সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশের যোগদানকে ‘প্রতীকী’ বলছেন বিশেষজ্ঞরা

পরিমল পালমা
পরিমল পালমা

সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটে বাংলাদেশের যোগদান বৈশ্বিক নৌপথ সুরক্ষার প্রতি ঢাকার অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তবে একইসঙ্গে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলও এতে প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

গত ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করা এই জোটে বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশ যোগ দিয়েছে। লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই জোটের লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এবং এর জেরে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে ইয়েমেনভিত্তিক হুতিদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বাড়ায় এই নৌপথগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উপসাগরীয় ছয় আরব দেশের মধ্যে এখনো ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই জোট-সংক্রান্ত ঘোষণাপত্রে সই করেনি। সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়নি, যদিও ওয়াশিংটনের এতে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতির প্রতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সমর্থনের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে একইসঙ্গে ঢাকাকে ইরানের সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।

অবসরপ্রাপ্ত এয়ার কমোডর ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, আঞ্চলিক রাজনীতির চেয়ে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকেই বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে দেখা উচিত। একইসঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও বিবেচনায় রাখতে হবে। সৌদি আরবে প্রায় ৭০ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত।

তিনি বলেন, ‘ইরান এই জোটকে নেতিবাচকভাবে দেখতে পারে। কিন্তু আমাদের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। অবাধ নৌচলাচলের ওপরই আমাদের অর্থনীতি নির্ভরশীল। নিরাপদ সমুদ্রপথ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ।’

ইশফাক ইলাহী স্মরণ করিয়ে দেন, এর আগেও ইরান বাংলাদেশের পতাকাবাহী একটি জাহাজকে নিজেদের জলসীমা ব্যবহার করতে বাধা দিয়েছিল। এতে বোঝা যায়, সামুদ্রিক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটলে তার সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ে।

তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশে ইরানের প্রতি জনসমর্থন বেড়েছে। কিন্তু জনমতের আবেগ দিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, হুতিরা ইয়েমেন থেকে হামলা চালালেও দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কোনো সম্পর্ক নেই।

তিনি বাংলাদেশের এই জোটে যোগদানকে ‘মূলত নীতিগত ও প্রতীকী’ পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এটি বড় ধরনের কোনো সামরিক প্রতিশ্রুতির ইঙ্গিত নয়।

তিনি বলেন, ‘জোট যদি সামরিক বা অভিযানভিত্তিক অংশগ্রহণ চায়, তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সরঞ্জাম মোতায়েনের অবস্থানে আছে বলে আমি মনে করি না। তবে সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতির প্রতি নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন জানানো গুরুত্বপূর্ণ।’

হুমায়ূন কবির বলেন, এর আগেও বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন নিরাপত্তা উদ্যোগে যোগ দিলেও সক্রিয় সামরিক ভূমিকা নেয়নি।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশনের (আইএমসিটিসি) সদস্য হয়। তবে রিয়াদে জোটের সদর দপ্তরে কখনো পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদল পাঠায়নি ঢাকা।

তার ধারণা, বর্তমান সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোটেও বাংলাদেশের ভূমিকা একই ধরনের হবে।

হুমায়ূন কবির আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ইরানের পছন্দ নাও হতে পারে। কিন্তু সামুদ্রিক বাণিজ্য সুরক্ষিত রাখা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।’