ব্রাজিলে ফুটবল কেন খেলার চেয়েও বেশি কিছু
পৃথিবীতে এমন দেশ খুব বেশি নেই যেখানে জাতীয় দল মাঠে নামলেই সরকার ছুটি ঘোষণা করে দেয়, কিংবা যে দেশের গণমাধ্যমে মানুষের চাঁদে অবতরণের খবরের চেয়ে কোনো ফুটবলারের হাজারতম গোলের খবরকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রথম পাতায় ছাপা হয়।
দেশটির ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংগীত, শিল্প—সবকিছুর সঙ্গে ফুটবল যেন এমনভাবে মিশে গেছে যে এই খেলা ছাড়া সে দেশের কোনো কিছু কল্পনা করাই কঠিন। ফুটবল নিয়ে ব্রাজিলের সংস্কৃতি ঠিক এমনই।
দেশটিতে ফুটবল শুধু ৯০ মিনিটের ম্যাচ নয়, একটি সামাজিক পরিচয়, গভীর এক অনুভূতি। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলে ফুটবল মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ১৮৯০ সালের দিকে ব্রাজিলের সঙ্গে পরিচয় হয় ফুটবলের। সাও পাওলো শহরে বেড়ে ওঠা স্কটিশ অভিবাসীর সন্তান চার্লস মিলারের হাত ধরে আসা ফুটবল শুরুতে ছিল উচ্চবিত্ত বা অভিজাতদের খেলা। কিন্তু খুব দ্রুতই ফুটবল সেখানে সাধারণ মানুষের খেলায় রূপান্তরিত হয়। ব্রাজিলের বিভিন্ন সৈকতে, রাস্তায়, কিংবা মহল্লার ঘিঞ্জি উঠান থেকে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হতে থাকে ফুটবল।
ইউরোপ থেকে আসা ফুটবল ব্রাজিলে যেন নতুন করে বিকশিত হলো। খেলায় টিকে থাকতে হলে সাধারণত দক্ষতার পাশাপাশি নিজস্ব একটা ‘স্টাইল’ বা শৈলী থাকতে হয়। আর ব্রাজিলে ‘স্টাইল’ মানে এমন কিছু যা সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না এমন এক বিশুদ্ধ শৈল্পিক সৌন্দর্য।
ব্রাজিলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৃবিজ্ঞানী রবার্তো ডি মাত্তা ফুটবলের ওপর কয়েক দশক ধরে গবেষণা করেছেন। তার মতে, ফুটবল মাঠ হলো ব্রাজিলের এমন একটি স্থান, যেখানে সমাজের উঁচু-নিচু ভেদাভেদ হারিয়ে যায়। আর আয়তাকার মাঠের ভেতরে গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা বা দক্ষতা, কারও পারিবারিক পদবী বা বংশমর্যাদা নয়।
তিনি আরও বলেছেন, ‘ব্রাজিলকে বুঝতে হলে ফুটবলকে বুঝতে হবে। ফুটবলেই ব্রাজিলের বৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা ও জাতীয় চরিত্র সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়।’
জোগা বনিতো: ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবল
ফুটবল খেলাকে ব্রাজিলের জাতীয় ভাষা পর্তুগিজে ডাকা হয় ‘জোগা বোনিতো’ নামে, যার অর্থ ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ বা ‘নান্দনিক খেলা’। ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে এই নামটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।
১৯৫০ এর দশকে আনন্দের সঙ্গে ফুটবল খেলার এক নতুন শৈলী সামনে নিয়ে আসে ব্রাজিল, যা পরবর্তীতে বিশ্বের অন্যতম সফল ফুটবল ‘দর্শনে’ পরিণত হয়। এই ‘জোগা বোনিতো’ দর্শন মূলত খেলার সৌন্দর্য, খেলোয়াড়ের নিজস্ব স্টাইল ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দেয়। এই দর্শনের একজন ফুটবলার শুধু বল নিয়ন্ত্রণে দক্ষই হন না, বরং প্রতিপক্ষকে একা পরাস্ত করার ক্ষেত্রেও দুর্দান্ত সাহসী হন।
প্রকৃতপক্ষে ‘জোগা বোনিতো’ কোনো সুনির্দিষ্ট ছক বা কৌশল নয়, বরং এটি একটি মানসিকতা। এই দর্শনে গোল করার চেয়েও সুন্দর ও শৈল্পিক উপায়ে খেলার ওপর জোর দেওয়া হয়।
১৯৫৮ সালে ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় ও কোচ—দুই ভূমিকাতে থেকে বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েন মারিও জাগালো। ‘জোগা বোনিতো’ দর্শনের সফল ব্যবহারের মাধ্যমেই তিনি এটি অর্জন করেছেন বলে মনে করা হয়।
ব্রাজিল দলের খেলোয়াড় হিসেবে তিনি দুটি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন। পরে যখন তিনি কোচের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি ব্রাজিলের খেলার ধরনে পরিবর্তন নিয়ে আসেন। তার কৌশল ছিল উপভোগ্য খেলার শৈলীর সঙ্গে পুরো মাঠজুড়ে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স ইউনিভার্সিটির ব্রাজিলিয়ান স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ইসাডোরা গ্রেভানের মতে, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বুঝতে হলে আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতি জানা অত্যন্ত জরুরি। দাস হিসেবে ব্রাজিলে যাওয়া আফ্রিকানদের হাত ধরে ‘ক্যান্ডম্বলে’ ও ‘উম্বান্দা’র মতো ধর্মীয় ঐতিহ্য ব্রাজিলে ‘সাম্বা’ গান-নৃত্য ও মার্শাল আর্ট ‘ক্যাপোইরা’কে রূপ দিয়েছে। আর এই সবকিছুই ব্রাজিলের খেলার বিশেষ শৈলী ‘জিংগা’কে প্রভাবিত করেছে। এই কৌশল হলো স্থির না থাকার একটি ‘শিল্প’।
খেলোয়াড়রা সাবলীলভাবে শরীর দুলিয়ে দিক পরিবর্তন করে আক্রমণ এড়ান এবং নিজেদের গতিবিধি যেন প্রতিপক্ষ বুঝতে না পারে সেজন্য সবসময় নড়াচড়ার মধ্যে থাকেন।
অধ্যাপক গ্রেভান ‘সকার, সাম্বা অ্যান্ড স্পিরিচুয়ালিজম: পারফর্মিং ব্রাজিল’ নামের একটি কোর্স পড়ান। এই কোর্সে ব্রাজিলের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে ফুটবলের ভূমিকা নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়।
এই গবেষকের মতে, ফুটবল ব্রাজিলে এক ধরনের সামাজিক ‘দৃশ্যকাব্য’, যার মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ানরা তাদের জাতি, শ্রেণি ও আত্মপরিচয়ের বিষয়গুলো নিয়ে বোঝাপড়া করে নিতে পারে।
আর এ কারণেই ব্রাজিলের জনগণ প্রাণের জাতীয় ফুটবল দলকে ভালোবেসে ‘সেলেসাও’ বলে ডাকে। দলের সঙ্গে দেশের মানুষের সম্পর্কটা মোটেও অন্য সব দেশের মতো সাধারণ কোনো সম্পর্কের মতো নয়। প্রকৃতপক্ষে, দেশটির জনগণের আনন্দ, সংগ্রাম ও জাতীয় গৌরবের গল্পগুলোকে এক সুতোয় বুনে চলে ‘সেলেসাও’।
ফুটবলের রাজনৈতিক গুরুত্ব
‘ফুটবল নেশন: দ্য স্টোরি অব ব্রাজিল থ্রু সকার’ বইয়ের লেখক ডেভিড গোল্ডব্ল্যাটের মতে, ১৮২২ সালে স্বাধীন হওয়ার পর ব্রাজিলের জাতীয় পরিচয় বা সত্তা গঠনে ফুটবল শক্তিশালী ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৩০ এর দশকে সাম্বা ও ফুটবলকে ব্রাজিলের জাতীয় প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গেটুলিও বার্গাস। এর মাধ্যমে তিনি ব্রাজিলের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
ব্রিটিশ লেখক গোল্ডব্ল্যাট সিএনএনকে বলেন, ‘১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান অর্জনের পর ব্রাজিল আন্তর্জাতিক মহলে বিশাল স্বীকৃতি পায়। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর জন্য ফুটবল হয়ে গেল সীমানা ভেঙে বের হওয়ার একটি মাধ্যম। আর সে সময় থেকেই ফুটবল ব্রাজিলের জনজীবনের অংশ হয়ে যায় যেখানে পুরো জাতি এক প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়ায়।’
ব্রাজিলের ইতিহাসে রাজনৈতিক স্বার্থে ফুটবলের ব্যবহার বারবার দেখা গেছে। ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়কে দেশটির তৎকালীন কর্তৃত্ববাদী শাসকগোষ্ঠী জাতীয়তাবাদের পক্ষে ব্যবহার করেছিল। তবে ফুটবলের রাজনৈতিক দখলদারি কখনোই পুরোপুরি সফল হয়নি।
ব্রাজিলের সাবেক অধিনায়ক সক্রেটিস শুধু ফুটবলার ছিলেন না, ছিলেন রাজনৈতিক কর্মীও। ১৯৮০’র দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তিনি ফুটবলকে গণতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
তার বিশ্বাস ছিল, ফুটবল শুধু বিনোদন নয় বরং এটি মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও সামাজিক পরিবর্তনেরও মাধ্যম। দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘ফুটবল সমাজকে পরিবর্তন করতে সক্ষম।’
‘আমারেলিনহা’ নামে পরিচিত ব্রাজিলিয়ান জাতীয় ফুটবলের জার্সি দেশটির জাতীয় গর্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনে এই জার্সি গায়ে দিয়ে আন্দোলনের ইতিহাস আছে।
২০১৫ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের অভিশংসনের দাবিতে এই জার্সি পরে বিক্ষোভ হয়। পরে তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়। এরপর ২০১৮ সালে দেশটির রাস্তায় আবারও এই জার্সি দেখা যায়। তবে সেবার জার্সি গায়ে দিয়েছিল তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বলসোনারোর সমর্থক গোষ্ঠী।
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দেশটির রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় এক বিক্ষোভের সময় ডানপন্থি বিক্ষোভকারীরা এই জার্সিকে তাদের নিজস্ব আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। এ ঘটনাটি দেশটিতে বিতর্কের জন্ম দেয়। কিন্তু জবাবে অনেক ব্রাজিলিয়ান এই জার্সিকে ঐক্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রতীক দাবি করে মাঠে নামেন এবং ব্রাজিলের জাতীয় পরিচয় গঠনে ফুটবলের ঐতিহাসিক ভূমিকার নিয়ে কথা বলেন।
ব্রাজিলের কিংবদন্তিরা
বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিলের আধিপত্যের পেছনে রয়েছেন এমন কয়েকজন কিংবদন্তি, যারা ফুটবলের ব্যাকরণ ভেঙে মাঠকে বানিয়েছিলেন ক্যানভাস। পায়ের জাদুতে তারা শুধু ব্রাজিলকে পাঁচবার বিশ্বসেরা করেননি, বরং ফুটবল বিশ্বকে উপহার দিয়েছেন নান্দনিক ফুটবলের চিরন্তন স্বাদ।
ব্রাজিলের সর্বকালের দুই সেরা ফুটবল আইকন গ্যারিঞ্চা ও পেলে। এক পা ছোট থাকায় ভিন্ন ধরনের ড্রিবলিং করে সবার প্রিয় হয়েছিলেন গারিঞ্চা। ‘ফুটবলের রাজা’ নামে পরিচিত পেলে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হিসেবে অনন্য কীর্তি গড়েছেন।
সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও সাহিত্য সমালোচক হোসে মিগুয়েল উইজনিক বলেছেন, ‘পেলের ভেতরে নিখুঁত-নির্ভুলতার সঙ্গে সৃজনশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল। বিপুল খ্যাতি সত্ত্বেও পেলে অরাজনৈতিক ভাবমূর্তি বজায় রেখেছিলেন। পাবলিক ইমেজ ও ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতাই তাকে এমন শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক হিসেবে তৈরি করেছে।’
জিকোকে অনেকেই বলেন ‘বিশ্বকাপ না জেতা সর্বকালের সেরা ফুটবলার’। আশির দশকের ব্রাজিল দলের প্রাণভোমরা জিকো বিখ্যাত ছিলেন নিখুঁত বল পাসিং ও ফ্রি-কিক থেকে জাদুকরী গোলের জন্য। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে জিকোর নেতৃত্বাধীন ব্রাজিল দলটি চ্যাম্পিয়ন হলতে না পারলেও দলটির নান্দনিক ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের সমন্বয় আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক সেরা উদাহরণ।
রোনালদো ‘দ্য ফেনোমেনন’ ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের সদস্য হলেও ২০০২ সালের বিশ্বকাপে তিনি ছিলেন ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের প্রধান কারিগর। ওই টুর্নামেন্টে ৮টি গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জেতেন, যার মধ্যে ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে করা দুটি ঐতিহাসিক গোলও ছিল।
আরেক কিংবদন্তি রোনালদিনহো যখন মাঠে খেলতেন, তখন মনে হতো ফুটবলের চেয়ে সহজ ও আনন্দের বিষয় আর কিছু হতে পারে না। মুখে চওড়া হাসি আর পায়ের অবিশ্বাস্য দক্ষতা দিয়ে ফুটবলকে খেলা থেকে জাদুতে রূপান্তর করেছিলেন।
ফুটবল ও ব্রাজিলের অর্থনীতি
ব্রাজিলের আর্থিক খাতেও ফুটবলের বড় অবদান রয়েছে। দেশটির লাখ লাখ মানুষ ফুটবল ক্লাব, স্টেডিয়াম, সম্প্রচার, পর্যটন ও ক্রীড়া সামগ্রী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ফ্ল্যামেঙ্গো, পালমেইরাস, করিন্থিয়ান্স কিংবা সাও পাওলোর মতো ক্লাবগুলো বছরে শতশত মিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
এবারের বিশ্বকাপ চলাকালে শুধু ব্রাজিলের ম্যাচগুলোর সময়ে রিও ডি জেনিরোর অর্থনীতিতে ২৪ কোটি ৪৯ লাখ ব্রাজিলিয়ান রিয়াল বা ৪ কোটি ৮৩ লাখ মার্কিন ডলার যোগ হতে পারে বলে রিও ডি জেনিরো সিটির মিউনিসিপ্যাল সেক্রেটারিয়েট অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের এক গবেষণায় উঠে এসেছে। ২০২২ সালে ব্রাজিলের জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ (১ হাজার ৭৫ কোটি ডলার) এসেছিল ফুটবল থেকে।
বিশ্ব ফুটবলের অসংখ্য প্রতিভাবান খেলোয়াড় এসেছে ২১ কোটির বেশি জনসংখ্যার দেশ ব্রাজিল থেকে। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ক্লাব ফুটবল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক দলবদলের তালিকায় ছিলেন ১৭৯ দেশের ১৫ হাজার ৬১৭ ফুটবলার। তাদের মধ্যে ব্রাজিলের ছিলেন ১ হাজার ৭৪৯ জন, যা মোট দলবদলের ১১ দশমিক ২ শতাংশ। দলবদল থেকে ব্রাজিলের আয় ছিল ২৯ কোটি ৩২ লাখ মার্কিন ডলার।
পেলে, রোমারিও, রোনালদো, রোনালদিনহো, নেইমারের মতো ব্রাজিলের অসংখ্য কিংবদন্তি ফুটবলার দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। ফুটবল তাই অনেক ব্রাজিলিয়ানের কাছে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি এবং সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের অন্যতম বড় সুযোগ।
ব্রাজিলের আত্মা ফুটবল
২০১৪ সালে ফিফা ডটকমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেলে বলেছিলেন, ফুটবল এমন একটি ভাষা, যা জাতি, ধর্ম ও ভাষার সীমা অতিক্রম করে সব মানুষকে একত্র করতে পারে। আর ব্রাজিলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়।
রাটগার্স অধ্যাপক ইসাডোরা গ্রেভান বলেন, ‘ব্রাজিলে ফুটবল দৈনন্দিন জীবনের পাশাপাশি জাতীয় মনস্তত্ত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। সেখানকার ভক্তরা আরও বেশি আবেগপ্রবণ।’
তিনি বলেন, ‘ব্রাজিল দল যখন মাঠে নামে, তখন ব্রাজিলে অবস্থান করার মতো রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা আর কিছু হতে পারে না।’
তখন ব্রাজিলের অফিস-দোকান সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কোনো কাজ করে না। রাস্তাঘাট সবুজ-হলুদ রঙে সজ্জিত থাকে। ব্রাজিল জিতলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আর পরাজয় মানেই চোখে জল আর বিষণ্নতা।
ব্রাজিলে ফুটবলের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সংযোগ গভীর বলেও মনে করেন এই গবেষক। তিনি বলেন, ‘খেলা চলাকালে ভক্তদের প্রার্থনা করাটা খুব সাধারণ বিষয়। কিন্তু এটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে, মানুষ তাদের দলের জয়ের জন্য মোমবাতি জ্বালায়, নানা ধরনের মন্ত্র জপ ও প্রার্থনা করে।’
ব্রাজিলিয়ান সমাজবিজ্ঞানী গিলবার্তো ফ্রেয়ার ফুটবলকে তার দেশের ‘অবিচ্ছেদ্য অংশ’ হিসেবে দেখেছিলেন।
ব্রাজিলিয়ান নাট্যকার ও সাংবাদিক নেলসন রদ্রিগেজ বলেন, ‘আমরা যখন ১৯৫৮ সালে বিশ্বকাপ জিতলাম, তখন ৪৫৮ বছর পর আমরা প্রথমবারের মতো সোজা হয়ে দাঁড়াতে পেরেছি। অর্থাৎ, যখন “সেলেসাও” নিয়ে কথা আসে, তখন শুধু ফুটবল নিয়ে কথা হয় না, এটি আমাদের জাতীয় পরিচয়কে সামনে নিয়ে আসে।’
১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে পরাজয় কিংবা ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারের ক্ষত ব্রাজিলের জাতীয় ট্র্যাজেডি। ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক নেলসন রদ্রিগেজ এই পরাজয়কে ‘ব্রাজিলের আত্মপরিচয় ও আত্মমর্যাদার’ সংগ্রামের প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন।
সাও পাওলোর প্রভাবশালী দৈনিক এস্তাদো দে সাও পাওলোর সাংবাদিক জেমিল শ্যাড সিএনএনকে বলেন, ‘আপনি যখন ব্রাজিলে জন্মাচ্ছেন, তখন থেকেই ফুটবল আপনার জীবনের অংশ হয়ে যাচ্ছে। আর অনেকের ক্ষেত্রে, মৃত্যুর পর অনেকের কফিন ঢেকে দেওয়া হয় প্রিয় দলের পতাকা দিয়ে...অর্থাৎ ফুটবল এখানে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পুরো জীবনের অংশ।’
লেখক ডেভিড গোল্ডব্ল্যাটের মতে, ‘ফুটবল এখানে (ব্রাজিলে) জাতীয় আচার, গণমানুষের থিয়েটার ও একটি সম্মিলিত ধারাবাহিক নাটকের অংশ, যার গল্প বহুমুখী ও বহুমাত্রিক।’
‘যখন অনেক আগে বুদ্ধিজীবীরা প্রশ্ন তুলেছিলেন যে “ব্রাজিল আসলে কী?”, তখন বলা হতো এটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি দেশ—যা হয়তো রিও-ডি-জেনিরোর ক্ষেত্রে মিলেছিল। কিন্তু যে দেশে ৬০ শতাংশ আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান মানুষ রয়েছে, সেখানে এই ধারণা কখনোই যথেষ্ট ছিল না। পুরো জাতিকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন ছিল, যা পুরো ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং একইসঙ্গে দেশটির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠবে,’ যুক্তি দিয়েছিলেন গোল্ডব্ল্যাট।
সাও পাওলোর বাসিন্দা শ্যাড এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘ফুটবল হলো এমন কয়েকটি উপাদানের একটি, যা ব্রাজিলের সব মানুষের অনুভূতিকে এক সুতোয় মেলাতে পারে। আমাজনের জঙ্গলে বসবাসকারী একজন মানুষের সঙ্গে সাও পাওলোর বাসিন্দার মিল খুঁজে পাওয়ার মতো উপাদান খুব কমই আছে। পুরো সমাজকে একসঙ্গে ধরে রাখার মতো আঠা খুব বেশি নেই। আর এই কারণেই “সেলেসাও” যখন হেরে যায়, তখন তা এত বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ পরাজয় শুধু ফুটবল দলের হার নয়, বরং একজন ব্রাজিলিয়ান হিসেবে নিজের অস্তিত্ব ও পরিচয়ই তখন প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়।’