বিশ্বকাপের ৫৩ দিন বাকি

তোস্তাও: জেদ, বীরত্ব ও চিকিৎসককে বিশ্বজয়ের মেডেল উপহার

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

১৯৭০ সালের ২১ জুন। মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তখন হলুদে-নীল সমুদ্রের গর্জন। ইতালির জমাট রক্ষণকে তছনছ করে দিয়ে ব্রাজিল জয়ের সুবাস পাচ্ছে। স্কোরলাইন বলছে, সেলেসাওরা ৩-১ গোলে এগিয়ে। ঘড়ির কাঁটায় ফাইনাল ম্যাচের আরও ২০ মিনিট বাকি।

ঠিক সেই মুহূর্তে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীরা এক আবেগঘন দৃশ্য দেখলেন। পেলের জাদুকরী পাস আর জায়ারজিনিওর গতির ঝড়ের মাঝে ক্যামেরার লেন্স খুঁজে নিল ব্রাজিলের ৯ নম্বর জার্সিধারীকে। দেখা গেল, মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন এদুয়ার্দো গঞ্জালভেস দি আন্দ্রাদে, ফুটবল বিশ্ব যাকে চেনে তোস্তাও নামে।

ব্রাজিলের তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দের সঙ্গে সেই কান্না ছিল এক দীর্ঘ যাতনা, অন্ধকার প্রকোষ্ঠের বিভীষিকা আর ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ার আতঙ্ককে জয় করার এক স্মরণীয় মুহূর্ত।

ফুটবল ইতিহাস ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপের ব্রাজিল দলকে চেনে একদল অপ্রতিরোধ্য ছন্দের জাদুকর হিসেবে। তাদেরকে তুলনা করা হতো বাস্কেটবলের 'হারলেম গ্লোবেট্রটার্স'-এর সঙ্গে। কিন্তু সেই শৈল্পিক ও নিখুঁত পারফরম্যান্সের আড়ালে যে কতটা শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক জেদ লুকিয়ে ছিল, তোস্তাওয়ের জীবন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

এই মহাকাব্যের শুরুটা হয়েছিল এক বছর আগে, ১৯৬৯ সালের এক অভিশপ্ত সেপ্টেম্বরে। ব্রাজিলিয়ান ঘরোয়া লিগে ক্রুজেইরোর হয়ে করিন্থিয়ান্সের বিপক্ষে খেলছিলেন তোস্তাও। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় দিতাওয়ের একটি জোরালো ক্লিয়ারেন্স সরাসরি এসে আঘাত করে তোস্তাওয়ের বাঁ চোখে। আঘাতটি এতটাই তীব্র ছিল যে, মুহূর্তেই তার চোখের রেটিনা ছিঁড়ে যায়। এই চোট কেবল একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষের সংকেত ছিল না, বরং ছিল আজীবন অন্ধত্বের এক নিষ্ঠুর হাতছানি।

তোস্তাওয়ের জন্য পৃথিবীটা হঠাৎ করেই অন্ধকার হয়ে আসে। দৃষ্টিশক্তি আর ফুটবল ক্যারিয়ার— দুটোকে এক সুতোয় বাঁধতে তিনি পাড়ি জমালেন যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে। সেখানে ডা. রবার্তো আবদালা মৌরা ও ডা. অ্যালিস ম্যাকফারসনের ছুরি-কাঁচির নিচে তাকে যেতে হলো। ডা. ম্যাকফারসন পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, তার কাছে আসা রোগীরা সাধারণত প্রশ্ন করেন যে, তারা আবার পৃথিবীতে দেখতে পাবেন কি না। কিন্তু তোস্তাওয়ের প্রথম প্রশ্নটি ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, বিশ্বকাপে খেলতে পারবেন তো?

অস্ত্রোপচার সফল হলেও তোস্তাওয়ের বাঁ চোখের দৃষ্টিতে এক ধরনের স্থায়ী সীমাবদ্ধতা বা 'ব্লাইন্ড স্পট' থেকে গিয়েছিল। তার মতো একজন নান্দনিক ফুটবলারের জন্য— যার খেলা মূলত নির্ভর করে মাঠের চারপাশের প্রখর দৃষ্টি, সৃজনশীলতা আর নিখুঁত পাসের ওপর, তার কাছে এটা ছিল এক ভয়াবহ বাধা। মেক্সিকো বিশ্বকাপের জন্য যখন দল গোছানো শুরু হলো, ব্রাজিলের কোচ মারিও জাগালো ও দলের চিকিৎসক লিনিও তোলেদো তাকে নিয়ে চরম সংশয়ে ছিলেন। এমনকি বিশ্বকাপের মাত্র দুই মাস আগেও তার চোখে নতুন করে রক্তক্ষরণ দেখা দিয়েছিল।

জাগালো তোস্তাওকে বিবেচনা করতেন পেলের বিকল্প হিসেবে, অর্থাৎ বদলি হিসেবে মাঠে নামাবেন তাকে। কিন্তু পেলের ব্যক্তিগত অনুরোধ আর তোস্তাওয়ের নিজের অদম্য জেদের কাছে সব বাধা হার মানল। তবে পজিশন নিয়ে তৈরি হলো এক নতুন চ্যালেঞ্জ।

তৎকালীন ব্রাজিল দলে ছিলেন পাঁচজন বিশ্বসেরা '১০ নম্বর' পজিশনের খেলোয়াড়— পেলে, গেরসন, রিভেলিনো, জায়ারজিনিও ও তোস্তাও। দলের স্বার্থে তোস্তাও তার চিরচেনা প্লে-মেকিং ভূমিকা ছেড়ে দিয়ে সেন্টার ফরোয়ার্ড বা ৯ নম্বর পজিশনে খেলতে রাজি হন। তিনি প্রথাগত শক্তিমান স্ট্রাইকার ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠলেন ফুটবলের ইতিহাসের প্রথম দিকের 'ফলস নাইন'। প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের নিজের জায়গা থেকে টেনে বের করে আনতেন, যাতে পেলে আর জায়ারজিনিও ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে গোল উৎসব করতে পারেন।

পুরো বিশ্বকাপ জুড়ে তোস্তাও খেলছিলেন এক নীরব বীরের মতো। প্রতিটি হেড দেওয়ার সময় কিংবা প্রতিপক্ষের সঙ্গে প্রতিটি শারীরিক সংঘর্ষে তার মাথায় কাজ করত স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকি। প্রতিটি মুহূর্ত তিনি হিসাব কষে সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করতেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ববি মুরকে নাটমেগ করা কিংবা উরুগুয়ের বিপক্ষে সেই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তার অবদান ছিল অমূল্য। টুর্নামেন্টে নিজে ২ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে তিনি করিয়েছিলেন আরও ৪টি গোল।

ফাইনাল শেষ হওয়ার ২০ মিনিট আগে কান্নায় ভেঙে পড়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তোস্তাও পরে বলেছিলেন, ইতালির বিপক্ষে তৃতীয় গোলটি হওয়ার পর যখন তিনি নিশ্চিত হলেন যে, ব্রাজিলই চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে, তখন তার সমস্ত আবেগ বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল। হিউস্টনের সেই অন্ধকার ঘর, অপারেশন থিয়েটারের সেই উৎকণ্ঠা আর মাসের পর মাস মাঠের বাইরে থাকার সেই অসহায়ত্ব— সবকিছু এক নিমিষে তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।

চোখের দুর্দশার কারণে ১৯৭০ সালে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের কয়েক বছর পর, মাত্র ২৬ বছর বয়সে তোস্তাও ফুটবলকে চিরতরে বিদায় জানাতে বাধ্য হন। কিন্তু বিদায়ের আগে তিনি ফুটবল বিশ্বকে দিয়ে যান এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

একজন বিশ্বজয়ীর কাছে তার মেডেলটি হয় প্রাণের চেয়ে প্রিয় সম্পদ। কিন্তু তোস্তাও ব্রাজিলের জার্সিতে পাওয়া ঐতিহাসিক সম্মাননাটি নিজের ড্রয়ারে বা বাসার দেয়ালে সাজিয়ে রাখেননি। কৃতজ্ঞতার এক অনুপম নিদর্শন হিসেবে তিনি পদকটি উপহার দেন চিকিৎসক মৌরাকে। হিউস্টনের সেই সার্জন না থাকলে তোস্তাওকে হয়তো মেক্সিকোর রোদে ঘাসের ওপর ফুটবল না খেলে অন্ধকার ঘরে বসে রেডিওতে ধারাভাষ্য শুনতে হতো। তাই উপহারটি ছিল একজন কৃতজ্ঞ মানুষের পক্ষ থেকে তার জীবনদাতার প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ্য।

ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার পর তোস্তাও নতুন এক লড়াই শুরু করেন। তিনি ফিরে যান পড়ার টেবিলে এবং সফলভাবে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জন করে নিজেই একজন ডাক্তার হন।

আজতেকা স্টেডিয়ামে ফাইনাল শেষে, ইতালির বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪-১ গোলের দাপুটে জয়ের পর উন্মত্ত মেক্সিকান সমর্থকরা স্মৃতি হিসেবে তোস্তাওয়ের জার্সি, বুট এমনকি মোজা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গিয়েছিল। ড্রেসিংরুমে তিনি ফিরেছিলেন কেবল অন্তর্বাস পরে, কিন্তু তার কাছে সেসব তখন নিতান্তই গৌণ।

ফুটবলের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম সুন্দর মুহূর্তগুলো সব সময় কেবল প্রতিভা দিয়ে নির্মিত হয় না। এর পেছনে মিশে থাকে অসীম ত্যাগ আর খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসার প্রবল সাহস। তোস্তাও সেই অদম্য যোদ্ধারই নাম।