উয়েফার বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্তে ফুটবল বিশ্বে তোলপাড়: কী ঘটতে যাচ্ছে সামনে?
বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টের মালিকানার অংশীদারিত্ব (শেয়ার) বেসরকারী বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে বিপুল অর্থ আয়ের যে পরিকল্পনা ফিফা করেছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে উয়েফা। ইউরোপের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির ৫৫টি সদস্য দেশ একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে ফিফা আয়োজিত সব টুর্নামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শুরু থেকেই ফুটবলের শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই পরিকল্পনার কড়া সমালোচনা করে আসা উয়েফা গতকাল বৃহস্পতিবারের সভা শেষে এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘উয়েফা ও এর সদস্য জাতীয় ফুটবল সংস্থাগুলো ফিফার কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে না।’
যদি ফিফা প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর এই প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাহলেই উয়েফার টুর্নামেন্ট বর্জনের হুমকি কার্যকর হবে।
সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে?
বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কাঠামোয় সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি ইতোমধ্যে বিশ্ব ফুটবলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এখন তাহলে কী ঘটবে? উদ্ভূত সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বকাপসহ ফিফা আয়োজিত আসন্ন টুর্নামেন্টগুলোতে দেখা যাবে না ইউরোপের দলগুলোকে? ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারাই এই বিষয়টির সঙ্গে জড়িত, তাদের কেউই নিশ্চিত নয় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর থেকে পোল্যান্ডে অনূর্ধ্ব-২০ নারী বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে, যেখানে ইউরোপের একাধিক দেশের অংশগ্রহণ করার কথা। এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ওই টুর্নামেন্টে কতটা পড়বে— জানতে চাওয়া হলে ইউরোপিয়ান ফুটবলের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সংক্ষেপে উত্তর দিয়েছেন, ‘(উয়েফার সভায়) সামগ্রিক এই নীতি নির্ধারণের সময় হয়তো এত বিস্তারিত বা খুঁটিনাটি বিষয় ভাবা হয়নি।’
ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন ফিফার এই পরিকল্পনায় সমর্থন দিলে আগামী চার বছরের চক্রে ২১১টি সদস্য দেশের প্রতিটি পাবে ৪ কোটি ডলার। তবে এই সুবিধা পেতে হলে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সদস্যদেরকে সম্মতি জানানোর সময় বেঁধে দিয়েছে সংস্থাটি। ফলে তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, ইউরোপের দলগুলো হয়তো নারী অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার সময় কিংবা সেমিফাইনালের ঠিক আগেই টুর্নামেন্ট থেকে নাম তুলে নিতে পারে।
এরপর ফিফার পরবর্তী জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ হলো অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপের প্লে-অফ পর্ব, যেখানে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের মতো দলগুলোর খেলার কথা রয়েছে। উয়েফার সহ-সভাপতি ও ওয়েলসের সাবেক আন্তর্জাতিক ফুটবলার লরা ম্যাকঅ্যালিস্টার বিবিসিকে বলেছেন, ‘এই ম্যাচগুলো না খেলার কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারছে না।’
‘তবে একটি বিষয় একদম পরিষ্কার হওয়া দরকার— এই সংকটের জন্ম উয়েফা দেয়নি, সমস্যা তৈরি করেছে ফিফা। খেলোয়াড়দের কোনো ভোগান্তি হোক কিংবা বিশ্বকাপের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট থেকে কোনো দেশ বঞ্চিত হোক, তা আমরা কেউই চাই না। ফিফা আমাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে, তাই এই দায় পুরোপুরি ফিফার,’ যোগ করেছেন তিনি।
উয়েফার বক্তব্যের জবাবে ফিফা এখনও কিছু জানায়নি। তবে উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনকাকাফও পরবর্তীতে আরেকটি বিবৃতি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, তাদের ৪১টি সদস্য দেশই ফিফার এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফিফার যে পরিকল্পনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে ফুটবল বিশ্ব
গত মঙ্গলবার ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর কাছে দেওয়া এক চিঠির মাধ্যমে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠান গঠনের এই প্রস্তাবটি উন্মোচন করেন। বিশ্ব ফুটবলের বড় ইভেন্টগুলো পরিচালনার জন্য গঠিত প্রায় ২০০০ কোটি ডলার বাজারমূল্যের এই প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৪০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করাই ইনফান্তিনো ও ফিফার মূল লক্ষ্য।
এই শেয়ার বিক্রি ও বিনিয়োগকারী খোঁজার মূল দায়িত্বে রয়েছে মার্কিন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘থ্রাইভ ক্যাপিটাল’। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জশুয়া কুশনার হলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। এছাড়া, নতুন এই বাণিজ্যিক অঙ্গপ্রতিষ্ঠানটি গঠনের প্রক্রিয়ায় ফিফাকে সহায়তা করছে বিখ্যাত মার্কিন ব্যাংক ‘জেপি মরগান’। তবে ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনা প্রকাশ্যে আসার পরপরই ফুটবল বিশ্বে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
যুক্তরাজ্যের দৈনিক দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইনফান্তিনো চিঠিতে নিশ্চিত করেছেন যে, সদস্য দেশগুলো এই প্রস্তাবে সায় দিলে মোট ১০০০ কোটি ডলারের একটি বিশাল তহবিল তৈরি হবে।
বর্তমানে ফিফার প্রতিটি সদস্য দেশ চার বছরের একটি চক্রে উন্নয়ন তহবিল হিসেবে পেয়ে থাকে মাত্র ৮০ লাখ ডলার। নতুন প্রস্তাবটি পাস হলে এই অর্থের পরিমাণ একলাফে বহুগুণ বেড়ে যাবে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি সদস্য দেশ মোট ৪ কোটি ডলার করে পাবে। এর মধ্যে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারিতেই ২ কোটি ডলার ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বাকি অর্থ ধাপে ধাপে দেওয়া হবে।
চিঠিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার প্রতিটি সদস্য সংস্থার ওপর ছেড়ে দিয়ে ইনফান্তিনো লিখেছেন, ‘আপনারা যদি এই প্রস্তাবে এগোতে চান, তবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১০০০ কোটি ডলারের এই প্যাকেজটি উন্মুক্ত হবে, যা আমাদের যৌথ পথচলার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘আর আপনারা যদি বর্তমান অবস্থা বজায় রেখে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, তবে উন্নয়ন তহবিলের (ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম) জন্য আমাদের পূর্বঘোষিত ২৭০ কোটি ডলারের পরিকল্পনা আগের মতোই বহাল থাকবে।’
তবে উয়েফা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফুটবল কিংবা বিশ্বকাপ কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয়। তাছাড়া, এই খেলাটিকে ব্যবসার সামগ্রী বানানোর এমন একতরফা চেষ্টা বিশ্ব ফুটবলের সুশাসন ও কাঠামোর ওপর বড় আঘাত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কিন্তু বাংলাদেশের মতো সদস্য দেশগুলো আবার পড়েছে দ্বিমুখী সংকটে। কারণ, তাদেরকে তাকিয়ে থাকতে হয় ফিফার তহবিলের দিকে।