জবিতে ক্লাস মনিটরিং সফটওয়্যার: তদারকি নেই, ৬ মাসেও জমা পড়েনি প্রতিবেদন

রাকিব মাদবর
রাকিব মাদবর

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো গত ১ সেপ্টেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) চালু হয় ক্লাস মনিটরিং সফটওয়্যার (সিএমএস)। তবে চালুর প্রায় ৬ মাস পার হলেও এ–সংক্রান্ত কোনো প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ফলে উদ্যোগটি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ক্লাস নিয়মিত হচ্ছে কি না, শিক্ষক যথাসময়ে ক্লাসে উপস্থিত থাকছেন কি না ও নির্ধারিত সিলেবাস অনুযায়ী পাঠদান এগোচ্ছে কি না—এসব তদারকির জন্য এই মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে বাস্তবে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা।

বিভিন্ন বিভাগের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মনিটরিং কার্যক্রমের কোনো সমন্বিত প্রতিবেদন এখনো প্রশাসনের কাছে জমা পড়েনি।

নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর ক্লাসে উপস্থিতি, ক্লাস না হওয়ার কারণ ও সার্বিক একাডেমিক অগ্রগতি নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও সেটির কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না।

ওই সফটওয়্যারের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শুরুর দিকে একটি নির্দেশনা ছিল, কিন্তু পরে সেটির কোনো অনুসরণ আমরা দেখিনি। প্রতিবেদন তৈরি বা জমা দেওয়ার বিষয়টিও কার্যকর হয়নি।’

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, মনিটরিং ব্যবস্থা থাকলেও ক্লাসের অনিয়ম কমেনি। অনেক ক্ষেত্রে এখনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্লাস বাতিল হয়, আবার নির্ধারিত সময়েও সব ক্লাস হয় না।

ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষার্থী হেলাল উদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কাগজে-কলমে মনিটরিং আছে, কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রভাব আমরা দেখছি না। এর মাধ্যমে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের অপচয় হচ্ছে।’

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিক বিভাগের শিক্ষার্থী আদিবা নওমি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘যদি ঠিকভাবে তদারকি হতো, তাহলে হঠাৎ করে ক্লাস বাতিল হওয়ার ঘটনা এতটা থাকত না। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো এই সিস্টেমের মাধ্যমে সঠিক সময়ে ক্লাস হবে। তবে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, আগের মতোই পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্লাস বাতিল হচ্ছে।’

মনিটরিংয়ের ক্ষেত্রে ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভদের (সিআর) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেকটাই অনানুষ্ঠানিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্লাস না হওয়া বা শিক্ষক অনুপস্থিতির বিষয়টি সিআরকে আগে থেকে জানানোর কথা থাকলেও শিক্ষকরা সে নিয়ম মানছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১৭ ব্যাচের সিআর মুজাহিদ বাপ্পি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস মনিটরিং সিস্টেমটি জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে না। প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব ও ডেটা ইনপুট দিয়েও যথাযথ অ্যাসেসমেন্ট না হওয়া এই ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াকে অর্থহীন করে তুলছে।’

আইইআর বিভাগের সিআর ওমর ফারুক বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ইনপুট দিচ্ছি, তবে এটার ফলাফল কতটুকু এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। এছাড়া এই সিস্টেমটা অনেকটা জটিল মনে হয়। প্রতিদিন যে কয়টি ক্লাস হয়, সে কয়বার লগইন দিতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষকরা যেন নিয়মিত ক্লাস নেন, সেজন্য এটি করা। তবে আমরা দেখছি এই সিস্টেম চালু হওয়ার পরেও তারা পূর্বঘোষণা ছাড়াই ক্লাস বাতিল করছেন। ফলে আমাদের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জবি আইসিটি সেলের প্রোগ্রামার মো. হাফিজুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন ভিসি আসার পর এই বিষয়ে কোনো মিটিং হয়নি। তবে আগের ভিসি থাকাকালীন আমি বেশ কয়েকবার রিপোর্ট দিয়েছি। রিপোর্ট নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না, তা জানা নাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস উদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিয়েছে খুব অল্প সময় হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আইসিটি দপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করেছি। খুব শিগগির এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সব বিভাগের সিআরদের সমন্বয়ে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলার নির্দেশ দিয়েছি, যেখানে আমি নিজে যুক্ত থাকব। ওই গ্রুপের মাধ্যমে সিআররা সরাসরি আমাকে তথ্য জানাতে পারবেন।’

তিনি বলেন, ‘আমি আগামী সোমবার থেকে সারপ্রাইজিং ভিজিটে যাবো। যেসব শিক্ষক দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবেন, তাদের সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে।’