‘ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব এখন বিষাক্ত’, ফিফায় গৃহযুদ্ধের শঙ্কা

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপ আয়োজন ও বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে বিতর্কের ঝড় যেন কিছুতেই থামছে না। মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থানকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হচ্ছিল জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। অথচ কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই ইনফান্তিনোকেই এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে। ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত স্থগিত করলেও তাতে বিতর্ক থামেনি, বরং প্রশ্ন উঠেছে, ফিফা সভাপতির দশ বছরের রাজত্ব কি এবার সত্যিই শেষের পথে?

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সাবেক বিপণনপ্রধান মাইকেল পেইন তো সরাসরিই বলে দিয়েছেন, ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব এখন ‘বিষাক্ত’ হয়ে উঠেছে এবং বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষ পদে তার ১০ বছরের রাজত্ব শেষের পথে। এএফপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, 'আমি মনে করি না, কোনো ক্রীড়া নেতার এত দ্রুত জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার পতন আমরা আগে দেখেছি।'

পেইন আরও বলেন, 'এক সপ্তাহ আগেও ইনফান্তিনো একটি অত্যন্ত সফল বিশ্বকাপ আয়োজনের পর বেশ শক্ত অবস্থানে ছিলেন এবং আগামী বছর ফিফা সভাপতি নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজের মেয়াদ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছিলেন। এখন তিনি মাসটি টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেটিই প্রশ্ন।'

মাত্র কয়েক দিন আগেও ইনফান্তিনোর অবস্থান ছিল এমনই শক্ত। সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বকাপ সফলভাবে আয়োজনের পর আগামী বছর চতুর্থ ও শেষ মেয়াদে ফিফা সভাপতি হওয়ার পথও তার জন্য প্রায় পরিষ্কার মনে হচ্ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার ফিফার বড় প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্ব ঘিরে নতুন পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসতেই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি।

ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামে একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করে বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতাগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা ছিল। ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পাশাপাশি ফিফার ২১১ সদস্য দেশকে এককালীন ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার করে দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতিটি সদস্য দেশের জন্য এই অর্থ প্রায় ২৪৬ কোটি টাকা।

কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ব ফুটবলে শুরু হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া। সবচেয়ে জোরালো বিরোধিতা আসে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার কাছ থেকে। এমনকি ফিফার প্রতিযোগিতা বয়কটের হুমকিও দেয় তারা। উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

শেষ পর্যন্ত শনিবার ইনফান্তিনো পরিকল্পনাটি স্থগিত করেন। কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতিটা হয়ে গেছে। উয়েফা জানিয়ে দিয়েছে, ইনফান্তিনোর ওপর তাদের আর আস্থা নেই। কনকাকাফও ফিফা সভাপতির নেতৃত্ব নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে।

মাইকেল পেইনের মতে, এত সহজে এখন আর ইনফান্তিনোর জন্য পরিস্থিতি সামলানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, 'আমি অনেক আগেই শিখেছি, এই দুনিয়ায় কোনো কিছু নিয়েই কখনোই চূড়ান্ত কথা বলা যায় না। কিন্তু ইনফান্তিনোকে টিকে থাকতে এখন অলৌকিক কিছুই প্রয়োজন হবে।'

তার আশঙ্কা আরও ভয়াবহ। পেইন বলেন, 'ছোট দেশগুলোকে কোনোভাবে প্রভাবিত বা রাজি করিয়ে তাকে বাঁচানো যাবে, এমনটা আমি দেখছি না। তার নেতৃত্ব এখন বিষাক্ত হয়ে গেছে। তিনি যদি পদে থাকেন, তাহলে বিশ্ব ফুটবলে পুরোপুরি গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। বড় দেশগুলো আলাদা হয়ে যেতে পারে, বয়কট হতে পারে। আমার মনে হয়, তার সময় শেষ।'

তবে সবাই অবশ্য ইনফান্তিনোর পতন নিশ্চিত মনে করছেন না। বিশ্বকাপ আয়োজনের দুটি সফল প্রচারণায় ব্র্যান্ড ও বিপণন কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করা টেরেন্স বার্নসের মতে, ইনফান্তিনোর অবস্থান অত্যন্ত নাজুক হলেও এখনো সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি।

বার্নস বলেন, 'আমি এত দক্ষ মানুষদের দ্বারা এত খারাপভাবে কোনো বিষয়কে পরিচালিত ও নষ্ট হতে আগে কখনো দেখিনি।'

তার মতে, উয়েফা বয়কটের হুমকি দিয়ে ফিফার ওপর ‘পারমাণবিক অস্ত্র’ প্রয়োগ করেছে ঠিকই, কিন্তু ফিফা নির্বাচনে উয়েফা বা অন্য কোনো কনফেডারেশন সরাসরি একটি ব্লক হিসেবে ভোট দেয় না। ভোট দেন আলাদা আলাদা দেশের ফুটবল সংস্থাগুলো।

এখানেই ইনফান্তিনোর জন্য সবচেয়ে বড় আশার জায়গা হয়ে উঠতে পারে আফ্রিকা। বার্নসের ভাষায়, 'আফ্রিকা যদি ইনফান্তিনোর পাশে থাকে, তাহলে তিনি ইউরোপ, এশিয়া ও কনকাকাফের সমর্থন প্রকাশ্যে হারিয়েও ভোটের কক্ষে জিততে পারেন। কিন্তু আফ্রিকা যদি অবস্থান বদলায়, তাহলে খেলা শেষ।'

অর্থাৎ ইনফান্তিনোর ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করতে পারে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের অবস্থানের ওপর। কারণ ফিফার ২১১ সদস্যের ভোটের অঙ্কে ইউরোপের ৫৫টি ভোট গুরুত্বপূর্ণ হলেও এককভাবে তা ইনফান্তিনোকে সরানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

ইনফান্তিনোর জন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো তার অপ্রতিরোধ্য ভাবমূর্তির পতন। ২০১৯ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। কারণ, তাকে হারানো প্রায় অসম্ভব মনে হওয়ায় বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী সামনে আসেননি।

কিন্তু সেই পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে বলে মনে করেন বার্নস। তিনি বলেন, 'তিনি যে অপ্রতিরোধ্য, এই ধারণাটাই হারিয়েছেন। আর এই ব্যবসায় সেটিই একটি বড় সম্পদ।'

তার মতে, '২০১৯ ও ২০২৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, কারণ শক্তিশালী কেউ এমন একজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, যাকে হারানো সম্ভব নয়। আমার মনে হয়, এই হিসাবটা এই সপ্তাহেই বদলে গেছে।'

ফলে আগামী ১৮ নভেম্বর ফিফা সভাপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণার শেষ সময়সীমা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কোনো শক্তিশালী প্রার্থী দাঁড়িয়ে গেলে বিশ্ব ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।

আর সেই সম্ভাব্য লড়াইয়ে উয়েফার ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সরাসরি কোনো ইউরোপীয় প্রার্থী সামনে এলে আফ্রিকা, এশিয়া ও কনকাকাফের দেশগুলো তাকে কতটা গ্রহণ করবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ নির্বাচনটি শেষ পর্যন্ত শুধু ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ভোট নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্ব কোন অঞ্চলের হাতে কতটা থাকবে, সেই লড়াইয়েও পরিণত হতে পারে।

বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে এসে ইনফান্তিনো আপাতত আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পরিকল্পনাটি স্থগিত করলেও তার ওপর তৈরি হওয়া অবিশ্বাস পুরোপুরি মুছে যায়নি।

বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও এই সংকটের মধ্যে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু বার্নস মনে করেন, ৬৪ দলের বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো প্রস্তাব দিয়েও এখন সহজে পরিস্থিতি পাল্টানো যাবে না। তিনি বলেন, 'সম্প্রসারণ তখনই আকর্ষণীয় মনে হয়, যখন সেটিকে আরও বেশি দেশের অংশগ্রহণের সুযোগ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু অর্থ তৈরি করা সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ বিক্রির প্রচেষ্টার কয়েক সপ্তাহ পর এটি সামনে এলে সেটি আর সুযোগ মনে হয় না, বরং অর্থ দেওয়ার কৌশল মনে হয়।'

এই পরিস্থিতিতে ইনফান্তিনোর সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার চেফেরিন। বার্নসের মতে, চেফেরিন খুব হিসাব করে এগিয়েছেন। তিনি বলেন, 'সে বিষয়টি খুব ভালোভাবে সামলেছে। উয়েফা সম্মিলিতভাবে লড়াই করেছে, অথচ চেফেরিন ব্যক্তিগতভাবে কোনো বিবৃতি দেননি। ফলে এখন তিনি চাইলে ফিফা সভাপতির পদে দাঁড়াতে পারেন, আবার না দাঁড়ালেও এই লড়াইয়ে তার কোনো রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়নি।'

সব মিলিয়ে কয়েক দিনের মধ্যেই জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সামনে তৈরি হয়েছে তার ফিফা সভাপতিত্বের সবচেয়ে বড় সংকট। এক সপ্তাহ আগেও যেখানে চতুর্থ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, সেখানেই এখন তার পদত্যাগ, অনাস্থা ভোট কিংবা নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।