ব্লেসিং মুজারাবানি: জিম্বাবুয়ের দীর্ঘদেহী ‘এক্স-ফ্যাক্টর’

স্পোর্টস ডেস্ক

মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জিম্বাবুয়ের ম্যাচের ঠিক আগে সব আলো কেড়ে নিচ্ছেন একজন দীর্ঘদেহী ফাস্ট বোলার। কারণ, ক্রিকেটের বড় মঞ্চে তার প্রতাপ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

৬ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার ব্লেসিং মুজারাবানিকে মাঠে আলাদা করে চিনে নিতে কষ্ট হয় না। তবে এবারের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কেবল দীর্ঘদেহী হওয়ার কারণেই তিনি আলোচনায়, এমনটা নয়। বরং যে নিয়ন্ত্রণ, বুদ্ধিমত্তা আর ক্ষুধা নিয়ে তিনি বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন, তা নজর কেড়েছে সবার।

গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে (বাকিটি ভেসে যায় বৃষ্টিতে) মাত্র ৫.৯১ ইকোনমি রেটে ৯ উইকেট নিয়েছেন মুজারাবানি। চলমান আসরে জিম্বাবুয়ের অবিশ্বাস্য জয়যাত্রার মূলে আছেন তিনি। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাদের জয় মোটেও কাকতালীয় ছিল না, বরং ছিল বিশ্ব ক্রিকেটে নিজেদের সামর্থ্যের জানান দেওয়া।

বিশেষ করে, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ে অসাধারণ নৈপুণ্য উপহার দেন মুজারাবানি। ১৭ রানের বিনিময়ে আদায় করেন ৪ উইকেট। সেদিন নিয়ন্ত্রিত ব্যাক-অফ-এ-লেংথ ডেলিভারিতে অজি ব্যাটারদের বারবার ভুল শট খেলতে বাধ্য করেন তিনি।

মোহাম্মদ কাইফ মনে করেন, এমন ফর্মের কারণে ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট আইপিএলে চড়া মূল্যে দল পেতে পারতেন মুজারাবানি। নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ভারতের সাবেক ব্যাটার বলেন, 'মুজারাবানি একজন অসাধারণ বোলার। সে ম্যাচের প্রতিটি ধাপে, নতুন ও পুরোনো উভয় বলেই দারুণ বোলিং করে। যদি এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর আইপিএলের নিলাম হতো... তাহলে সে এখন যেভাবে বোলিং করছে, তাতে নিশ্চিতভাবেই অন্তত ২০ কোটি রুপি দাম পেত।'

কাইফের দাবি সাহসী হলেও অযৌক্তিক নয়। আইপিএল বরাবরই উচ্চতা, গতি আর বৈচিত্র্যকে প্রাধান্য দেয়— যার প্রতিটিই মুজারাবানির মধ্যে ভরপুর। সুপার এইটের লড়াইয়ের আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোচ ড্যারেন স্যামিও বেশ সতর্ক আছেন। তিনি বলেন, 'শুধু মুজারাবানিকে নিয়ে নয়, আমরা প্রতিটি খেলোয়াড়কে নিয়েই পরিকল্পনা করি। তবে সে একজন এক্স-ফ্যাক্টর। প্রতিপক্ষকে আপনার সম্মান করতেই হবে।'

এই সম্মান ২৯ বছর বয়সী মুজারাবানি অর্জন করে নিয়েছেন। হারারের ঘনবসতিপূর্ণ হাইফিল্ডস উপশহর থেকে বিশ্বমঞ্চে উঠে আসার এই যাত্রা ছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে অদম্য সংগ্রামের গল্প। দাদির কাছে বড় হওয়ায় তার শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনে। ক্রিকেটে হাতেখড়ির সময় তার সম্বল ছিল কেবল একজোড়া বুট ও পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন। কোচদের স্মৃতিতে তিনি ভাসেন একজন লাজুক ও বিনয়ী কিশোর হিসেবে, যার কঠোর পরিশ্রম ছিল মুখের কথার চেয়েও বেশি জোরালো।

২০১৭ সালে জিম্বাবুয়ের সাবেক অধিনায়ক টাটেন্ডা টাইবুর অধীনে রাইজিং স্টার্স অ্যাকাডেমির হয়ে ইংল্যান্ড সফরে তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরে। কাউন্টি ক্লাব সারের কোচ অ্যালেক স্টুয়ার্ট তার প্রতি আগ্রহ দেখান। তবে শেষ পর্যন্ত নর্দাম্পটনশায়ারের সঙ্গে কোলপ্যাক চুক্তিতে সই করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সাময়িক বিরতি দিয়ে মুজারাবানি ইংলিশ ঘরোয়া ক্রিকেটে মনোযোগী হন। সেখানকার পেসবান্ধব কন্ডিশনে নিজের বোলিংকে আরও ধারালো করে তোলেন তিনি।

ইংল্যান্ডে মুজারাবানি শেখেন কীভাবে উচ্চতাকে কেবল বাউন্স দেওয়ার জন্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। ২০২০ সালে ব্রেক্সিটের কারণে কোলপ্যাক চুক্তি (এই চুক্তির আওতায় খেলোয়াড়রা স্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হতেন, তবে এর বিনিময়ে তাদেরকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়াতে হতো) শেষ হলে তিনি একজন পরিণত বোলার হিসেবে দেশে ফেরেন।

দ্বিতীয় দফায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফিরে আসা মুজারাবানির জন্য ছিল রাজকীয়। ২০২০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ক্যারিয়ারের প্রথম ৫ উইকেট শিকারের মধুর স্বাদ পান তিনি। এরপর একে একে ডাক পান বিশ্বের জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে।

তবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে চলমান এবারের বিশ্বকাপ মুজারাবানিকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই মৌসুমে অন্তত ৫০ ওভার বল করেছেন এমন পেসারদের মধ্যে টি-টোয়েন্টিতে তার ইকোনমি রেট অন্যতম সেরা। তার বোলিং কৌশল নাটকীয় নয়, বরং সুশৃঙ্খল। তিনি নিখুঁত লেংথ ও খাড়া বাউন্স দিয়ে ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলেন। আর সতীর্থদের চোখে, মুজারাবানি বেশ বিনয়ী এবং প্রশংসা অর্জনের চেয়ে প্রস্তুতির দিকেই তার বেশি নজর থাকে।

সোমবার রাতে ওয়াংখেড়ের ফ্লাডলাইটের নিচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ মুজারাবানিকে অকার্যকর করার চেষ্টা করবে। কিন্তু গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো যদি কোনো বার্তা দিয়ে থাকে, তবে তা হলো— তিনি যখন নিজের ছন্দে থাকেন, জিম্বাবুয়েও তখন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।