ্কার থেকে অতর্কিত হামলা চালায়। প্রথমে হতচকিত হয়ে গেলেও মুক্তিবাহিনী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তুলে। বৃষ্টির মতো গোলাগুলির একপর্যায়ে এগোতে না পেরে এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এই অবস্থায় বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। একপর্যায়ে মুক্তিবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম সহযোদ্ধাদের আর না এগিয়ে ওই অবস্থানে থেকে গুলি চালাতে শুরু করেন এবং কয়েকটি গ্রেনেড নিয়ে একাই দুর্ধর্ষ সাহসে সামনে সফলভাবে হানাদারদের বাঙ্কারে গ্রেনেড চার্জ করে দুটি বাঙ্কার ধ্বংস করেন। এসময় পাকিস্তানী হানাদারদের তৃতীয় বাঙ্কারে গ্রেনেড চার্জ করতে গেলে হানাদারদের একটি গুলি সিরাজুল ইসলামের শরীরে লাগলে তিনি শহীদ হন। এই যুদ্ধে ছয় জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন এবং পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

৮ আগস্ট খুলনার তেরখাদায় রাজাকাররা ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে এবং বহু বাড়িতে সংঘবদ্ধ হয়ে আক্রমণ ও লুটতরাজ চালায়।

৮ আগস্ট সিলেটের গোপালগঞ্জে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্যরা এক মুক্তিযোদ্ধাকে আটক করে পাশবিক নির্যাতনের পর গুলি করে হত্যা করে।

সূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র: ষষ্ঠ, দশম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড

দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা, ৮ আগস্ট ১৯৭১

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা, ৯ আগস্ট ১৯৭১ 

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, ৮ আগস্ট ১৯৭১

আহমাদ ইশতিয়াক

ahmadistiak1952@gmail.com