মারিউপোলে ভোর ৬টার পর থেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান রাশিয়ার

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইউক্রেনের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মারিউপোলের দখল নিতে প্রায় ১ মাসেরও বেশি সময় ধরে লড়ছে রুশ বাহিনী। দেশটিতে আক্রমণের পর প্রায় ২ মাস কেটে গেলেও এখনো ইউক্রেনের প্রধান কোনো শহরের দখল নিতে পারেনি রাশিয়া।

এমন পরিস্থিতিতে ক্রেমলিন মারিউপোলে যুদ্ধরত ইউক্রেনীয় সেনাদের মস্কো সময় সকাল ৬টা (বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টা) থেকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে।

আজ রোববার বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আত্মসমর্পণের সময় শুরু হওয়ার পর ৩০ মিনিট কেটে গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে শহরটিতে নতুন কোনো সামরিক ব্যবস্থার সংবাদ পাওয়া যায়নি।

গতকাল শনিবার রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের সেনারা মারিউপোলের নগরাঞ্চল সম্পূর্ণ দখলে নিয়েছেন। শুধুমাত্র ইউক্রেনীয় যোদ্ধাদের ছোট অংশ শহরের ভেতরে একটি ইস্পাত কারখানা থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে মস্কোর এই দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যদি রাশিয়া এ শহরের দখলে নেয় তাহলে তা হবে ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া আগ্রাসনের পর প্রথম বড় ইউক্রেনীয় শহরের পতন।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্তায় বলা হয়, 'আজভস্টল ইস্পাত কারখানায় তৈরি হওয়া ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে এবং একই সঙ্গে পুরোপুরি মানবতার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রুশ সেনাবাহিনী ইউক্রেনের জাতীয়তাবাদী ব্যাটেলিয়নের জঙ্গি সেনা ও বিদেশি ভাড়াটে সৈনিকদের আজ ১৭ এপ্রিল, ২০২২ মস্কো সময় ভোর ৬টা থেকে সব ধরনের সহিংসতা বাদ দিয়ে আত্মসমর্পণ করার আহ্বান জানাচ্ছে।'

'যারা অস্ত্র নামিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন, আমরা নিশ্চিত করছি, তাদের জীবন বাঁচবে,' উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, সেনারা সকাল ১০টার মধ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া অক্ষত অবস্থায় কারখানা ছেড়ে চলে যেতে পারবেন।

কিয়েভের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

ইউক্রেনের সংবাদমাধ্যম 'ইউক্রেনিস্কা প্রাভদা'কে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, 'পরিস্থিতি খুবই গুরুতর। আমাদের সেনারা আটকে আছেন। আহতরাও আটকে আছেন। সেখানে মানবতার সংকট চলছে। তারপরও, তারা নিজেদেরকে সুরক্ষিত রাখছেন।'

শনিবার মস্কো জানায়, তাদের যুদ্ধবিমান কিয়েভের একটি ট্যাংক মেরামত কারখানায় হামলা চালিয়েছে। দেশটির দক্ষিণপূর্ব দিকের দারনিতস্কি জেলায় প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দের পর সেখান থেকে ধোঁয়া ওঠতে দেখা গেছে।

কিয়েভের মেয়র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এ ঘটনায় কমপক্ষে একজন নিহত হয়েছেন এবং চিকিৎসকরা আহত বেশ কয়েকজনকে বাঁচানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ইউক্রেনের রণতরী বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ 'মস্কোভা' ধ্বংস করার দাবির পর রুশ বাহিনী নতুন করে কিয়েভে হামলা শুরু করে।

ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, রুশ যুদ্ধবিমানগুলো বেলারুশ থেকে এসে পোল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি লিভিভ শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ইউক্রেন ৪টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার দাবি করেছে।

এখন পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় থাকা লিভিভ শহর শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাদের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আরআইএ জানিয়েছে, রুশ বাহিনী মারিউপোলের নগর অঞ্চল থেকে সব ইউক্রেনীয় সেনাকে নির্মূল করতে পেরেছে এবং বাকিদেরকে আজভস্টল ইস্পাত কারখানায় অবরুদ্ধ করেছে।

গতকাল ইউক্রেন জানায়, শহরটিতে অন্তত ৪ হাজার ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছেন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, 'রাশিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে সবাইকে ধ্বংস করে ফেলতে চাইছে।'

তার সরকার মারিউপোলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলেও জানান তিনি। তবে সেখানকার নগরাঞ্চল থেকে সব সৈন্য নির্মূল করার বিষয়ে মস্কোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কোনো মন্তব্য করেননি জেলেনস্কি।

পূর্বাঞ্চলের শহর খারকিভের গভর্নর গণমাধ্যমকে জানান, ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কমপক্ষে একজন নিহত ও ১৮ জন আহত হয়েছেন। জ্বলত গাড়ি ও অফিস ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে ধোঁয়া ওঠতে দেখা গেছে।

ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে মাকোলাইভে একটি সামরিক যানবাহন মেরামত কারখানায় রাশিয়া আক্রমণের দাবি করেছে।

নতুন করে ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে দূর পাল্লার হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। গত শুক্রবার ক্রেমলিন জানায়, ইউক্রেনের 'জঙ্গি হামলা' ও 'নাশকতামূলক কার্যক্রমের' বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে এ ধরনের হামলার তীব্রতা আগামীতে আরও বাড়বে। এ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে রাশিয়া কৃষ্ণসাগরে রণতরী 'মস্কোভা' ডুবে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

কিয়েভ ও ওয়াশিংটন জানায়, যুদ্ধজাহাজটি ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডুবে যায়। তবে মস্কো জানিয়েছে, জাহাজে আগুন লেগেছিল এবং এর ৫০০ ক্রুর সবাইকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

মারিউপোলের পতন হলে তা হবে ইউক্রেনে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্জন। এটি দনবাস অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বন্দর। রাশিয়া ইতোমধ্যে দনবাস অঞ্চলের লুহানস্ক ও দোনেৎস্ককে পুরোপুরি 'স্বাধীন' করার অঙ্গীকার করেছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পুতিন এখন দনবাস অঞ্চলে আরও বেশি এলাকা দখল করে যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার দাবি করতে চাচ্ছেন। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দেশটি আন্তর্জাতিকভাবে চাপে পড়ে।