বিশ্বকাপে অফসাইড সিদ্ধান্তে এআইচালিত 'থ্রিডি অ্যাভাটার' ব্যবহার করবে ফিফা
আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপে অফসাইড সিদ্ধান্ত আরও নিখুঁত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে ফিফা। টুর্নামেন্টে প্রথমবারের মতো একাধিক নতুন এআইভিত্তিক প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে খেলোয়াড়দের জন্য এআইচালিত 'থ্রিডি অ্যাভাটার'।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির প্রযুক্তি অংশীদার লেনোভোর সহায়তায় বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি খেলোয়াড়ের একটি করে 'এআই-এনাবলড থ্রিডি অ্যাভাটার' তৈরি করা হবে। এর ফলে বর্তমান সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি (এসএওটি) আরও কার্যকরভাবে খেলোয়াড়দের গতিবিধি ট্র্যাক করতে পারবে, বিশেষ করে দ্রুত গতি বা আড়ালে থাকা অবস্থাতেও।
লেনোভোর সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে ফিফা জানিয়েছে, এটি সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির ক্ষেত্রে 'একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি'। বিবৃতিতে বলা হয়, 'আসন্ন বৈশ্বিক আসরের খেলোয়াড়দের ডিজিটালি স্ক্যান করে অত্যন্ত নিখুঁত থ্রিডি মডেল তৈরি করা হবে। প্রতিটি স্ক্যান সম্পন্ন হতে সময় লাগবে প্রায় এক সেকেন্ড, যেখানে শরীরের বিভিন্ন অংশের সঠিক মাপ ধরা পড়বে। এর ফলে দ্রুত বা বাধাগ্রস্ত পরিস্থিতিতেও খেলোয়াড়দের নির্ভরযোগ্যভাবে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে।'
ফিফার দাবি, এই প্রযুক্তি শুধু রেফারিদের সহায়তাই করবে না, মাঠে উপস্থিত দর্শক ও টেলিভিশন দর্শকদের জন্যও অফসাইড সিদ্ধান্ত বোঝা আরও সহজ হবে। ফিফা জানায়, 'থ্রিডি মডেলগুলো হোস্ট ব্রডকাস্টে যুক্ত করা হবে, যাতে ভিএআর নির্ধারিত অফসাইড সিদ্ধান্তগুলো আরও বাস্তবসম্মত ও আকর্ষণীয়ভাবে দর্শকদের সামনে উপস্থাপন করা যায়।'
এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা হয়েছিল গত বছরের ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে। ডিসেম্বর মাসে ফ্লামেঙ্গো ও পিরামিডস এফসির ম্যাচের আগে দুই দলের খেলোয়াড়দের স্ক্যান করা হয়। ফিফা জানিয়েছে, সেই পরীক্ষা সফল হয়েছে এবং বিশ্বকাপে ম্যাচ অফিসিয়ালদের সহায়তায় প্রযুক্তিটি পুরোপুরি প্রস্তুত।
উল্লেখ্য, সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি ইতোমধ্যে দুটি বিশ্বকাপে ব্যবহৃত হয়েছে কাতার ২০২২ এবং ২০২৩ নারী বিশ্বকাপে (অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড)। ভিএআর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে এই প্রযুক্তি অফসাইড সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো স্বয়ংক্রিয় করে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়ার সুযোগ দেয়।
এই ব্যবস্থার মূল দুটি উপাদান হলো 'কিক-পয়েন্ট', অর্থাৎ বল ঠিক কখন ছাড়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট আক্রমণভাগ ও রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের অবস্থান। একাধিক ক্যামেরা খেলোয়াড়দের শরীরের বিভিন্ন অংশ ট্র্যাক করে এবং ম্যাচ বলের সঙ্গে সংযুক্ত তথ্য ব্যবহার করে এআই অফসাইড সিদ্ধান্তের আরও স্পষ্ট চিত্র তৈরি করে।
এআই ব্যবহারে এখানেই থামছে না ফিফা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রতিটি দলই লেনোভোর 'জেনারেটিভ এআই নলেজ অ্যাসিস্ট্যান্ট'-এর সুবিধা পাবে। এই টুলটি লাখো ডেটা পয়েন্ট ব্যবহার করে লেখা, ভিডিও, গ্রাফ ও থ্রিডি ভিজ্যুয়ালাইজেশন তৈরি করতে সক্ষম। উদাহরণ হিসেবে, কোনো দল তাদের শেষ ১০টি কর্নার কিকের বিশ্লেষণ সহজেই দেখতে পারবে।
তবে প্রতিযোগিতায় সমতা বজায় রাখতে ম্যাচ চলাকালীন এই টুল ব্যবহার করা যাবে না। ম্যাচের আগে ও পরে দলগুলো এটি ব্যবহার করতে পারবে। ৪৮ দলের প্রথম বিশ্বকাপে, যেখানে কুরাসাও ও কেপ ভার্দের মতো নতুন দলগুলোর সঙ্গে ব্রাজিল, জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো শক্তিধর দলগুলো লড়বে, এ সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছে ফিফা।
ফিফার বিবৃতিতে বলা হয়, 'ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নত বিশ্লেষণী সুবিধা অনেক সময় দলের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ফুটবল এআই প্রো সেই বৈষম্য দূর করতে চায়, যাতে ৪৮টি দলই ম্যাচের আগে ও পরে একই মানের উন্নত বিশ্লেষণী সুবিধা পায়।'
এ ছাড়া গত গ্রীষ্মের ক্লাব বিশ্বকাপে সফল পরীক্ষার পর বিশ্বকাপে রেফারি ক্যামেরার ফুটেজ স্থিতিশীল ও উন্নত করতেও এআই ব্যবহার করবে ফিফা। সংস্থাটির মতে, এতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং টেলিভিশন দর্শকদের দেখার অভিজ্ঞতাও আরও উন্নত হবে।