শেষ বিশ্বকাপে মেসি-রোনালদো: কোয়ার্টার ফাইনালেই কি দেখা হচ্ছে দুই মহাতারকার?

স্পোর্টস ডেস্ক

দুই দশকের এক অবিশ্বাস্য দ্বৈরথ। ফুটবল বিশ্বের চেনা সমীকরণগুলো যখন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে, ঠিক তখনই আরও একবার একই বিন্দুতে এসে মিলছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ কেবল আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়, ফুটবল ইতিহাসের দুই অবিসংবাদিত মহাতারকার জন্য এটিই হতে যাচ্ছে ‘দ্য লাস্ট ড্যান্স’ বা শেষ নৃত্য। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার এক অনন্য কীর্তি গড়ার অপেক্ষায় আছেন তারা।

তবে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর আকর্ষণ লুকিয়ে আছে নকআউট পর্বের এক সম্ভাব্য সমীকরণে। যদি আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল—দুই দলই নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বের বাধা পেরোতে পারে, তবে আগামী ১১ জুলাই ক্যানসাস সিটিতে কোয়ার্টার ফাইনালেই মুখোমুখি হবেন মেসি ও রোনালদো। ফুটবল ইতিহাসের শেষ ও সবচেয়ে বড় মঞ্চে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর লড়াই দেখার চেয়ে আকর্ষণীয় আর কী হতে পারে!

মেসির অপূর্ণতা নেই, তবু ফুরিয়ে যায়নি ক্ষুধা

২০২২ সালে কাতারের দোহায় যখন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলো, অনেকেই ভেবেছিলেন মেসির ক্যারিয়ারের গল্পটা ওখানেই শেষ। মেসি নিজেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, এরপর আর খেলা চালিয়ে যাওয়ার খুব একটা মানে হয় না। পিএসজির পাট চুকিয়ে ইন্টার মায়ামির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মেজর লিগ সকারে যোগ দেওয়ার পরও তার জাদুকরি ফর্ম অক্ষুণ্ন।

গত বছর মায়ামিকে এমএলএস কাপ জেতানো এই বার্সেলোনা কিংবদন্তি ২০২৪ সালেও আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন। দক্ষিণ আমেরিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসি সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমি ফুটবল খেলতে ভালোবাসি এবং যতদিন পারব, ততদিন খেলে যাব।’

এই বিশ্বকাপে মেসির সামনে রয়েছে দুটি বড় মাইলফলক:

  • ২০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচ: মাইলফলকটি ছুঁতে তাঁর প্রয়োজন আর মাত্র দুটি ম্যাচ।

  • ক্লোসার রেকর্ড: বিশ্বকাপে মেসির বর্তমান গোল ১৩টি। গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডটি ভেঙে দেওয়া তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়।

৪১ বছরেও রোনালদোর পাখির চোখ সেই শ্রেষ্ঠত্বে

বয়সের বিচারে মেসির চেয়ে দুই বছরের বড় ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে ৪১ বছর বয়সে এসেও আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং আল নাসরের সঙ্গে সৌদি প্রো লিগের শিরোপা জয়ের দৌড়ে সমান ক্ষুধার্ত এই পর্তুগিজ উইঙ্গার। ২০০৬ সালে পর্তুগালকে সেমিফাইনালে তোলার পর থেকে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে তার দল খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ২০২২ সালেও সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে নকআউটের ম্যাচে তাকে সাইডবেঞ্চে বসে থাকতে হয়েছিল।

তবে রবার্তো মার্টিনেজ কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর রোনালদোকে আবার দলের প্রধান স্ট্রাইকার হিসেবে ফিরিয়ে আনেন। ২২৬টি ম্যাচ খেলে পুরুষ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা এই সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ তারকা সম্প্রতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, ‘আমি ৪১ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছি এবং আমার মনে হয় এটাই (বিশ্বকাপ) শেষ করার সঠিক সময়।’

পর্তুগাল এবার কলম্বিয়া, উজবেকিস্তান ও ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর সঙ্গে একই গ্রুপে থেকে মাঠে নামবে। রোনালদোর উপস্থিতি নিয়ে দলে কিছু বিতর্ক থাকলেও কোচ মার্টিনেজ তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখছেন, ‘তিনি আমাদের অধিনায়ক এবং দেশের প্রতি এক অনুকরণীয় দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করেন।’ রোনালদোর লক্ষ্য এখন একটাই—বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিজের প্রথম গোলের দেখা পাওয়া এবং শেষবারের মতো সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরা।

ক্যানসাস সিটির আসবে মহাদিন?

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন গ্রুপ পর্বের হিসাব-নিকাশের দিকে। যদি হিসাব মিলে যায়, তবে ১১ জুলাই ক্যানসাস সিটির কোয়ার্টার ফাইনালটি আর কেবল একটি ম্যাচ থাকবে না; সেটি হবে দুই দশকের এক রাজকীয় দ্বৈরথের চূড়ান্ত এবং শেষ অধ্যায়। এক পাশে বিশ্বজয়ের পর মুকুট ধরে রাখার মিশন, অন্য পাশে ক্যারিয়ারের শেষ বেলায় এসে শ্রেষ্ঠত্বের শেষ অধ্যায় লেখার লড়াই। ফুটবল বিশ্ব কি তৈরি হচ্ছে ইতিহাসের সেরা ‘লাস্ট ড্যান্স’ দেখার জন্য?