‘ইসরায়েলকে নিয়ে’ ইরান-আজারবাইজান সংকট
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মিল থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে আজারবাইজানের বিরোধী দীর্ঘদিনের। এই বিরোধ মূলত রাজনৈতিক।
আজারবাইজানের অধিবাসী শিয়া মতবাদের অনুসারী হলেও জাতিগতভাবে তারা 'তুর্কি'। তাই তুরস্কের সঙ্গে আজারবাইজানের সখ্যতা ইরানের চেয়ে গভীর।
অপর দিকে, ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আজেরিদের বসবাস। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে স্বাধীন আজারবাইজান প্রতিষ্ঠিত হলে সেই প্রভাব ইরানের স্বাধীনচেতা আজেরিদের ওপরও পড়ে।
ফলে প্রায় ৩০ বছর ধরে ইরানের সঙ্গে আজারবাইজানের সম্পর্কে আছে তিক্ততার সুর। সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল 'বন্ধুত্বে'র হাত বাড়ায় আজারবাইজানের দিকে।
পাশাপাশি, ১৯৯৪ সালে আর্মেনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে আজারবাইজান তার আর্মেনীয় অধ্যুষিত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নাগোর্নো-কারাবাখ হারানোর পর তেলসমৃদ্ধ দেশটিকে সামরিক শক্তিতে বলিয়ান করতে এগিয়ে আসে ইসরায়েল।
সেসময় তুরস্কের সঙ্গে ইসরায়েলের সখ্যতা ছিল বলে বাকু-তেল আবিবের সম্পর্ক অনেকটা গোপনে হলেও সরল গতিতেই এগিয়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারার সঙ্গে তেল আবিবের দূরত্ব থাকলেও বাকুর সঙ্গে তেমন কোনো দূরত্ব হয়নি বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
নানা কারণে তেল আবিবের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কের কথা আজারবাইজান সরকার প্রকাশ্যে বলতে পারে না। কেননা, সেই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ রাশিয়ার অসন্তুষ্টির বিষয় আছে। এর সঙ্গে আছে আজারবাইজানিদের ওপর ইরানের প্রভাবের ভয়।
তবে দীর্ঘদিন পর সেই পুরনো প্রসঙ্গটি আবার প্রকাশ্যে এলো।
গতকাল বুধবার ইরানের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসাইন আমির আব্দুল্লাহিয়ান মস্কোয় রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই লাভরভের সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, আজারবাইজানে 'ইহুদিবাদীদের উপস্থিতি'তে ইরান ভীষণ উদ্বিগ্ন।
তিনি আরও বলেছেন, 'ককেশাস অঞ্চলে মানচিত্রে পরিবর্তন' ইরান মেনে নেবে না।
ইসরায়েলকে আজারবাইজানের প্রধান অস্ত্র-সরবরাহদাতা হিসেবে উল্লেখ করে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে গতকাল বলা হয়, প্রায় ৭০০ কিলোমিটার সীমান্তের দুই প্রতিবেশী ইরান ও আজারবাইজানের মধ্যে গত সেপ্টেম্বর থেকে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
গত বছর আর্মেনিয়ার সঙ্গে আজারবাইজানের ৪৪ দিন যুদ্ধের সময় ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামিক রেভুলেশনারি গার্ড করপোরেশন আজারবাইজানের সীমান্তে সামরিক মহড়ার আয়োজন করে। সেই মহড়ার 'উত্তর' হিসেবে গতকাল আজারবাইজান তার ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সঙ্গে মহড়া শুরু করে।
মহড়া শুরুর ১ দিন আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলেন, ইরান তার সীমানার কাছে ইসরায়েলের উপস্থিতি মেনে নেবে না। এ জন্যে 'প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা' নেওয়ার হুশিয়ারিও দেন তিনি।
এমন তিক্ততার মধ্যে কথা বলেছেন, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ। গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, আজারবাইজানের ভূমিতে ইসরায়েলের উপস্থিতি নিয়ে ইরানের এই 'ভিত্তিহীন' অভিযোগের জবাব দিতে হবে।
একই দিনে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, আজারবাইজান সরকার বাকুতে ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিনিধিত্বকারী কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে ধর্মীয় সমাগম এড়াতে সেই কেন্দ্রটি বন্ধ রাখা হয়েছে।
নানা কারণে ইরান ও আজারবাইজানের মধ্যে এই উত্তেজনা থেকে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। কেননা, ঐতিহাসিকভাবে আর্মেনিয়ার সঙ্গে ইরানের রাজনৈতিক সম্পর্ক বেশ দৃঢ়। আর তুরস্কের সঙ্গে আর্মেনিয়ার রয়েছে ঐতিহাসিক বিরোধ।