বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে হত্যা বন্ধ হবে কীভাবে?

Jannatul Naym Pieal
জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

গত ১৪ মে ভোরে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার আমঝোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে খাদেমুল হক (২৫) নামের এক বাংলাদেশি যুবক নিহত হন। এর আগে, ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে দুই বাংলাদেশি নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হন।

এগুলো কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। বরং বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অন্তহীনভাবে চলতে থাকা লাশের মিছিলে নতুন সংযোজন মাত্র।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিএসএফের হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩০, ২০২৩ সালে ৩১, ২০২২ সালে ২৩ এবং ২০২১ সালে ১৮ জন।

আর ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই, অর্থাৎ গত সপ্তাহের হত্যাকাণ্ডের আগেই আরও অন্তত চারজনের নাম এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে।

আসকের তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০১৪ থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিএসএফ ২৮৫ জন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করেছে। গড়ে প্রতিবছর মারা গেছে ২৪ জন। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ—৪২ জন।

নেত্র নিউজ ও বাংলাদেশ প্রটেস্ট আর্কাইভের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অন্তত ২৭ জন বাংলাদেশি শিশু-কিশোর বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৪ সালেই মারা গেছে ছয় জন।

নতুন সরকার, পুরোনো চিত্র

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, আগের সরকারগুলোর (বিশেষ করে আওয়ামী লীগের) ‘নিষ্ক্রিয় ও নতজানু’ নীতির অবসান ঘটাবে তারা। এই সীমান্তকে বিশ্বের ‘সবচেয়ে প্রাণঘাতী সীমান্ত’ আখ্যা দিয়েছিল তারা। সীমান্ত হত্যয়াকে তারা ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে দাবি করে জাতিসংঘের তদন্ত দাবি করেছিল। সে সময় তাদের অভিযোগ ছিল, দিল্লির সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্থায়ী রাজনৈতিক আঁতাতের কারণেই সীমান্ত হত্যার সুরাহা হচ্ছে না।

বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশ-ইন এবং চোরাচালান’ বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারে আসার পর সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এটি স্পষ্ট যে, কোন রাজনৈতিক দল ঢাকায় ক্ষমতায় আছে তার ওপর ভিত্তি করে বিএসএফ তাদের আচরণ বদলায় না। বরং কোনো ঘটনার পরিণতি কী হবে—তার ওপর ভিত্তি করেই তারা আচরণ বদলায়। আর এখন পর্যন্ত এসব হত্যার কোনো পরিণতি বা শাস্তি তাদের ভোগ করতে হয়নি।

সীমান্তে হত্যার জন্য আজ পর্যন্ত বিএসএফের কোনো সদস্যের বিচার হয়নি। ফেলানী খাতুন হত্যায় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষের মামলাটিই শুধু আদালতে উঠেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত বেকসুর খালাস পান তিনি।

বর্তমানের সীমান্ত পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক। এর কারণ এই নয় যে বিএনপি সরকার কিছু করেছে বা করতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এর কারণ হলো, সীমান্তের ওপারে যা ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন রাজনীতি

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করেছে বিজেপি। এর মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছে।

এই জয়ের পেছনে একটি বড় নিয়ামক ছিল বাংলাদেশ, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও জনমিতি পরিবর্তনের (ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ) বয়ান। সেই নির্বাচনী বাগাড়ম্বর এখন সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছে।

আসাম ও ত্রিপুরায় বিজেপির টানা আধিপত্য এবং ভারতের পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে তাদের প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব সীমান্তে হিন্দুত্ববাদী শক্তির এমন একচ্ছত্র আধিপত্য আগে কখনো দেখা যায়নি।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সীমান্ত হত্যা বিজেপি সরকারই শুরু করেছে। তা একেবারেই নয়। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলেও এই হত্যাকাণ্ড চলেছে, যারা আঞ্চলিক সহযোগিতায় নিজেদেরকে চ্যাম্পিয়ন দাবি করত।

১৯৮০-এর দশকে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ একটি বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৮৯ সাল থেকে নয়াদিল্লি সীমান্ত বেড়া দেওয়ার কাজ শুরু করে। তখন থেকেই বিএসএফের হাতে বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত হয়ে ওঠে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের বরাত দিয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, ২০০১ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে—বাজপেয়ী সরকারের শেষ বছর এবং মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর সময়টায় প্রায় এক হাজার বাংলাদেশি বিএসএফের হাতে নিহত হন।

বিজেপি সরকারের আমলেও সীমান্ত হত্যা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এখন যা বদলেছে, তা হলো রাজনৈতিক ম্যান্ডেট।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আর যেমনই হোক তাদেরকে অন্তত বাংলাদেশবিরোধী বলা যেত না। সীমান্তের দুপারের বাঙালিদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত ঐক্যের প্রতি তাদের সংহতির মনোভাব ছিল। এ জন্য তারা দিল্লির বিরোধিতা করতেও পিছপা হতো না।

কিন্তু সেই সরকার আর নেই। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিসরে এখন বাঙালি সংহতি প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে।

বিজেপির আদর্শিক প্রকল্প হলো—বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সীমান্তের এপারের মুসলিম বাঙালিদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সংহতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা। তারা এখন দুপারের মানুষের অভিন্ন ভাষাকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে।

এখন সীমান্তের প্রতি ইঞ্চি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়াকে দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছে নতুন রাজ্য সরকার। আর কথিত অনুপ্রবেশকারীদের খেদানো হলো তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ।

পুশ-ইনের নতুন মাত্রা

সীমান্তে হত্যা এবং পুশ-ইন কোনো আলাদা বিষয় নয়। এগুলো মূলত একই প্রকল্পের ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মে থেকে এ বছরের ২৬ জানুয়ারির মধ্যে ৩২টি জেলার সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে ২ হাজার ৪৭৯ জনকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ইন’ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১২০ জনকে ভারতীয় হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্বীকার করেছেন যে, তার সরকার ও বিএসএফ মিলে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদেরকে বাংলাদেশে ‘পুশ-ব্যাক’ করেছে। এর জন্য আইন-আদালতের তোয়াক্কা করছেন না তারা। ঢাকা এর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করেছিল।

পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা পেয়ে বিজেপির এখন নতুন কিছু করে দেখাতে চাপ অনুভব করতে পারে। এতে করে পুশ-ইন আরও ব্যাপকভাবে বাড়তে পারে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় ‘অনুপ্রবেশ’কে প্রধান ইস্যু করেছিলেন। তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন বিজেপির সর্বস্তরের নেতারা।

গত ৭ মে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ভারতের আইন, পদ্ধতি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী, অবস্থানরত সব অবৈধ বিদেশি নাগরিককে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হবে।’ তিনি এও জানান, বাংলাদেশে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য ২ হাজার ৮৬২টি মামলা এখনো ঝুলে আছে। এর মধ্যেই আবার রাতে ফ্লাডলাইট বন্ধ করে সীমান্ত দিয়ে জোর করে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

এই পুশ-ইন কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ নয়। এটি আসলে নিরাপত্তার মোড়কে একটি আদর্শিক প্রকল্প। চলমান সীমান্ত হত্যার মধ্যেই এটা চলছে।

কাঁটাতারের বেড়া ও কুমির

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে এই কাঁটাতারের বেড়া। ৪ হাজার ৯৬.৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে ৩ হাজার ২৩২ কিলোমিটার এরই মধ্যে ঘেরা হয়ে গেছে।

বাংলাদেশের আপত্তি হলো, ভারতের এই বেড়া নির্মাণ ১৯৭৫ সালের যৌথ নির্দেশনার লঙ্ঘন। ওই নির্দেশনায় সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক কোনো স্থাপনা নির্মাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু ভারত এই তারের বেড়াকে প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা বলে মনে করে না। এই সংজ্ঞা নিয়ে বিরোধের আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।

মালদহ জেলায় বিএসএফ-বিজিবি সংঘর্ষের পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বেড়া নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ করে বিএসএফ। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তা আবার শুরু হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকার প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই সীমান্ত বেড়া নির্মাণে বিএসএফকে প্রায় ৬০০ একর জমি হস্তান্তরের অনুমোদন দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা দিয়েছেন, জমি হস্তান্তর ৪৫ দিনের মধ্যে শেষ হবে।

তবে বর্তমানে ভারত কেবল বেড়া দেওয়াতেই আটকে নেই। ২০২৬ সালের ২৬ মার্চ বিএসএফের এক অভ্যন্তরীণ নথিতে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে একটি নির্দেশ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, যেসব নদী ও জলাশয় এলাকায় বেড়া দেওয়া সম্ভব নয়, সেখানে সাপ ও কুমিরের মতো সরীসৃপ প্রাণী ছেড়ে দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে। নথিতে উল্লেখ করা হয়, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের এই কাজ ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ’।

বিএসএফের সাবেক মহাপরিচালক প্রকাশ সিং এই পরিকল্পনাকে ‘বোকামি’ আখ্যা দিয়ে বলেছিলেন, কুমির বা সাপ সীমান্ত এলাকায় বাস করা বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের আলাদা করতে পারবে না।

ঢাকার প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ এ বিষয়ে নীরব নেই। তবে এই কড়া বার্তা শেষ পর্যন্ত কতটুকু কাজে রূপ নেবে, সেটাই দেখার বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এম হুমায়ুন কবীর সম্প্রতি একটি জোরালো বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে ভীত নয়।’

এর আগে, গত ১ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে বলেছিলেন যে বাংলাদেশ সীমান্তে আর কোনো হত্যা দেখতে চায় না। বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেছিলেন, সংলাপের মাধ্যমেই অনেক অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান সম্ভব।

মাঠপর্যায়েও বিজিবি তাদের নজরদারি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর থেকেই ভারতের সঙ্গে সীমান্তে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার জেলা প্রশাসনকেও নতুন করে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বেনাপোল সীমান্তে গত ৭ মে থেকে যশোর-৪৯ বিজিবি ও খুলনা-২১ বিজিবির অধীনে প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। রঘুনাথপুর, শিকারপুর, সাদিপুর, ঘীবা, পুটখালী, গোগা, দৌলতপুর এবং রুদ্রপুরের মতো একাধিক পয়েন্টে অতিরিক্ত জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকায়, বিশেষ করে রাতে অপ্রয়োজনীয় চলাফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

একই ধরনের সতর্কতা নেওয়া হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তেও। বিজিবি কমান্ডাররা জানিয়েছেন, বিএসএফ যেন অবৈধভাবে কাউকে বাংলাদেশে পুশ-ইন করতে না পারে, সে জন্য তারা কঠোর নজরদারি রাখছেন। এ ছাড়া লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে—যে দুটি জেলায় সবচেয়ে বেশি সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের ঘটনা ঘটে, সেখানে প্রায় ৫৫৮ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।

পুরো সীমান্তজুড়েই রাডার সিস্টেম, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, হাই-স্পিড বোট এবং ড্রোনের মাধ্যমে দুর্গম নদী এলাকা, ঘন বন ও সুন্দরবনে নজরদারি জোরদার করেছে বিজিবি।

এগুলো নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু এসব পদক্ষেপ দিয়ে কেবল ‘পুশ-ইন ও অবৈধ পারাপার’ ঠেকানো যাবে। মূল সমস্যা অর্থাৎ সীমান্ত পার হওয়া মানুষদের হত্যা—তা তো এতে বন্ধ হবে না।

বিএনপি সরকার যদি অতীতের সরকারগুলোর মতো ব্যর্থ হতে না চায় এবং সত্যি আন্তরিক হয়, তবে তাদের আর দেরি করা উচিত হবে না। প্রথমত, বাংলাদেশকে এই ইস্যুটি আরও জোরালোভাবে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে তুলে ধরতে হবে। ভারতীয় হাইকমিশনে রুটিনমাফিক প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে কোনো লাভ হয় না।

ঢাকাকে এখনই জাতিসংঘের স্পেশাল র‍্যাপোর্টিয়ারের কাছে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। মানবাধিকার কাউন্সিলের ‘ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ’ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হবে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) দ্বারস্থ হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এসব পদক্ষেপে যদি তাৎক্ষণিক কোনো ফল না-ও আসে তবু নীরবে মেনে নেওয়ার চেয়ে এর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ অনেক বেশি কার্যকর হবে, যা ঢাকা-দিল্লির মধ্যে চিঠি চালাচালি করে কখনো সম্ভব নয়।

দ্বিতীয়ত, সীমান্ত হত্যার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লিখিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইন বিশেষজ্ঞরা সুপারিশ করেছেন, বিএসএফের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তদন্তের জন্য ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করতে পারে। এই কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনা গবেষকেরা আরও প্রস্তাব দিয়েছেন, প্রতিটি প্রাণহানির ঘটনার পর দুই পক্ষই আলাদা ও স্বাধীন তদন্ত করবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার সারাংশ জনসমক্ষে প্রকাশ করবে। জবাবদিহির ভিত্তি হতে হবে প্রতিটি ‘ঘটনা’, কোনো ‘প্রতিষ্ঠান’ নয়।

মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশকে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে তুলতে হবে এবং তা কার্যবিবরণীতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর দিতে হবে। ভারত হয়তো আপত্তি করবে। কিন্তু নথিবদ্ধ এই আপত্তি ভবিষ্যতের একটি বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে।

তৃতীয়ত, সীমান্তে বিএসএফের মোতায়েন ও গঠনে পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের চাপ দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ সীমান্তে থাকা বিএসএফের বেশির ভাগ সদস্য পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর প্রদেশ ও রাজস্থান থেকে আসা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোনো ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক নেই। মনস্তাত্বিক এই দূরত্বের কারণেই নির্দ্বিধায় গুলি চালানো তাদের জন্য সহজ করে।

ডিজি পর্যায়ের প্রতিটি বৈঠকে বাংলাদেশের উচিত লিখিতভাবে দাবি জানানো, যেন বিএসএফ ইউনিটগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বাংলাভাষী সদস্যদের যথেষ্ট পরিমাণে যুক্ত করা হয়। ভারত যদি এই দাবি প্রত্যাখ্যানও করে, তবুও একটি ‘নথিবদ্ধ প্রত্যাখ্যান’ মৌখিক আশ্বাসের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।

চতুর্থত, বৈধ সীমান্ত বাণিজ্যকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে দেখতে হবে। ২০১৮ সালের বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্ডার হাটগুলো অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ বাণিজ্য কমিয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বৈধ আয়ের সুযোগ তৈরি হলে মানুষের অবৈধ বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ার ও গুলি খেয়ে মরার ঝুঁকি কমে।

তাই নতুন যেসব বর্ডার হাট নিয়ে আলোচনা চলছে, তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে এবং একে সীমান্ত সুরক্ষার একটি পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি বর্তমানে বন্ধ থাকা বর্ডার হাটগুলোও আবার চালু করা প্রয়োজন।

গবেষকদের মতে, ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাই হলো সীমান্ত হত্যার অন্যতম প্রধান কারণ। এই বাণিজ্য বৈধ হলে বিএসএফের কাছে গুলি চালানোর সবচেয়ে বড় অজুহাতটি আর থাকবে না।

সবশেষে, নিজেদের অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগের ব্যর্থতাকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। বিএসএফ যেসব চোরাচালান চক্রের অজুহাত দিয়ে মানুষ মারে, সেই চক্রগুলো সীমান্তের দুই পাশেই সক্রিয়। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং রাজনীতিবিদেরা অনেক সময়ই এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকেন। আর গুলি খেয়ে মরে কেবল এই চক্রের সবচেয়ে নিচের মানুষগুলো।

সরকার সীমান্ত হত্যা বন্ধে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হলে তাদেরকে অবশ্যই এই চক্রগুলোর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রভাবশালীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো জেলাগুলোর অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতাকে কোনো সামান্য বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। একে চোরাচালানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

যত দিন না সীমান্তে জবাবদিহির নীতি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, তত দিন এই মৃত্যুর মিছিল চলতেই থাকবে।

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল: লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক।
jn.pieal@gmail.com