ইংল্যান্ডের কাছে ধবলধোলাই হয়ে আরও তলানিতে পাকিস্তান ক্রিকেট
ইংল্যান্ডের মাটিতে ৩-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজে ধবলধোলাই হয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট পৌঁছাল আরও তলানিতে। শেষ টেস্টে অভিষিক্ত রাজাউল্লাহর ঝড়ো ক্যামিও আশার সামান্য আলো দেখালেও মাঝপথে খেলোয়াড় বাদ দেওয়া ও কোচ বরখাস্তের ঘটনাসহ বহু নেতিবাচক কারণে জর্জরিত ছিল তাদের সফরটি।
গত ৫০ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ড সফর করা সবচেয়ে বাজে দল হিসেবে আখ্যা পেয়েছে পাকিস্তান। একের পর এক পরিবর্তন আর ছাঁটাইয়ের পুরোনো বৃত্তেই আটকে ছিল দেশটির ক্রিকেট বোর্ড পিসিবি। যার খেসারত দিয়ে দ্বিতীয় টেস্টের পর চাকরি হারান প্রধান কোচ সরফরাজ আহমেদ ও বোলিং কোচ উমর গুল। স্কোয়াড থেকে বাদ দেওয়া হয় সাতজন খেলোয়াড়কে। বারবার ভেঙে পড়া পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের করুণ দশা ফুটে ওঠে এই সিরিজে— ছয় ইনিংসের পাঁচটিতেই ২০০ রান স্পর্শ করতে পারেনি তারা।
তৃতীয় ও শেষ টেস্টে অন্তর্বর্তীকালীন কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাদা বলের কোচ মাইক হেসনকে। কিন্তু এই চালও বদলাতে পারেনি পাকিস্তানের ভাগ্য। বরং মাঠের বাইরের বিশৃঙ্খলা আরও ঘনীভূত হয়। বাদ পড়া মোহাম্মদ রিজওয়ান ও ইমাম-উল-হকের বিরুদ্ধে দলের ভেতরের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ আনা হয় এবং পাকিস্তানের জাতীয় সাইবার ক্রাইম এজেন্সি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে।
পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম দলটির এমন পতনের আভাস আগেই পেয়েছিলেন। রোববার বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘অবস্থাটা সত্যিই হতাশাজনক। তবে গত পাঁচ বছর ধরেই আমি এই বিপর্যয় আসাটা দেখতে পাচ্ছিলাম। আপনি কেবল একজন ব্যক্তি বা কোনো একক কারণকে দায়ী করতে পারবেন না। কারণ অনেক জায়গায় গলদ রয়েছে।’
ওয়াসিমের সাবেক সতীর্থ শহীদ আফ্রিদি বর্তমান পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন ‘অন্ধকার’ হিসেবে। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘পাকিস্তান ক্রিকেটে এখন অন্ধকার সময় চলছে। খেলোয়াড়দের তো এভাবে অসম্মান করা যায় না। আর আপনাদের কাঠামোটাও শক্তিশালী নয়।’
হারের পর এমন অস্থিরতা আর দলের খোলনলেচে বদলে ফেলা পাকিস্তান ক্রিকেটের পুরোনো রোগ। কেবল গত তিন বছরেই টেস্ট দলের তিনজন অধিনায়ক ও ছয়জন প্রধান কোচ বদল করা হয়েছে। পিসিবিতেও গত পাঁচ বছরে পাঁচজন সভাপতির দেখা মিলেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে ধাক্কা লেগেছে তাদের ক্রিকেট উন্নয়নে।
অস্থিরতার পাশাপাশি আচমকা শাস্তি দেওয়ার সংস্কৃতিও বেশ পুরোনো। ২০১০ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরের ৩-০ ব্যবধানে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৎকালীন অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ ও অভিজ্ঞ ব্যাটার ইউনিস খানকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল পিসিবি। আফ্রিদিসহ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল আরও পাঁচজনকে।
গতকাল শনিবার এজবাস্টনে সিরিজের শেষ টেস্টে হারটি ছিল সবশেষ ২১ টেস্টে পাকিস্তানের ১৬তম হার। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চলমান ২০২৫-২৭ চক্রের পয়েন্ট তালিকায় তারা এখন সবার নিচে। আগের চক্রেও তারা একই জায়গায় অর্থাৎ নবম হয়ে শেষ করেছিল।
সাদা বলের— ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও স্বস্তিতে নেই দলটি। নিরাপত্তা শঙ্কা কাটিয়ে দীর্ঘ ২৯ বছর পর ঘরের মাঠে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজন করেছিল তারা। কিন্তু গত বছর অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় পাকিস্তান।
একইভাবে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও চরম ছন্দপতন ঘটেছে তাদের। চলতি বছরের শুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হয় পাকিস্তান। আর দুই বছর আগের আসরে তো যুক্তরাষ্ট্রের মতো দুর্বল দলের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল।
সাবেক লেগ স্পিনার ও ১৯৯২ বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলের সদস্য মুশতাক আহমেদ এই পতনের মূলে দেখছেন পরিকল্পনার অভাবকে। এএফপিকে তিনি বলেন, ‘অতীতে আমাদের অনেক ম্যাচ জেতানো খেলোয়াড় আর একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। তাই আমরা সাফল্য পেতাম। কিন্তু এখন পতনটা এত দ্রুত হয়েছে যে, সেটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে।’
ত্রুটিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চাপ সামলানোর মতো খেলোয়াড় তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না পাকিস্তানের পক্ষে। তাই শিগগিরই এই সংকট কাটার সুযোগ কম দেখেন ওয়াসিম, ‘আমাদের স্বীকার করতেই হবে, লাল বলের ক্রিকেটে আমাদের প্রতিভার অভাব রয়েছে। সাদা বলের দল তাও ঠিকঠাক আছে। পিসিবি সভাপতিকে দোষ দেওয়া সহজ। কিন্তু আমরা যখন ঘুমিয়ে ছিলাম আর পুরো ব্যবস্থার আসল সমস্যাগুলোর সমাধান করিনি, তখন এমন পতন তো হবেই।’
