তালেবান উত্থানে দেশ ছাড়তে চান আফগান তরুণরা
কাবুলের একটি অভিজাত ক্যাফেতে বসেছিলেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। টেবিলে গরম রুটি ও কাবাব। ভেসে আসছে গান। থেকে থেকে হাসির রোল।
হঠাৎ লোডশেডিং। আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে এমন ঘটনা নিত্যদিনের। ক্যাফের মালিক জেনারেটর চালু করলে আবার শুরু হয় গান, শুরু হয় আড্ডা।
তরুণদের অনেকেই সংবাদমাধ্যম আরব নিউজকে বলেছেন, তারা বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দেন। তবে বর্তমানে যে স্বাধীনতা ভোগ করছেন, তা বজায় থাকবে কিনা সে বিষয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন। কেননা, ২০ বছরের দখলদারিত্বের পর আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো বাহিনী চলে যাওয়ার পর তালেবান যোদ্ধারা ক্রমান্বয়ে দেশটিতে শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী শাইমা রেজায়ী (২২) সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘তালেবানদের ফিরে আসার মানে হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সমাপ্তি।’
তালেবানদের ক্রমাগত প্রভাব বিস্তার ও দেশটির অধিকাংশ এলাকা দখলের কারণে শাইমার মতো আরও অনেক উচ্চশিক্ষিত আফগান তরুণ-তরুণী উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গেল সপ্তাহে আফগান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিমন্ত্রী গোলাম বাহাউদ্দিন জাইলানি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘গত দেড় মাসে সংঘর্ষের কারণে দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চল থেকে প্রায় সাড়ে ৩২ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে।’
আফগানিস্তানের প্রায় ৮৫ শতাংশ তালেবান যোদ্ধারা দখল করে নিয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গত ১৫ দিনে ছয় হাজারের মতো পরিবার ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
তালেবানদের এক মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ আরব নিউজকে বলেছেন, সব নাগরিকের অধিকার রক্ষিত হবে।
তবে, তার এমন আশ্বাসে আশ্বস্ত হতে পারছেন না দেশটির শিক্ষিত তরুণ প্রজন্ম। মাহনুশ আমিরি নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘যদি তালেবানরা আবার ক্ষমতায় আসে, তাহলে তরুণ আফগানরা দেশ ছেড়ে চলে যাবে।’
আফগানিস্তানের ‘লিটল ইউরোপ’ হিসেবে পরিচিত কাবুলের অভিজাত কার্তে চার এলাকার সিম্পল ক্যাফের মালিক ও দীর্ঘদিন ইরানে শরণার্থী হিসেবে থাকা মিনা রেজায়ী (৩২) আরব নিউজকে বলেন, ‘শরণার্থী জীবনের দুঃখ আমি বুঝি। যদি এ দেশ আমাদের জন্যে জেলখানা হয়ে যায়, তাহলে এখান থেকে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত এপ্রিলে বিদেশি সেনাদের আফগানিস্তান ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার অনেক আগেই সংঘাত থেকে বাঁচতে ও উন্নত জীবনের আশায় অন্তত ১০ হাজার আফগান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কে চলে যান।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এক সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, বিদেশি সেনারা আফগানিস্তান ছাড়ার ছয় মাসের মধ্যে তালেবানরা কাবুল দখল করে নিতে পারে। এমন সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর সেখানে পাসপোর্ট ও উন্নত দেশের ভিসা সংগ্রহে হিড়িক পড়ে গেছে। কেননা, ধনী আফগানরা দেশ ছাড়তে মরিয়া হয়ে পড়েছেন।
একটি প্রাইভেট কোম্পানির কর্মী ফাতিমা সাদাত (৩০) বলেছেন, ‘তালেবানদের ক্ষমতা দখলের মানে হচ্ছে দেশটি আমাদের কাছে কারাগারে পরিণত হওয়া।’
‘এমন পরিস্থিতিতে এখানে থাকা সম্ভব নয়। তাই আমিও দেশ ছেড়ে চলে যাব,’ বলেন তিনি।
‘চলমান সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে আফগানিস্তানের ফ্যাশন শিল্পে পড়েছে’ উল্লেখ করে ২০২০ সালে নির্বাচিত মিস আফগানিস্তান নিগারা সাদাত বলেছেন, ‘যদি তালেবানরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়, তাহলে শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন।’