আইনি জটিলতায় সাকিবের ফেরা এখনো অনিশ্চিত
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে শীর্ষ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হলেও পথে রয়েছে বেশ কিছু আইনি বাধা।
গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে সাকিবের প্রত্যাবর্তন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত তার ক্রিকেটার মাগুরা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, সাকিবের দেশে ফেরা এবং টাইগারদের হয়ে মাঠে নামা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও অবশ্য সাকিব সরকার পরিবর্তনের পরপরই পাকিস্তান ও ভারতে ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত রাখেন।
তিনি ইচ্ছা জানিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের অক্টোবরে মিরপুরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিদায়ী ম্যাচ খেলে তার বর্ণাঢ্য টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরাপত্তার কথা বলে তাকে দেশে ফেরার অনুমতি দেয়নি। এই সিদ্ধান্ত সাকিবের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে ঝুলে যায়। ভক্ত ও বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করে।
বিষয়টি গত ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অনেকটা চাপা পড়ে ছিল। তবে সেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ঘোষণা করে , প্রাপ্যতা সাপেক্ষে সাকিবকে হোম ও অ্যাওয়ে উভয় সিরিজের জন্যই বিবেচনার তালিকায় রাখা হবে। অন্তবর্তী সরকারের ভারতে গিয়ে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত জানানোর পরদিনই এমন ঘোষণা আসে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন
প্রাথমিকভাবে বিসিবির এই বিবৃতিকে কেউ কেউ বিশ্বকাপ বিপর্যয় থেকে দৃষ্টি সরানোর চেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফেরার পর সাকিব ইস্যুতে সরকারের অবস্থান কিছুটা নরম হতে শুরু করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অভ্যুত্থান পরবর্তী মামলাগুলো পুনর্নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন এবং জোর দিয়ে বলেছেন যে, কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। এই নির্দেশনাকে অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল মামলাগুলোর ওপর নতুন করে পর্যালোচনার সংকেত হিসেবে দেখছেন।
এদিকে, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের মন্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হলে সাকিবের ফেরা অসম্ভব নয়।
তবে সাকিবের ফেরা মূলত তিনটি মামলার ওপর ঝুলে আছে: চেক ডিজঅনার, অর্থ আত্মসাৎ এবং হত্যা মামলা। প্রতিটি মামলাই বর্তমানে আইনি পর্যালোচনার অধীনে রয়েছে, যা তার নিকট ভবিষ্যতের ওপর অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।
সাকিবের পরিস্থিতি নিয়ে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও একই সুর প্রতিধ্বনিত করেছেন। তিনি জানান, মামলা থাকার কারণে বিষয়টি রাষ্ট্রীয় উদ্বেগের পর্যায়ে রয়েছে, তবে সরকার নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, সাকিব ও সহকর্মী ক্রিকেটার মাশরাফি বিন মোর্তজার উচিত আইনজীবীদের মাধ্যমে তাদের আইনি বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করা। যদি তারা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে পারেন এবং মামলা মিটিয়ে ফেলেন, তবে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে তাদের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানো হবে।
হত্যা মামলা
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে একটি হলো ২০২৪ সালের আগস্টের শেষের দিকে আদাবর থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলা। সরকার পতনের আন্দোলন চকালাকীন এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই মামলাটি হয়। এজাহারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে সাকিবকে ২৮ নম্বর আসামি হিসেবে রাখা হয়েছে।
ঘটনার সময় সাকিব গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে অংশ নিতে কানাডায় ছিলেন। তদন্তের দায়িত্ব বর্তমানে ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা মো. টিপু সুলতানের মতে, মামলায় প্রায় ১৪৮ জনের নাম রয়েছে। এখনো কোনো চার্জশিট বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। কর্তৃপক্ষ সাকিবের অবস্থানের সত্যতা নিশ্চিত করতে তার ইমিগ্রেশন রেকর্ড যাচাই করেছে এবং যাচাই প্রক্রিয়া এখনো চলছে।
এই মামলার গুরুত্ব ও জটিলতা বিবেচনা করে টিপু সুলতানকে চতুর্থ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
চেক ডিজঅনার মামলা
গত বছরের জানুয়ারিতে আইএফআইসি ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চেক ডিজঅনার মামলায় সাকিবের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার একটি আদালত। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ‘সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড’ ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নিয়েছিল। পরবর্তীতে কোম্পানিটি মোট ৪১.৫ লাখ টাকার দুটি চেক প্রদান করে, যা অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়।
আইএফআইসি ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখপাত্র মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঋণ পুনঃতফসিল নিয়ে আলোচনা চলছে। সাকিবের প্রতিনিধি ডাউন পেমেন্ট হিসেবে ২২ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন এবং বিষয়টি বোর্ড অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে বকেয়া টাকার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর থাকছে।
দুদকের অর্থ পাচার মামলা
২০২৫ সালের ১৭ জুন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) শেয়ারবাজার কারসাজি ও অর্থ পাচারের মাধ্যমে ২৫৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাকিবসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। দুদক গত নভেম্বরে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
আদালত সূত্র জানায়, পরবর্তী শুনানি মার্চের শুরুতে হওয়ার কথা রয়েছে। এই মামলায় সাকিবের বিরুদ্ধে এখনো কোনো চার্জশিট বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি না হলেও তার ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে।
আইনজীবীদের বক্তব্য
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ব্যাখ্যা করেছেন, 'নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট'-এর ১৩৮ ধারার মামলাটি জামিনযোগ্য এবং সাধারণত এসব মামলায় মানুষ জামিন পেয়ে যান। তিনি উল্লেখ করেন, ঋণ পুনঃতফসিল এবং ফৌজদারি কার্যধারা আলাদা বিষয়; জামিন পেলে সাকিবের ক্রিকেটে ফেরার আইনি বাধা দূর হতে পারে।
হত্যা মামলার বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন, সাকিবের দেশের বাইরে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হলে তদন্তকারীরা তার জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নাও পেতে পারেন। তবে আইনি আনুষ্ঠানিকতাগুলো অবশ্যই সম্পন্ন করতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান আইনের দৃষ্টিতে সমতার নীতির ওপর জোর দিয়ে বলেন যে, জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও সাকিবকে অন্য সব নাগরিকের মতো যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি মেনে চলতে হবে।
বিসিবির অবস্থান ও সামনে যা আছে
বিসিবি অনুরোধের প্রেক্ষিতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে সাকিবের মামলার বিবরণ পাঠিয়েছে। বোর্ডের পরিচালক আসিফ আকবর জানান, বোর্ড তাদের দায়িত্ব সম্পন্ন করেছে এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার আশ্বাসে তারা সন্তুষ্ট। তিনি আরও জানান, ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
আগামী ৯ মার্চ তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে পাকিস্তানের আসার কথা রয়েছে। ওই সফরে সাকিব ফিরতে পারেন কিনা, তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, আইনি বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না হলে তার ফেরা আরও বিলম্বিত হতে পারে।
এদিকে সাকিব আসন্ন সিরিজে তার প্রাপ্যতা এবং আইনি বিষয় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা ভক্তদের তার ভবিষ্যতের ব্যাপারে চূড়ান্ত খবরের অপেক্ষায় রেখেছে।