প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল: দুটি বল, ৩০০ বেয়নেট ও একটি হত্যার হুমকি
১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই। ফিফা আয়োজিত ফুটবলের প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনাল ছিল কেবল একটি খেলা নয়, বরং দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী— উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই। মন্তেভিদিওর এস্তাদিও সেন্তেনারিওতে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচটি আজও ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে আছে।
তখন স্বাগতিক উরুগুয়ে ফুটবলের 'সোনালী প্রজন্ম' পার করছিল। ১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে টানা দুবার স্বর্ণপদক জিতে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল। অন্যদিকে, আর্জেন্টিনাও ছিল দুর্দান্ত ফর্মে। ১৯২৭ ও ১৯২৯ সালের দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ (বর্তমান কোপা আমেরিকা) জয়ী দলটি ১৯২৮ সালের অলিম্পিকে উরুগুয়ের কাছে হেরেই রুপা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিল।
ফাইনালের পথে
উদ্বোধনী বিশ্বকাপে আয়োজক উরুগুয়েসহ মোট ১৩টি দল অংশ নিয়েছিল। দলগুলোকে চারটি গ্রুপে ভাগ করা হয়। গ্রুপ একে ছিল আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, চিলি ও মেক্সিকো। এই গ্রুপ থেকে তিনটি জয় নিয়ে সেমিফাইনালে পা রাখে আর্জেন্টিনা। আর উরুগুয়ে ছিল গ্রুপ তিনে, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল রোমানিয়া ও পেরু। দুই জয় নিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে উরুগুয়েও সেমিতে ওঠে।
সেমিফাইনালে উরুগুয়ে ৬-১ গোলে যুগোস্লাভিয়াকে গুঁড়িয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে। বিপরীতে, আর্জেন্টিনাও যুক্তরাষ্ট্রকে একই ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে পৌঁছায়।
বল নিয়ে বিবাদ ও অদ্ভুত সমাধান
ম্যাচের আগে দেখা দিয়েছিল এক অদ্ভুত বিপত্তি। কোন বল দিয়ে খেলা হবে— তা নিয়ে দুই দেশের অধিনায়ক একমত হতে পারছিলেন না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বেলজিয়ান রেফারি জ্যাঁ ল্যাঙ্গেনাস এক বিস্ময়কর রায় দেন। সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমার্ধ খেলা হবে আর্জেন্টিনার সরবরাহ করা বল দিয়ে আর দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হবে উরুগুয়ের বলে।
মজার ব্যাপার হলো, প্রায় ৬৯ হাজার দর্শকের সামনে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৪-২ ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উল্লাসে মাতে উরুগুয়ে। অনেকের মতে, বলের এই পরিবর্তনই ম্যাচের ভাগ্য গড়ে দিয়েছিল।
ফাইনাল: সেন্তেনারিও যখন রণক্ষেত্র
ফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। রবার্তো চেরো ম্যাচ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন, আদলফো জুলেমজু চোটের কারণে খেলতে পারেননি। এমনকি 'দ্য লিটল ক্যানন' খ্যাত ফ্রান্সিসকো ভারালোও হাঁটুর চোট নিয়ে খেলতে অনিচ্ছুক ছিলেন।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছিল লুইস মন্তি ও তার পরিবারকে অজ্ঞাতনামাদের দেওয়া হত্যার হুমকি। গুঞ্জন আছে, ইতালির মাফিয়ারা এই হুমকির পেছনে ছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল মন্তি যেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে হেরে যান এবং এরপর নিজ দেশের সমর্থকদের রোষানলে পড়ে ইতালিয়ান ক্লাব জুভেন্তাসে যোগ দেওয়ার পাশাপাশি ইতালির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। মন্তি পরবর্তীতে স্বীকার করেছিলেন, 'সেই ম্যাচ চলাকালে আমি খুব ভয়ে ছিলাম, কারণ তারা আমাকে ও আমার মাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিল।'
ম্যাচ শুরুর মাত্র দ্বাদশ মিনিটেই গ্যালারিতে উৎসবের জোয়ার বইয়ে দেন পাবলো দোরাদো। তার গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় উরুগুয়ে। তবে সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি আর্জেন্টিনা। মাত্র আট মিনিট পরই কার্লোস পেউসেলের এক জোরালো শটে পরাস্ত হন উরুগুয়ের গোলরক্ষক এনরিকে বালেস্তেরো। সমতায় ফেরা আর্জেন্টিনা এরপর আক্রমণে আরও গতি বাড়ায়। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আট মিনিট আগে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা গুইলের্মো স্তাবিলের (৮ গোল) লক্ষ্যভেদে ২-১ ব্যবধানে লিড নিয়ে বিরতিতে যায় আলবিসেলেস্তেরা।
দ্বিতীয়ার্ধে দৃশ্যপট বদলে যায় পুরোপুরি, যেন নতুন প্রাণ পায় স্বাগতিকরা। ফের খেলা মাঠে গড়ানোর দ্বাদশ মিনিটে পেদ্রো সেয়ার গোলে সমতা টানে লা সেলেস্তেরা। গ্যালারিতে আয়োজকদের উন্মাদনা তখন তুঙ্গে। এরপর ৬৮তম মিনিটে সান্তোস ইরিয়ার্তের গোলে লিড পুনরুদ্ধার করে উরুগুয়ে। আর ফাইনালের একদম অন্তিম মুহূর্তে, ৮৯তম মিনিটে হেক্তর কাস্ত্রো জাল খুঁজে নিলে ৪-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় তাদের। ইতিহাসের প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরার গৌরব অর্জন করে তারা।
মাঠে খেলা শুরু হতেই তা যেন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল। উরুগুয়ের খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ক্রমাগত ফাউল ও শারীরিক আঘাতের অভিযোগ তোলে আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক হুয়ান বোতাসো জানান, উরুগুয়ের কাস্ত্রো তাকে ক্রমাগত আঘাত করছিলেন। শৈশবে বৈদ্যুতিক করাতে ডান হাত কাটা পড়া কাস্ত্রো তার হাতের অবশিষ্টাংশ দিয়েই বোতাসোকে আঘাত করছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে।
দ্বিতীয়ার্ধে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। মন্তির দাবি অনুযায়ী, দর্শকদের উত্তেজনা ও সহিংসতা রুখতে টাচলাইনের ধারে প্রায় ৩০০ উরুগুইয়ান সৈন্য বেয়নেট উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন এক ভয়ার্ত পরিবেশে দুই দলের খেলার ধরনে আকাশ-পাতাল পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বিভিন্ন সংবাদপত্রের তৎকালীন প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যেন এক অদ্ভুত জড়তায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাদের খেলায় পাল্টা আক্রমণের কোনো মানসিকতাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। 'এল গ্রাফিকো'র প্রতিবেদন অনুসারে, উরুগুয়ে যেখানে মাঠে তাদের শতভাগ ঢেলে দিচ্ছিল, সেখানে আর্জেন্টাইন দল যেন একপ্রকার 'না খেলার' সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
বহু বছর পেরিয়ে গেলেও সেই হার মানতে পারেননি ভারালো। তার মতে, আর্জেন্টিনা যোগ্য দল হওয়া সত্ত্বেও প্রতিপক্ষের 'প্রতারণা ও গুন্ডামি'র কাছে হেরেছিল। তবে উরুগুয়ের অধিনায়ক হোসে নাসাজ্জির জবাব ছিল সোজাসাপ্টা, 'আমরা জিতেছি, কারণ আমরা মাঠে আমাদের রক্ত আর কলিজা ঢেলে দিয়েছিলাম।'
অক্ষুণ্ণ রেকর্ড ও ইতিহাসের শেষ প্রদীপ
বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন সেই উরুগুয়ে দলের ম্যানেজার আলবার্তো সুপ্পিসি তখন ছিলেন মাত্র ৩১ বছর বয়সী এক যুবক। আজও তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম শিরোপাজয়ী কোচের রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছেন। ফাইনাল শেষে তৎকালীন ফিফা সভাপতি জুলে রিমে বিজয়ী দলের হাতে তুলে দেন সেই কাঙ্ক্ষিত সোনালী ট্রফি, যা পরবর্তীতে তার নামেই নামকরণ করা হয়।
সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো সর্বশেষ আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় ভারালো ২০১০ সালে ১০০ বছর বয়সে মারা যান। আর উরুগুয়ের শেষ প্রতিনিধি এর্নেস্তো মাসচেরোনি পরলোকগমন করেছিলেন ১৯৮৪ সালে।