চাঁদের ‘বুড়ি’ দেখতে গেলেন ৪ নভোচারী, সঙ্গে নিলেন কী

রবিউল কমল
রবিউল কমল

অ্যাপোলো মিশনের পর পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ ৫০ বছরের বেশি সময়। তারপর আর মানুষের চাঁদে যাওয়া হয়নি। অবশেষে চার নভোচারীকে নিয়ে নাসার মহাকাশযান আর্টেমিস-২ উড়াল দিয়েছে চাঁদের পথে। মহাকাশের ভয়ংকর ঝুঁকি মোকাবিলা করে তারা ঘুরবেন চাঁদের কক্ষপথে। তাদের এই সাহসী অভিযান পথ দেখাবে আগামী প্রজন্মকে।

আর্টেমিস-২ মহাকাশযানের চার নভোচারী কারা, কী নিয়ে গেলেন সঙ্গে করে?

রিড ওয়াইজম্যান
রিড ওয়াইজম্যান। নাসা

রিড ওয়াইজম্যান, কমান্ডার

রিড ওয়াইজম্যান মার্কিন নৌবাহিনীর টেস্ট পাইলট থেকে মহাকাশচারী হয়েছেন। ২০১৪ সালে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ছয় মাস ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। ছোটবেলা থেকেই উড়োজাহাজের প্রতি তার বিশেষ টান ছিল। তবে অবাক করা ব্যাপার হলো তার নাকি উচ্চতা ভীতি আছে, বিবিসির প্রতিবেদনে এমনটাই জানানো হয়েছে। তিনি আর্টেমিস-২ এর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন।

মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে জন্ম নেওয়া ওয়াইজম্যান ২০২০ সালে ক্যান্সারে তার স্ত্রীকে হারান। এরপর একাই দুই কন্যাকে বড় করছেন। তিনি বলেন, সিঙ্গেল অভিভাবক হওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, আবার সবচেয়ে আনন্দের।

তবে সন্তানদের তিনি ঝুঁকির মধ্যে রাখেননি। একদিন হাঁটতে হাঁটতে নিজের সন্তানদের বলেছিলেন, এখানে আমার উইল রাখা আছে, এখানে ট্রাস্টের কাগজপত্র আছে, আর আমার কিছু হলে তোমাদের কী হবে—সব এখানে লেখা আছে, এটাই আমাদের জীবনের অংশ।

তিনি মনে করেন, পরিবারের সবার সঙ্গে খুব খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। কারণ আগামীকাল কী হবে, তা আমরা কেউ জানি না।

তবে কমান্ডার হলেও এই অভিযানের কৃতিত্ব সবার বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ভিক্টর, ক্রিস্টিনা ও জেরেমি এই মিশনের অনুপ্রেরণা। তাদের সঙ্গে কাজ করা সত্যিই দারুণ অভিজ্ঞতা।

তিনি আশা করেন, বহু বছর পর এই অভিযানকে মানুষ চাঁদে বসবাস এবং একদিন মঙ্গল গ্রহে হাঁটার পথে ‘ছোট উদ্যোগ’ হিসেবে দেখবে।

বলা ভালো, নাসা মহাকাশচারীদের সঙ্গে কিছু ব্যক্তিগত জিনিস নেওয়ার অনুমতি দেয়। রিড ওয়াইজম্যান সঙ্গে নিয়েছেন একটি ছোট নোটবুক। এই নোটবুকে তিনি নিজের অনুভূতি লিখে রাখতে চান।

ক্রিস্টিনা কোচ
ক্রিস্টিনা কোচ। ছবি: নাসা

ক্রিস্টিনা কোচ, মিশন স্পেশালিস্ট

ক্রিস্টিনা কোচ একজন প্রকৌশলী ও পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ২০১৩ সালে নাসার মহাকাশচারী হন। ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে টানা ৩২৮ দিন অবস্থান করেছিলেন। এর মাধ্যমে একজন নারীর হিসেবে এককভাবে দীর্ঘ সময় মহাকাশযাত্রার রেকর্ড গড়েন।

ক্রিস্টিনা কোচ মিশিগানের গ্র্যান্ড র‌্যাপিডসে জন্ম নেন এবং নর্থ ক্যারোলিনায় বেড়ে ওঠেন। চন্দ্রাভিযানে যাওয়া প্রথম নারী অভিযাত্রী তিনি। তার মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন শুরু হয়েছিল একটি ছবির মাধ্যমে। ছোটবেলায় নিজের ঘরের দেওয়ালে বিখ্যাত ছবিটি টানিয়ে রাখতেন। অ্যাপোলো-৮ অভিযানের সময় এই ছবিটি তুলেছিলেন বিল অ্যান্ডার্স। যখন তিনি জানতে পারেন, ছবিটি কোনো স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা নয়, বরং একজন মানুষ তুলেছিলেন—তখনই তিনি মহাকাশচারী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন।

তিনি বলেন, ‘ক্যামেরার পেছনে একজন মানুষ ছিলেন, এটাই আমাকে পৃথিবীকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। চাঁদ কেবল একটি প্রতীক নয়, এটি বিজ্ঞান ও আমাদের উৎস বোঝার একটি আলোকবর্তিকা।’

কোচ প্রায় ২৫ বছর ধরে অ্যাপোলো মিশনের অভিজ্ঞ মহাকাশচারীদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

এই অভিযানে ব্যক্তিগত জিনিস হিসেবে তিনি সঙ্গে নিয়েছেন প্রিয়জনদের হাতে লেখা কিছু চিঠি। তিনি বলেন, চিঠিগুলোর মাধ্যমে মহাকাশযানে থেকেও আমি আপনজনদের হাতের ছোঁয়া পাব।

জেরেমি হ্যানসেন
জেরেমি হ্যানসেন। ছবি: নাসা

জেরেমি হ্যানসেন, মিশন স্পেশালিস্ট

জেরেমি হ্যানসেন রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক ফাইটার পাইলট ও পদার্থবিজ্ঞানী। তিনি ২০০৯ সালে কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সিতে যোগ দেন। তিনি আগে কখনো মহাকাশে যাননি। তবে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে নতুন মহাকাশচারীদের প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তিন এই কাজে নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম কানাডিয়ান।

জেরেমি হ্যানসেন তিন সন্তানের জনক। তার অবসর কাটে নৌযান চালিয়ে, রক ক্লাইম্বিং ও মাউন্টেন বাইকিং করে।

কোচের মতো হ্যানসেনের মহাকাশপ্রেম শুরু হয়েছিল অ্যাপোলো-৮ এর অনুপ্রেরণা থেকে। ছোটবেলায় গ্রামে থাকার সময় বাজ অলড্রিনের চাঁদে দাঁড়িয়ে থাকা ছবি দেখে কল্পনার মহাকাশযান বানিয়েছিলেন হ্যানসেন।

এই অভিযানের আগে বড়দিনের ছুটিতে তিনি পরিবারের সঙ্গে আর্টেমিস-১ উৎক্ষেপণের ভিডিও দেখেন, যেন তারা বুঝতে পারে রকেটের ইঞ্জিন জ্বলে ওঠার সময় বিস্ফোরণের মতো দেখালেও তা স্বাভাবিক।

মার্কিনিদের বাইরে চাঁদে যাওয়া প্রথম নভোচারী জেরেমি হ্যানসন। তিনি বলেন, ‘আর্টেমিস মিশন মানবজাতির জন্য বড় একটি লক্ষ্য ঠিক করেছে। এটা নিয়ে বিশ্বের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।’

ব্যক্তিগত জিনিস হিসেবে তিনি সঙ্গে নিয়েছেন তার স্ত্রী ও তিন সন্তানের জন্য চারটি চাঁদ–আকৃতির পেনডেন্ট। এতে লেখা ছিল ‘মুন অ্যান্ড ব্যাক’। এছাড়াও তিনি কানাডার জনপ্রিয় ম্যাপল সিরাপ ও ম্যাপল কুকিজ সঙ্গে নিয়েছেন।

ভিক্টর গ্লোভার
ভিক্টর গ্লোভার। ছবি: সংগৃহীত

ভিক্টর গ্লোভার, পাইলট

ভিক্টর গ্লোভার মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ফাইটার পাইলট ও টেস্ট পাইলট। তিনি ২০১৩ সালে নাসার মহাকাশচারী নির্বাচিত হন। তিনি স্পেসএক্স ক্রিউ-১ মিশনের পাইলট ছিলেন। গ্লোভার আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে একপেডিশন ৬৪-এর অংশ হিসেবে প্রায় ছয় মাস কাটিয়েছেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার পোমোনায় জন্ম নেওয়া গ্লোভার চার সন্তানের বাবা। এই অভিযানে অংশ নিয়ে তিনি হয়েছেন চাঁদে ভ্রমণকারী প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ। পরিচিতরা এই চারজনের মধ্যে তাকে সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক ও স্টাইলিশ মনে করেন।

আর্টেমিস-২ এর প্রস্তুতির জন্য গ্লোভার ১৯৬০ দশকের জেমিনি প্রোগ্রাম এবং অ্যাপোলো প্রোগ্রামের মূল জার্নাল ও গবেষণাপত্র নিয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি বলেন, এসব নথির গ্রাফ থেকে জানা যায়—মিশনের পেছনের মানুষদের গল্প, তাদের পরিবার কেমন সময় পার করছিল, এবং অজানার পথে তারা কী জানত আর কী জানত না।

ব্যক্তিগত জিনিস হিসেবে তিনি সঙ্গে নিচ্ছেন একটি বাইবেল, বিয়ের আংটি, পারিবারিক স্মারক।

সূত্র: স্পেস.কম, বিবিসি, এপি