ঢাকা-১৩: ছিনতাই আতঙ্ক, নতুন প্রতিশ্রুতি এবং পরিবর্তনের লড়াই

শরীফ এম শফিক
শরীফ এম শফিক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক
সাদী মুহাম্মাদ আলোক

মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে একটি নির্বাচনী মিছিল শুরু হয়ে কাটাসুরের মকবুল হোসেন কলেজের সামনে দিয়ে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে গিয়ে শেষ হলো। এ সময় পাশের এলাকায় লালমাটিয়া মহিলা কলেজের সামনে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে কথা বলছিলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়ে গেলেও তারা জানেন না মোহাম্মদপুর অর্থাৎ ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী কারা।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এবারই তারা প্রথম ভোট দেবেন। তবে কাকে ভোট দেবেন, তা এখনো ঠিক করেননি। প্রার্থীদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর থানাধীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড মিলে গঠিত ঢাকা-১৩। লালমাটিয়া, মোহাম্মদপুর ছাড়াও আসাদগেট, শ্যামলী, বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান, বসিলা, ইউল্যাব ইউনিভার্সিটি, বেতার, নিউরো সায়েন্স হাসপাতাল, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন এলাকায় এই আসনের ভোটারদের বসবাস।

এলাকার বাসিন্দারা জানান, তাদের মূল সমস্যার মধ্যে রয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মাদক ও ছিনতাই। এ ছাড়া দখল ও ফুটপাতে দোকান নিয়েও তাদের অভিযোগ আছে।

টিক্কাপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম (৩৫) ব্যবসা করেন কৃষি মার্কেটে। তিনি জানান, এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। তার আশা, ২০২৩ সালে আগুনে পুড়ে যাওয়া কৃষি মার্কেট নির্বাচনের পর আবার নতুন করে গড়ে তোলা হবে। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা কিছুই পায়নি এখন পর্যন্ত। নির্বাচিত এমপির কাছে আবেদন থাকবে বিষয়টি সুরাহা করা।'

মাদ্রাসা রোডের বাসিন্দা নাসির হাজারী বলেন, 'আমরা নতুন কিছুর প্রতীক্ষায় আছি। শিক্ষার্থীদের দলের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আছে। তবে তাদের দুর্নীতিতে জড়ানো যাবে না।' এলাকায় ছিনতাই-চাঁদাবাজির সমস্যা আছে বলেও জানান তিনি। তবে নির্বাচিত সরকার এলে দেশে একটা স্থিতিশীলতা আসার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি।

এই আসনে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের ভোটার প্রায় ৩০ হাজার। তাদের প্রধান দাবি স্থায়ী পুনর্বাসন। ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সংগঠন স্ট্রান্ডেড পিপলস জেনারেল রিহ্যাবিলিটেশনের (এসপিজিআরসি) এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'সব সরকার আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমাদের অনেকের নামে মামলা হচ্ছে। নিরীহ লোকদের ধরে ধরে জেলে ভরা হচ্ছে। এই সরকার আমাদের কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।'

তিনি আরও বলেন, 'আমরা ক্যাম্পে এক ধরনের বন্দি জীবনযাপন করি। ক্যাম্পে লোকদেখানো মাদকবিরোধী অভিযান হয়। তাও তো মাদক বেচাকেনা কমছে না।' তার মতে, নির্বাচনে যাদের ইশতেহারে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের কথা থাকবে, তারাই ক্যাম্পের ভোট পাবেন।

এ আসনের ভোটার রায়েরবাজারের পারটেক্স গলি এলাকার বাসিন্দা রাশেদের মতে, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রাথমিক কাজ হবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সন্ত্রাস দূর করা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বলেন, 'আগে তো এমপিদের কখনো দেখিনি এলাকায়। এমনকি কারা এমপি ছিলেন, তাও জানতাম না। এবার আমি চাই তরুণরা বেশি বেশি আসুক। তারা একটা গুণগত পরিবর্তন আনতে পারবে বলে আমি মনে করি।'

স্থানীয় ব্যবসায়ী নূরে আলমের মতে, এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী ববি হাজ্জাজ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হকের মধ্যে। দুই প্রার্থী পৃথকভাবে এলাকায় প্রচারণা চালাচ্ছেন, ভোটারদের সঙ্গে দেখা করছেন।

নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে রিকশা প্রতীকের মামুনুল হক এলাকায় 'জাগরণী পদযাত্রা' করছেন। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ মতবিনিময় সভা করছেন, বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মামুনুল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ভোটারদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পাচ্ছি। নারী-পুরুষ, শিশু সবাই আমাকে সাদরে গ্রহণ করছে। রাস্তায় বের হলে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরা, বিভিন্ন পেশাজীবী লোকেরা আমার সঙ্গে সেলফি তোলার অনুরোধ করে। এটা আমি খুব উপভোগ করছি।'

তিনি জানান, এ আসনে গত প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে 'বহিরাগত' প্রার্থীরা প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যা নিয়ে এলাকাবাসীর ক্ষোভ ছিল। তিনি বলেন, 'আমি এই এলাকার সন্তান। স্থানীয় হওয়ায় বাড়তি সুবিধা পাচ্ছি।'

মামুনুল জানান, প্রতিদ্বন্দ্বী ববি হাজ্জাজের সঙ্গে তার দূরত্ব নেই। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের দেখা হয়। এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাদক নির্মূলের পাশাপাশি 'কিশোর গ্যাং' সদস্যদের সংশোধনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

এদিকে ববি হাজ্জাজ জানান, নির্বাচন কমিশন আরপিও পরিবর্তন করায় কৌশলগত কারণে তাকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে 'ধানের শীষ' প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে হচ্ছে। নির্বাচনের পর আবার এনডিএমের পরিচয়ে রাজনীতিতে ফিরবেন। স্থানীয় বিএনপির সর্বোচ্চ সহযোগিতা এবং এলাকার মানুষের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

এ আসনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইউসুফ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ধানের শীষের প্রার্থী ববি হাজ্জাজকে আমরা দলের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছি। এ আসনে ধানের শীষের জয় হবে নিশ্চিত।'

প্রতিদ্বন্দ্বী মামুনুল হকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে 'গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধ' হিসেবে দেখছেন ববি হাজ্জাজ। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাংলাদেশে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে এবং এলাকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে ভোটারদের উচিত আমাকে ভোট দেওয়া।'

মোহাম্মদপুর এলাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে তিনি সন্ত্রাস, যানজট, ড্রেনেজ এবং গ্যাস-পানির সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, 'ইতোমধ্যে বেশ কিছু কাজ শুরু করেছি। নিরাপত্তার জন্য স্বেচ্ছাসেবী সেল গঠন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং এলাকাবাসীর জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ তৈরি করেছি।' এ ছাড়া যানজট নিরসনে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ট্রেনিং এবং খাল পরিষ্কার কর্মসূচি ও পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়েছেন বলে জানান ববি হাজ্জাজ।

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনা আছে দুই প্রার্থীরই। ববি হাজ্জাজ বলেন, 'ক্যাম্পের বাসিন্দাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের জন্য প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছি, যেন সরকারি সহযোগিতার বাইরেও বিকল্প উপায়ে সমাধান করা যায়।' ক্যাম্পের বাসিন্দাদের মানবেতর জীবনযাপন দূর করতে এবং তাদের নাগরিক মর্যাদা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে বিশেষ কার্যক্রম থাকবে বলে জানিয়েছেন মামুনুল।

এ আসনের মোট ভোটার ৪ লাখ ৮ হাজার ৭৯১ জন, যা আগের নির্বাচনের তুলনায় ১৩ হাজার ৩৫৫ বেশি। এবারের ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৯ হাজার ৮১২, নারী ১ লাখ ৯৮ হাজার ৯৭১ এবং হিজড়া ৮ জন।

ববি হাজ্জাজ ও মামুনুল ছাড়া অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—গণঅধিকার পরিষদের মিজানুর রহমান, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির মো. শাহাবুদ্দিন, বাসদের মো. খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের শাহরিয়ার ইফতেখার, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের ফাতেমা আক্তার মুনিয়া এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা ও শেখ মো. রবিউল ইসলাম।