জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান ও বৃদ্ধ বয়সের সুরক্ষা: সঠিক পদক্ষেপ, তবে দূর করতে হবে আইনি অস্পষ্টতা
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান গত ৩০ জুলাই জানিয়েছেন, সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধনের কথা ভাবছে। প্রস্তাব করা হবে, সন্তানের নামে সম্পত্তি লিখে দিলেও বাবা-মা জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ-দখলে রাখতে পারবেন।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, এই সংশোধনের উদ্দেশ্য হলো সম্পত্তি দান বা হস্তান্তরের পর বাবা-মাকে যেন সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়। পাশাপাশি পারিবারিক বিরোধ ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলাও কমানো সম্ভব হবে।
প্রস্তাবটির উদ্দেশ্য বেশ স্পষ্ট। জীবদ্দশায় সম্পত্তি সন্তানের নামে লিখে দেওয়ার পরও বাবা-মাকে যেন নিজের ঘর হারানোর ভয় বা সন্তানের দয়ার ওপর নির্ভর করে থাকতে না হয়।
প্রবীণ পিতামাতার সুরক্ষার দিক থেকে দেখলে আইনমন্ত্রীর এই প্রস্তাব বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। এটা এমন একটা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে, যার কারণে অনেক পিতামাতা জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান করতে সাহস পান না। আইনি ভাষায় জীবিত অবস্থায় দান বা গিফট করা মানে বিনামূল্যে সম্পত্তি হস্তান্তরকে বোঝানো হয়।
তবে এই প্রস্তাবের প্রভাব শুধু প্রবীণদের সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা মুসলিম ব্যক্তিগত আইন, উত্তরাধিকার, নারীর সম্পত্তির অধিকার এবং ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রথম প্রশ্ন হলো—এই প্রস্তাব কি ইসলামি উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
প্রথমে অনেকের তা-ই মনে হতে পারে। কারণ ইসলামি আইনে ছেলে-মেয়েসহ উত্তরাধিকারীদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা আছে। অনেকের কাছে এই বিধান ধর্মীয় ও আইনি—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আইনের দৃষ্টিতে বিষয়টা এত সরল নয়।
উত্তরাধিকার আইন কার্যকর হয় মৃত্যুর পর। ব্যক্তির মৃত্যুকালে তার মালিকানাধীন সব সম্পত্তি বা এস্টেট উত্তরাধিকার আইনের আওতায় আসে।
অন্যদিকে, ইসলামিক আইনে ‘হেবা’ হলো জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি দান করা। মুসলিম ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী, একবার বৈধভাবে হেবা সম্পন্ন হলে সেই সম্পত্তি সাধারণত আর দাতার সম্পত্তির অংশ হিসেবে থাকে না।
প্রস্তাবিত সংশোধনী এই মূল নীতিকে বদলাচ্ছে না। বরং এটি এমন ব্যবস্থা করতে চায়, যাতে দাতা মালিকানা হস্তান্তর করলেও জীবদ্দশায় সম্পত্তির দখল ও ব্যবহার নিজের কাছে রাখতে পারেন।
অর্থাৎ, এই প্রস্তাব ইসলামি উত্তরাধিকার আইনকে বদলাচ্ছে না। বরং উত্তরাধিকার আইন কখন কার্যকর হবে, বাস্তবে তার প্রভাব কীভাবে পড়বে, সেটায় কিছুটা পরিবর্তন করছে।
এই পার্থক্যটি ছোট মনে হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকতেই সম্পত্তির বড় অংশ হস্তান্তর করে দেন, তাহলে মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টনের জন্য কম সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে।
অর্থাৎ, উত্তরাধিকার আইন একই থাকলেও বাস্তবে তার গুরুত্ব কিছুটা কমে যেতে পারে।
এতে নারীদের সম্পত্তির অধিকারের বিষয়টিও সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন, এই প্রস্তাব নারীদের সম্পত্তির অধিকার আরও শক্তিশালী করতে পারে। সেই যুক্তিরও ভিত্তি আছে।
অনেক বাবা-মা জীবদ্দশায় মেয়ের নামে সম্পত্তি লিখে দিতে চান না। কারণ একবার সম্পত্তি হস্তান্তর করলে নিজের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও বসবাসের নিশ্চয়তা হারানোর আশঙ্কা থাকে।
যদি তারা আজীবন ভোগ-দখলের অধিকার ধরে রাখতে পারেন, তাহলে সেই ভয় অনেকটাই দূর হবে। ফলে যারা মেয়েকে সম্পত্তি দিতে চাইতেন, তারাও হয়তো আরও সহজে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন।
তবে উল্টো ঘটনাও ঘটতে পারে।
কারণ জীবদ্দশায় দেওয়া সম্পত্তি পরে উত্তরাধিকার আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে কেউ যদি এই নতুন সুবিধার কারণে নিশ্চিন্ত বোধ করেন, তাহলে তিনি মৃত্যুর আগেই নিজের অধিকাংশ সম্পত্তি শুধু ছেলের নামে লিখে দিতে পারেন।
সে ক্ষেত্রে মেয়েরা উত্তরাধিকার হিসেবে পাবে কেবল মৃত্যুর সময় যে সম্পত্তি অবশিষ্ট থাকবে, তার অংশ। যদি অবশিষ্ট সম্পত্তি খুব কম থাকে, তাহলে উত্তরাধিকার আইন অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে মেয়েদের প্রাপ্ত সম্পত্তির পরিমাণ অনেক কমে যেতে পারে।
এতে কোনো সাংঘর্ষিক বিষয় নেই। কারণ সম্পদ বণ্টনের কেন্দ্রবিন্দু যদি উত্তরাধিকার থেকে সরে জীবদ্দশায় দান করায় চলে যায়, তাহলে এমন ফল হওয়াই স্বাভাবিক।
এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত নারীদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি কমাবে—তা শুধু আইনের ধারা দেখে বলা সম্ভব না।
আইনটি নিজে নিরপেক্ষ। এর সামাজিক প্রভাব নির্ভর করবে পরিবারগুলো এই সুযোগ কীভাবে ব্যবহার করবে, তার ওপর।
তাই এই বিতর্ককে শুধু ‘পিতামাতার সুরক্ষা’ বা ‘নারীর ক্ষমতায়ন’—এই দুই স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। বিষয়টা আসলে আরও বড়। এটা দেখায়, আইনের বিধান বাস্তব জীবনের সামাজিক আচরণের সঙ্গে কীভাবে মিলে কাজ করে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে আরও কিছু বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। আজীবন ভোগ-দখলের অধিকার বলতে ঠিক কী বোঝানো হবে? পিতামাতা কি সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে ভাড়ার অর্থও পাবেন? সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ, কর ও বিমার দায় কার থাকবে? জমির রেকর্ডে এই আজীবন ভোগদখলের অধিকার কীভাবে উল্লেখ করা হবে? পিতামাতার ভোগদখলের অধিকার থাকা অবস্থায় সন্তান কি সেই সম্পত্তি বন্ধক রাখতে পারবে? সরল বিশ্বাসে সম্পত্তি কেনা কোনো ক্রেতা বা ঋণদাতার স্বার্থ কীভাবে রক্ষা করা হবে?
এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না থাকলে একটা সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে নতুন ধরনের মামলা ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এসব প্রশ্ন তোলার অর্থ এই না যে এই সংস্কারের বিরোধিতা করা হচ্ছে। বরং এটি ইতিবাচক যে সরকার এমন একটি আইন করতে চাইছে, যা বিরোধ তৈরি হওয়ার পর সমাধান দেওয়ার বদলে আগেই বিরোধ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে একটা ভালো আইনকে শুধু তার উদ্দেশ্য দিয়ে নয়, বরং মানুষের পারস্পরিক আইনি সম্পর্ক কীভাবে বদলে দেয়, সেটাও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনী শুধু প্রবীণ পিতামাতাকে সুরক্ষা দেবে না, এটা জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান, উত্তরাধিকার এবং মালিকানার পারস্পরিক সম্পর্ককেও নতুনভাবে সাজাবে।
এই পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত ন্যায়সংগত হবে কি না, পারিবারিক স্বাধীনতাকে আরও শক্তিশালী করবে কি না, নাকি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে—তার উত্তর নির্ভর করবে শুধু আইনের ভাষার ওপর নয়, বরং পরিবারগুলো সেই আইন ব্যবহার করবে কীভাবে, তার ওপরও।
লেখক: ব্যারিস্টার নওশীন নাওয়াল। ইমেইল: nawalnoshin1@gmail.com




