চন্দ্রাভিযানের ১০ দিনে যা করবেন নভোচারীরা
অ্যাপোলো যুগের পর আবারও মানুষকে চাঁদের পথে পাঠিয়েছে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। আর সেই অভিযানেরই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ‘আর্টেমিস-২’।
প্রায় এক দশক ধরে প্রস্তুতির পর এই মিশনে চার নভোচারীকে নিয়ে মানবজাতি আবার গভীর মহাকাশে পা রাখছে, চাঁদের চারপাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফেরার এক ঐতিহাসিক যাত্রায়।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভবিষ্যতে চাঁদের মাটিতে মানুষের প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করবে এই অভিযান, যা নতুন মহাকাশ প্রতিযোগিতারও সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর্টেমিস-২ মিশন
রয়টার্স বলছে, মিশনটি প্রায় ১০ দিন স্থায়ী হওয়ার কথা। এই মিশনে চার নভোচারীকে উচ্চগতিতে চাঁদের চারপাশে ঘুরিয়ে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হবে, যা অ্যাপোলো যুগের পর প্রথম মানববাহী চন্দ্রাভিযান।
এই মিশনের চার নভোচারী হলেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার ও ক্রিস্টিনা কোচ এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।
আর্টেমিস-২ মূলত ভবিষ্যৎ মিশনের পথ প্রস্তুত করার জন্য পরিকল্পিত, যার লক্ষ্য এই দশকের শেষ নাগাদ আবার নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামানো।
নিচে মিশনটির দিনভিত্তিক ধাপগুলো তুলে ধরা হলো—
উৎক্ষেপণের দিন
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নাসার এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের মাধ্যমে আর্টেমিস-২ উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পর ওরিয়ন ক্রু ক্যাপসুলটি রকেটের উপরের ধাপ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর চারপাশে একটি উচ্চ উপবৃত্তাকার কক্ষপথে প্রবেশ করবে।
দিন ১–২: পৃথিবীর কক্ষপথে পরীক্ষা
প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। এর মধ্যে থাকবে ওরিয়নের জীবনরক্ষা ব্যবস্থা, প্রপালশন, নেভিগেশন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার পরীক্ষা, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে মহাকাশযানটি গভীর মহাকাশে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।
ট্রান্সলুনার ইনজেকশন
সব পরীক্ষা শেষ হলে ওরিয়নের প্রপালশন সিস্টেম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঞ্জিন বার্ন সম্পন্ন করবে, যাকে ‘ট্রান্সলুনার ইনজেকশন’ বলা হয়। এর মাধ্যমে মহাকাশযানটি পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে যাত্রাপথে প্রবেশ করবে।
দিন ৩–৪: চাঁদের পথে যাত্রা
চাঁদের দিকে কয়েক দিনের এই যাত্রার সময় নভোচারীরা মহাকাশযানের বিভিন্ন সিস্টেম পর্যবেক্ষণ করতে থাকবেন। এটি হবে এমন একটি মানববাহী মহাকাশযাত্রা, যা পৃথিবী থেকে পূর্বের যেকোনো অভিযানের তুলনায় আরও দূরে যাবে। মিশন নিয়ন্ত্রণ দল যোগাযোগ ও নেভিগেশন পর্যবেক্ষণ করবে।
চাঁদের পাশ দিয়ে অতিক্রম
ওরিয়ন একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ পথে চাঁদের পেছন দিয়ে অতিক্রম করবে। এটি এমন একটি কক্ষপথ, যা অতিরিক্ত প্রপালশন ছাড়াই মহাকাশযানটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে আনবে। এই পর্যায়ে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে সর্বোচ্চ দূরত্বে পৌঁছাবে।
দিন ৫–৮: পৃথিবীতে ফেরা
চাঁদের পাশ দিয়ে ঘুরে আসার পর নভোচারীরা কয়েক দিন ধরে পৃথিবীতে ফেরার পথে থাকবে। এসময় তারা গভীর মহাকাশে বিভিন্ন অতিরিক্ত পরীক্ষা চালাবে, যেমন: শক্তি ব্যবস্থা, তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে ক্রু পরিচালনা।
পুনঃপ্রবেশ ও সাগরে অবতরণ
পৃথিবীর কাছে পৌঁছালে ওরিয়ন কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ আলাদা করবে এবং প্রায় ২৫ হাজার মাইল (৪০ হাজার ২৩৩ কিমি) গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে। এই উচ্চগতির পুনঃপ্রবেশের সময় ক্যাপসুলের তাপরোধী ঢালের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা মিশনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এরপর মহাকাশযানটি প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে, যেখানে উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের উদ্ধার করবে।
সব মিলিয়ে, আর্টেমিস-২ কেবল একটি মহাকাশযাত্রা নয়, এটি মানবজাতির নতুন করে চাঁদে ফেরার প্রস্তুতির এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। নাসার এই মিশন সফল হলে ভবিষ্যতে চাঁদের মাটিতে মানুষ নামানোর পথ আরও সুগম হবে, পাশাপাশি গভীর মহাকাশে দীর্ঘমেয়াদি মানব অভিযানের সম্ভাবনাও নতুনভাবে উন্মোচিত হবে।
প্রযুক্তি, সাহস আর অনুসন্ধানের এই সম্মিলনই হয়তো মানব সভ্যতাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে মহাবিশ্বের অজানা দিগন্তের দিকে।

