ইরাকের নির্বাচন যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তপ্ত রণাঙ্গন ইরাকে আজ রোববার সাধারণ নির্বাচন শুরু হয়েছে। দেশটিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয় ভোটের বাক্সেও মুখোমুখি এই দুটি শত্রুভাবাপন্ন দেশ।

iraq_ballot.jpg
ছবি: রয়টার্স

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থের মাঝে চাপা পড়ে নিজেদের নেতা খুঁজছেন ইরাকিরা।

আবার নির্বাচন বয়কটের ডাকও দিয়েছেন অনেকে।

ইতিহাস-সমৃদ্ধ ইরাকে 'মানব বিধ্বংসী' বোমা থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র-মিত্ররা ২০০৩ সালে ইরাকে নিজেদের দখলদারিত্ব কায়েম করে। সেসময় দেশটিতে দেওয়া হয় 'গণতন্ত্র'। গত প্রায় ২ দশক ইরাকে গণতন্ত্র হেঁটেছে কাঁটা-বিছানো পথে। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ ও ক্ষমতাসীনদের দাপটে দেশটির চলমান গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি নাখোশ সাধারণ জনগণ।

গত ২ বছর ধরে ইরাকে সরকারবিরোধী গণআন্দোলন চলছে। এমন পরিস্থিতিতে সেখানে সুসংগঠিত সশস্ত্র মিলিশিয়া ও সুপ্রতিষ্ঠিত ইসলামপন্থি শিয়া দলগুলো জয়ী হওয়ার প্রত্যাশা করছে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, পার্লামেন্টের ৩২৯ আসনের জন্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩ হাজার ২০০ এর বেশি প্রার্থী। এতে অংশ নিচ্ছে অন্তত ১৬৭টি রাজনৈতিক দল।

ইরাকের নির্বাচন বিশ্ববাসীর জন্যেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছে সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বহু বছরের সংঘাতে বিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্নীতির বিস্তার, করোনার থাবা— সব মিলিয়ে ইরাকের রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। সেখানকার শক্তিশালী সশস্ত্র দলগুলো প্রতিনিয়ত সরকারের অস্তিত্বকে হুমকিতে ফেলছে। আইএসবিরোধী যুদ্ধের কারণে এখনো হাজারো ইরাকি গৃহহীন।

iraq_security.jpg
নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রহরা। ১০ অক্টোবর ২০২১। ছবি: রয়টার্স

এমন পরিস্থিতিতে যখন সাধারণ ইরাকিদের দৈনন্দিন জীবনযাপনই মুখ্য তখন এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে ইরাকের পররাষ্ট্রনীতি। সেই নীতির প্রভাব পড়বে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। আর মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো বড় ঘটনার প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বে।

হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের ইরাকি-আমেরিকান গবেষক মানসিন আলশামারি গালফ নিউজকে বলেন, 'সবার দৃষ্টি ইরাকের নির্বাচনের দিকে। সেখানে কারা নির্বাচিত হচ্ছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারিত হবে।'

নতুন নির্বাচনী আইন

গত ২ বছর ধরে চলা গণবিক্ষোভের মুখে ইরাকে নির্বাচন হচ্ছে নির্ধারিত সময়ের আগেই। এই প্রথম দেশটিতে গণ-আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন হচ্ছে। জনগণের দাবির প্রতি নতি স্বীকার করে পরিবর্তন আনা হয়েছে নির্বাচনী আইনে। আসনগুলো ছোট-ছোট এলাকায় ভাগ করার পাশাপাশি আরও বেশি সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থীকে নির্বাচনে লড়াইয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইরাকের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এ বছরের শুরুতে রেজুলেশন গ্রহণ করে। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে অন্তত ৬০০ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক রয়েছেন।

এই প্রথম বায়োমেট্রিক কার্ডের মাধ্যমে ভোট দিচ্ছেন ইরাকের ভোটাররা।

এত কিছু পরও ভোট কেনার, ভয় দেখানোর, ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

বিভক্ত শিয়া শক্তি

ইরাকে স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর দেশটির শাসন ক্ষমতা সংখ্যালঘু সুন্নিদের হাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের হাতে চলে আসে।

ইরাকের শিয়া দলগুলোর ওপর ইরানের রয়েছে সীমাহীন প্রভাব। সেই প্রভাবকে কেন্দ্র করে এখন ইরাকের শিয়া সমাজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে রয়েছেন, ২০১৮ সালে নির্বাচিত প্রভাবশালী শিয়া নেতা মোকতাদা আল সদর এবং অন্যদিকে রয়েছে হাদি আল আমেরির নেতৃত্বাধীন ফাতাহ অ্যালায়েন্স।

ফাতাহ অ্যালায়েন্সে রয়েছে বেশ কয়েকটি ইরানপন্থি শিয়া মিলিশিয়া দল। আবার, ইরানের সঙ্গে আল সদরের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যদিও তিনি প্রকাশ্যে তা অস্বীকার করেন।

এই প্রথম ইরানপন্থি খাতাইব হিজবুল্লাহ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে।

নির্বাচন বয়কটের ডাক

সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যে তরুণরা অংশ নিয়েছিলেন তারা এখন নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা-বিভক্ত।

গত ২ বছরের আন্দোলনে অন্তত ৬০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এতো প্রাণের বিনিময়ে যে নির্বাচন তা বয়কটের ডাক দিয়েছেন সেই তরুণরাই। কেননা, আন্দোলন করার কারণে অনেককে অপহরণ ও হত্যা করা হয়েছে।

তবে সর্বজন শ্রদ্ধেয় গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলি আল সিস্তানি সবাইকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইরাকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এটিই উত্তম পন্থা।

২৭ বছর বয়সী বেসরকারি চাকরিজীবী মুস্তাফা আল জাবুরি গণমাধ্যমকে বলেন যে তিনি ভোট দিতে যাবেন না। কেননা, বিক্ষোভ চলাকালে তার চোখের সামনে তার বন্ধুকে হত্যা করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, 'আমি ১৮ বছর বয়স থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছি। ভেবেছি, পরিবর্তন আসবে। কিন্তু, আসেনি। পরিস্থিতি দিনকে দিন আরও খারাপ হয়েছে।'

আঞ্চলিক প্রভাব

ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মুস্তাফা আল খাদিমি চাচ্ছেন ইরাককে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপন করতে। সে কারণে তিনি সম্প্রতি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে বাগদাদে কয়েক দফা আলোচনার আয়োজন করেন।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রান্দা স্লিম গণমাধ্যমটিকে বলেন, 'আল খাদিমি আসলে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের স্বার্থের ভারসাম্য টানার চেষ্টা করছেন। তিনি যদি পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন তাহলে তার এসব চেষ্টা বিফলে যাবে।'