বিশ্বকাপের প্রথম ২৪ ঘণ্টা

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

ভোরের আলো ফোটার আগেই মেক্সিকো সিটির রাস্তায় বেরিয়েছিল দুটো মিছিল। একটি আনন্দের, আরেকটি ক্রোধের। দুটোর হাতেই ছিল ব্যানার। একটিতে লেখা দলের নাম, অন্যটিতে লেখা নিখোঁজ সন্তানের ছবি। ফুটবল বিশ্বকাপ এভাবেও শুরু হয়। মাঠের চেয়ে বড় একটি আয়না নিয়ে।

মেক্সিকো সিটি আগের দিন সরকারি ছুটির দিন ছিল। স্কুল বন্ধ, অফিস বন্ধ, যেন পুরো শহরটাকে আস্তে আস্তে একটাই ঘটনার দিকে টেনে নেওয়া হচ্ছে। অ্যাজতেকার দিকে। কিন্তু আভেনিদা রেফর্মায় সেই সকালে অন্য দৃশ্য। বিশ্বকাপের জন্য বসানো এক বিশাল ফুটবলারের ভাস্কর্যের গায়ে লেখা, 'সমাধান না হলে বল গড়াবে না।' শিক্ষকরা লিখেছেন।

এই শিক্ষকরা সিএনটিই'র, মেক্সিকোর র‍্যাডিক্যাল শিক্ষক ইউনিয়নের সদস্য, যারা কয়েকদিন আগেই এই একই রাস্তায় বিভিন্ন ফুটবলারের ভাস্কর্য মাটিতে ফেলে দিয়েছে। দাবি একটাই, দশকের পুরনো পেনশন সংস্কার বাতিল করো। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বিচারকরা, মানবাধিকার কর্মীরা, পশু-অধিকার কর্মীরা, আর সেই মানুষগুলো, যাদের ছেলে বা মেয়ে একদিন হেঁটে বেরিয়েছিল, আর ফেরেনি। মেক্সিকোর দেড় লাখ নিখোঁজের পরিবার।

ফুটবল তাদের থামাতে পারেনি। বরং এই উৎসব তাদের একটা মঞ্চ দিয়েছে। পৃথিবীর ক্যামেরা আজ এই শহরের দিকে, সেই সুযোগ তারা ছাড়বেন কেন?

কিন্তু এই দেড় লাখ মানুষ কোথায় গেল? উত্তরটা একটাই। কার্টেল। ২০০৬ সালে মেক্সিকো সরকার ড্রাগ কার্টেলের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর থেকে নিখোঁজের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়তে থাকে, গত দশ বছরে বেড়েছে ২০০ শতাংশ। কার্টেলগুলো মানুষ অপহরণ করে ভয় দেখিয়ে এলাকা দখল করে, হত্যার পর মৃতদেহ গোপন কবরে পুঁতে রাখে বা অ্যাসিডে গলিয়ে ফেলে, যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে। কেউ কেউ নিখোঁজ হন মানব পাচারে, কেউ অঙ্গ পাচারে। এই মানুষগুলোর পরিবার বছরের পর বছর মাটি খুঁড়ে খোঁজে, রাষ্ট্র নীরব থাকে। বিশ্বকাপের উৎসবের দিন তাই তাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, এটি একটি সুযোগ, পৃথিবীকে শোনানোর।

উদ্বোধনের দিন সকালেও তাই এই মিছিল স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে, পুলিশ রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি শেইনবাউম, যিনি নির্বাচনে শিক্ষকদের এই সমস্যা সহ অন্যান্য অনেক সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, দেড় বছর পরেও সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি।

অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামটির বয়স অনেক। ১৯৭০-এ পেলে এখানে খেলেছেন। ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা। এখন ২০২৬। পৃথিবীর একমাত্র স্টেডিয়াম যেটি তিনটি আলাদা বিশ্বকাপে ম্যাচ আয়োজন করল। স্টেডিয়ামটি আর শুধু একটি মাঠ নয়, এটি একটি জীবন্ত সংগ্রহশালা।

মঞ্চে তখন শাকিরা। কলম্বিয়ার মেয়ে, যিনি একসময় লাতিন আমেরিকার কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন, আজ গাইছেন পৃথিবীর জন্য। নাইজেরিয়ার বার্না বয়ের সাথে মিলে উঠল সেই গান, 'দাই দাই'। ইতালীয় ভাষায় মানে, 'এসো, এগিয়ে যাও।' গানটা কার জন্য? মেক্সিকোর জন্য? না, পৃথিবীর জন্য।

ম্যাচ শুরু হলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল মাঠের বাইরের বিতর্ক বাইরেই রেখে এসেছে তারা। তারা কেবল জিততে আসেনি, এসেছে মুগ্ধ করতে। ইসরায়েল রেয়েস ক্রস, রাউল হিমেনেসের হেড, দক্ষিণ আফ্রিকার গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস অবিশ্বাস্য একটা ডাইভে রক্ষা। কিন্তু রুখে দেওয়া গেল মাত্র কয়েক মিনিট। নবম মিনিটে জুলিয়ান কুইনোনেস, কলম্বিয়ায় জন্ম নেওয়া সেই ছেলেটি যাকে একসময় সমালোচনার তির ছুটেছিল, 'সে মেক্সিকান নয়' বলে। দ্বিতীয়ার্ধে রবার্তো আলভারাদোর অপূর্ব ক্রসে হিমেনেসের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ গোল।

তিনটি লাল কার্ড বিতর্কের ছায়া ফেলল বটে, কিন্তু মেক্সিকোর খেলার আলো তাতে মিলিয়ে যায়নি। মাঠ ছাড়ল দক্ষিণ আফ্রিকা নয়জনে, আর মেক্সিকো ২-০ গোলের জয় নিয়ে।

সন্ধ্যায় গুয়াদালাহারায় দ্বিতীয় ম্যাচটি শুরু হল একটু ভিন্ন ছন্দে। এশিয়া বনাম ইউরোপের লড়াই। দক্ষিণ কোরিয়া বল রাখছে, এগোচ্ছে, কিন্তু চেকিয়ার গোলরক্ষক মাতেই কোভার দুর্ভেদ্য দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে। সন হিউং-মিন বারবার কাছে গিয়ে ফিরে এলেন শূন্য হাতে। এরমধ্যেই চেকিয়ার অধিনায়ক ক্রেইচি ভ্লাদিমির কউফালের লম্বা থ্রো থেকে মাথা ছুঁইয়ে এগিয়ে দিলেন ইউরোপকে। মনে হল রাত বুঝি কোরিয়ার নয়। তবে কিছুক্ষণ পরই হুয়াং ইন-বম কাট ইন করে পোস্টের ভেতর দিকে মসৃণ এক চিপ। গোল। আর সাব্স্টিটিউট ওহ হিয়ন-গিউ হোয়াংয়ের নিচু ক্রস স্লাইড জালে ঢুকলে উল্টো জয় পায় দলটি।

তবে এই উৎসবের আড়ালেও কিছু প্রশ্ন রয়ে গেছে। বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগ থেকেই টিকিটের মূল্য, ভিসা জটিলতা এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে নানা বিতর্ক ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল উৎসব শুরু হয়ে গেলেও সেই আলোচনাগুলো থেমে যায়নি। বরং বিশ্বকাপের প্রথম ২৪ ঘণ্টাই দেখিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবল শুধু মাঠের ভেতরের গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ এবং বৈশ্বিক বাস্তবতার অসংখ্য স্তর।

এই প্রথম ২৪ ঘণ্টা আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ আগের যেকোনো আসরের চেয়ে আলাদা। ৪৮টি দেশ, তিনটি আয়োজক রাষ্ট্র, আরও বেশি ম্যাচ, আরও বেশি সমর্থক এবং আরও বেশি গল্প। এটি শুধু একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং এক মাসজুড়ে চলতে থাকা একটি বৈশ্বিক মানবিক নাটক, যেখানে প্রতিটি দিন নতুন নায়ক তৈরি করবে, নতুন স্বপ্ন ভাঙবে, নতুন ইতিহাস লিখবে।